Showing posts with label জ্ঞান কি. Show all posts
Showing posts with label জ্ঞান কি. Show all posts

25 May 2019

দৈনন্দিন আলাপ ১০

গ্যালিলিও যখন চার্চের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে বলেছিলেন ‘পৃথিবীই সূর্যের চাপপাশে ঘুরে’, কারণ দর্শানোর জন্য তাকে ডাকা হয়েছিলো। তাকে ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। বয়সের বিবেচনায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। তবে তাকে তার কথা তুলে নিতে হয়েছিলো, আগের ভুলভাল বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়েছিলো, এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিলো। একই কথা বলার জন্য সমসাময়িক সময়ে, অপেক্ষাকৃত তরুণ বিজ্ঞানী জিওর্দিনো ব্রুনোকে পুরিয়ে মারা হয়েছিলো। গ্যালিলিও বলেছিলেন- ‘সত্য সত্যই। দুইটি পরষ্পর সাংঘার্ষিক সত্য, থাকতে পারেনা।’ গ্যালিলিও এর মৃত্যুর অনেক বছর পর কেউ একজন বলেছিলেন- ‘গ্যালিলিও এই কথাগুলোই যদি কবিতার ভাষায় বলতেন, তাকে হয়তো এই কোর্ট-চার্চে দৌড়াদৌড়ি করতে হতোনা।’ কেন? কারণ কবিতার ভাষা নির্দোষ। কবিতায় অনেকে অনেক সত্য আর তিতা কথা বইলা ফেললেও বাকিরা বলে, থাক, কবিতাই তো। 

কিন্তু কবিতার আলাদা একটা শক্তি আছে, যেটা অন্য কোনো মাধ্যমের নাই। কবিতার ছন্দ লোকের মনে থাকে, কবিতার ভাষা মুখে মুখে ছড়ায়া যায়। কাজী নজরুলের কবিতা এখনো আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। তিনি এমন এমন কবিতা লিখছেন, আজকাল যদি কাজী নজরুল বেঁচে থাকতেন অথবা তার সময়ে যদি ফেসবুক থাকতো, ধর্মান্ধ-উগ্রবাদীরা তাকে কোপায়া মারতো। কেবল কবিতা লেখার কারনে জেল খাটছে এইরকম কবির সংখ্যা অনেক। কেবল কবিতা লেখার কারনে দেশছাড়া হইছে এইরকম কবির সংখ্যাও প্রচুর। কবিতা আসলে ভাষাকে একটা পোশাক দেয়। কখনো কখনো পোশাক এতো ভারী হয় যে কবিতা তার মূল বক্তব্য হারিয়ে ফেলে। লোকেরা কবিতার ভাষার সাথে কানেক্ট করতে পারেনা, প্রতিবাদে কবিতা ব্যবহার তো দূরের বিষয়। 

তো যেখানে ছিলাম, সত্য সত্যই। আচ্ছা, গ্যালিলিও-ব্রুনো যখন জানতে পারলেন পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে, পৃথিবী কি তার পর থেকে সূর্যের চারপাশে ঘোরা শুরু করছে? কবে শুরু করেছে? আজকে যদি সবাই বিশ্বাস করা শুরু করে, নাহ, সূর্যই পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, পৃথিবী কি ঘোরা বন্ধ করে দেবে? বিষয়টা হচ্ছে পৃথিবী আর সূর্যের সিস্টেমটাই এমন। আপনার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস বা জানা বা না জানার উপর নির্ভর করে না। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই সিস্টেম, ব্রুনোরে পোরাইলে এই সিস্টেম, না পোরাইলেও এই সিস্টেম। আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে জানতে দেরী হয়, বুঝতে দেরী হয়, এই আরকি। 

আসলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানবজাতি খুব বেশিদূর আগায় নাই। আরো অনেকদূর যাওয়া বাকি আমাদের। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের সময়কালের কথা। ১৮২৫-৩০ হবে। তখনকার সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ঘোষণা দিলেন- ‘আমরা বিজ্ঞানের শেষ ধাপে এসে পৌছেছি। পদার্থ বিজ্ঞানে আর কিছু আবিষ্কার করার নাই, যা ছিলো সব মানুষ জেনে গেছে।’ অথচ আমরা এখন জানি ঐটা শেষ ধাপ ছিলো না, ছিলো প্রথম ধাপ। এমনকি বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার থেকে মানবজাতির আধুনিককাল শুরু বিবেচনা করা হয়। মানে এর আগে মধ্যযুগে। এরপর কতো কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে পদার্থ বিজ্ঞানে, কতোদূর এগিয়েছে গণিত, কতোটা সাফল্য লাভ করেছে প্রযুক্তি, তার হিসাব করা কঠিন। কিন্তু আসলে আমরা খুব বেশি দূর আগায়া যাইতে পারি নাই। এখনো অনেক আবিষ্কার বাকি। 

আমাদের মন খোলা রাখতে হবে। যেকোনো কিছু গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রচুর প্রশ্ন করতে হবে। মানবজীবনের একটা জীবন জ্ঞানার্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। কেউ হয়তো কিছু তথ্য বেশি জানতে পারে, কিন্তু পুরাটা কেউ জানে না। যে জানে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রাচীন গ্রীসের ডেলফির মন্দিরে সবচেয়ে জ্ঞানী লোক কে প্রশ্ন করায়, উত্তর আসে- সক্রেটিস। সক্রেটিসকে কেন জ্ঞানী বলা হইছিলো? সক্রেটিস এর জবাব দিছে- ‘কারন আমি জানি, যে আমি কিছু জানিনা।’ যতক্ষণ আপনি না জানবেন, আপনার জানার আগ্রহ থাকবে। 

আচ্ছা, জ্ঞান কি? জ্ঞান কিছু তথ্য, কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু দক্ষতা। বইয়ে কি জ্ঞান থাকে? না বইয়ে জ্ঞান থাকে না। বইয়ে থাকে কেবল কিছু তথ্য। শুধুমাত্র তথ্য আলাদা কোনো জ্ঞান না। নির্জন কোনো দ্বীপে একলা আটকা পরলে বাইচা থাকার জন্য মাছশিকারের কলাকৌশল শিখাটা আপনার জন্য জ্ঞান, কিউবার রাজধানী কি, কোনো কাজে আসবে না। অভিজ্ঞতা জ্ঞান। অভিজ্ঞতা থাকে মানুষের কাছে, মানুষের গল্পের মধ্যে। কি শিখতে চান তার উপর নির্ভর করবে কিভাবে শিখতে চান।