Showing posts with label কেমন রাষ্ট্র চাই. Show all posts
Showing posts with label কেমন রাষ্ট্র চাই. Show all posts

17 February 2021

বড় হয়ে আমি কি হতে চাই? পর্ব ৩


বড় হয়ে আমি রাষ্ট্রপতি হতে চাইতাম। তখন মার্ক্স-এঙ্গেলসের ছাত্র, শোষনমুক্ত সমাজের স্বপ্নে বিভোর এক তরুন মাত্র। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়া তো মুখের কথা না, রাষ্ট্রপতি হতে গেলে একটা দেশ লাগে। আর দেশ হতে গেলে লাগে- জায়গাজমি, নাগরিক, সরকার, সার্বভৌমত্ব আর আইন-কানুন। তখন বিকেল বেলা বাসা থেকে বের হয়ে চায়ের দোকানে বসি আর বন্ধুরা মিলে মাঝরাত পর্যন্ত দেশ আর রাজনীতির চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করি।

কবে বড় হবো, কবে ক্ষমতা নিবো, তারমধ্যে এই রাজনৈতিক হাঙ্গামা, কে চায়? তারচেয়ে একটা দেশ বানিয়ে ফেলা সহজ। দেশের আইডিয়াটা আমি সবচেয়ে নিকটস্থ বন্ধুকে বলেই ফেললাম। একটা দেশ হতে গেলে কি কি লাগে বিস্তর আলাপ করলাম। বন্ধুও তাল দিলো- হ, হ। আমরা ৫ বন্ধু তখন নিয়মিত আড্ডায় বসি। এদের মধ্যে একজন সাস্টের, আরেকজন জগন্নাথের ছাত্র। ওরা সপ্তাহে দুয়েকদিন সময় দিতে পারতো। ওদের সাথেও আলাপ হলো। দেশ গঠনের কাজ শুরু হলো।

প্রথমেই জায়গাজমি। বন্ধু মৃন্ময়ের বাসাকে বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেয়া হলো। আর ওর বাসার ছাদের নামকরণ করা হলো- হাসানাবাদ, বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। আমরা ৫ বন্ধু আর ১ ছোটোভাই হলাম রাষ্ট্রের প্রথমদিককার নাগরিক। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আস্তে আস্তে এই রাষ্ট্রে আরো অনেককে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য ফরমের খসড়া রেডি করা হলো। দেশকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যে প্রথম ৬ জন মিলে গঠিত হলো অস্থায়ী সরকার।

৬ জনের রাষ্ট্র হলেও পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হলো। মৃন্ময়ের রিডিং রুমের বড় গোল টেবিলটাকে পার্লামেন্ট হিসেবে ঘোষনা করা হলো। রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং পলিসি পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া নেয়া যাবে না। পার্লামেন্টের অনুমতিক্রমে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করা হলো। রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তাকে সাহায্য করার জন্য থাকবে মন্ত্রীপরিষদ।

নির্বাহী দায়িত্ব বণ্টন করার জন্য পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকা হলো। রুদ্ধশ্বাস সেই অধিবেশনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট। ভোটাভুটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার উদ্দেশ্যে এবং বন্ধুদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ এড়ানোর জন্য ছোটভাইকে করা হলো বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাচন কমিশনার। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমি হলাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি, মৃন্ময় প্রধানমন্ত্রী, সিঞ্চন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মামুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মিথুন অর্থমন্ত্রী আর ছোটোভাই নাইম পার্লামেন্টের স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং একই সাথে শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।

দায়িত্ব বন্টনের পরে আসে জাতীয় পরিচয়ের প্রসঙ্গ। আলাদা রাষ্ট্র হতে গেলে সবকিছু আলাদা হওয়া লাগে। আমরা রাষ্ট্রের জন্য একটি পতাকা পার্লামেন্টে পাশ করলাম। ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা গানটিকে করলাম জাতীয় সঙ্গীত। জাতীয় পাখি- মাছরাঙা, জাতীয় ফল- আম, জাতীয় ফুল- বকুল ইত্যাদি।

রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েও আমি স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারিনি। রাষ্ট্রপতির ইচ্ছাই রাষ্ট্রের আইন, এটা বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রে ছিলো না। যেমন জাতীয় ফুলে আমার ক্যান্ডিডেট ছিলো- শিউলি। কিন্তু পার্লামেন্টে বাকিদের ভোটে আমার ক্যান্ডিডেট হেরে যায়। পার্লামেন্ট জাতীয় ফুল হিসেবে বকুলকে পাশ করে, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে পার্লামেন্টের পবিত্র সিদ্ধান্ত আমাকে মেনে নিতে হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ট্যাক্স দিতে হয়। ট্যাক্স বিষয়ক পলিসি রেডি করার জন্য অর্থমন্ত্রী দিনরাত এক করে ফেলে। ট্যাক্স হয় সাধারণত ইনকামের উপর। কিন্তু আমরা সবাইতো ছাত্র। কেউ টিউশনি করে, কেউ বাসা থেকে হাতখরচের টাকা নিয়ে চলে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো- ট্যাক্স নির্ধারিত হবে আমাদের মাসিক খরচের উপর।

পার্লামেন্টে ব্যাপক আলাপ আর ভোটাভুটির পর বিল পাশ হলো- মাসিক মোট খরচের ৪% টাকা আমরা বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবো। মানে প্রতি ১০০০ টাকা খরচের সময় ৪০ টাকা রাষ্ট্রের জন্য আলাদা করে রাখতে হবে। যখন কামাই করবো, তখন ইনকাম ট্যাক্স বলবৎ হবে বলে ধারা থাকলো। এখানেও আমার প্রস্তাব পার্লামেন্টে পাশ হয় নি। আমার প্রস্তাব ছিলো ২.৫%। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো নিজেরা মুদ্রা না ছাপানো পর্যন্ত বাংলাদেশের টাকাই প্রজাতন্ত্রের ডিফ্যাক্টো মুদ্রা হিসেবে থাকবে।

পার্লামেন্টে খসড়া সংবিধান আর আইনকানুন পাশ হতে থাকলো। প্রত্যেক শুক্রবার পার্লামেন্টের নিয়মিত অধিবেশন বসতো। ৬ মাস নিয়মিত ট্যাক্স কালেক্ট করা হলো। নতুন বেশ কয়েকজনকে নাগরিক করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনাও চললো। পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিলো ট্যাক্সের টাকায় নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল কাউকে নাগরিকত্ব দিয়ে তাকে একটা রিক্সা কিনে দেয়া হবে অথবা চায়ের দোকান করে দেয়া হবে।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব পলিসি রেডি করা হচ্ছিলো। শিক্ষা হবে কমিউনিটি বেইজড, একমুখী, বিজ্ঞানমুখী এবং কর্মমুখী। মানে কমিউনিটির সব বাচ্চাকে তাদের পিতামাতার অর্থনৈতিক কন্ডিশনের উপর ভাগ না করে, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে একই স্কুলে পড়ানো। আর কমিউনিটি স্কুলের সব বাচ্চাদের দায়িত্ব আর খরচ নির্বাহ করবে কমিউনিটির সবাই। কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে নেয়া হলো। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে বাচ্চাদের এমন কোনো হাতের কাজ শেখানো হবে, যাতে তারা সাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো- নিজেদের বাচ্চাদের দিয়ে সেই স্কুল শুরু করা হবে।

নাগরিকদের জন্য কিছু আলাদা নিয়ম ছিলো। যেমন-

১। ধর্ম, লিঙ্গ, গায়ের রঙ, আঞ্চলিকতা, রাষ্ট্রীয় পদ, অর্থনৈতিক অবস্থার উপরে নাগরিকদের সাথে বৈষম্য করা যাবে না।
২। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, সবাইকে তা মেনে নিতে হবে, যদিও তা নিজের মত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিপক্ষে যায়।
৩। জায়গা মতো ময়লা ফেলা, যত্রতত্র থুথু না ফেলা, আরেকজনকে কথা বলতে দেয়া, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইত্যাদি আরো অনেক আচরণকে নাগরিক শিষ্টাচার হিসেবে পালন করা।

৪। জাতীয় পতাকাকে সম্মান করা, জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে দাঁড়ানো এবং অন্যান্য কাজ করা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদিও নাগরিক শিষ্টাচারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

কিন্তু উত্থানের পরেই আসে পতন। যখন রাষ্ট্র খুব ভালো চলছে, তখনি হঠাৎ আমাদের আগ্রহে ভাটা পরে যায়। কবে সবাইকে বোঝানো শেষ হবে, কবে সবাই শিক্ষিত হবে, কবে সবাই নাগরিক হবে! সর্বপ্রথম অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব আর সামলাতে পারছিনা বলে পদত্যাগ করলো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠনের অনুষ্ঠানের জন্য পার্লামেন্ট অধিবেশন মিস করলো। পরবর্তী অধিবেশনে ভোটাভুটি করে রাষ্ট্রকে ডিজব্যান্ড করা হলো। এখন থেকে বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্র নামে পৃথিবীর বুকে আর কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। 

৬ তরুনের শোষনমুক্ত, বৈষম্যহীন, স্বনির্ভর রাষ্ট্রপ্রকল্পের স্বপ্ন এখানেই শেষ হলো।

16 February 2021

দৈনন্দিন আলাপ ৩৮


বর্তমানে বাংলাদেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই পরিণত হয়েছে স্মৃতিচারণ মূলক রাজনৈতিক দলে। হয় তারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির স্মৃতিচারণ করে; নেতাজী সুভাষ বসু, মওলানা ভাসানী। অথবা বিশেষ কোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে; ৫২, ৬৬, ৬৯, ৭১, ৯০। অথবা অতীতের গৌরবজ্জ্বল রাজনীতিকে মনে মনে স্মরণ করে বছর শেষ করে।

রাজনীতি কি এটা না জেনেই দিনের পর দিন রাজনীতি করে চলার কুফল হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে বাংলাদেশের জনতা। রাজনীতি করার জন্য এখন আর মানুষের কথা ভাবা লাগে না, মানুষের মঙ্গল চিন্তা করা লাগে না। রাজনীতিতে তাই ব্যবসায়ী আর পুঁজিপতিরা জায়গা করে নিয়েছে। রাজনীতিকে তারা ব্যবহার করছে তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে।

রাজনীতি আসলে কি? রাজনীতি হচ্ছে এমন একটা উপায় যাতে মানুষের কথা ভাবা হয়। কিভাবে সামগ্রিক জনতার আজকের দিনের চেয়ে কালকের দিন ভালো কাটবে, তা ভেবে বের করা। কি করলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নতি হবে। কি করলে, জনতা মর্যাদার সাথে আরেকটা দিন বাঁচতে শিখবে। অথচ বাংলাদেশের দিকে তাকালে এর উলটো চিত্র দেখা যাবে প্রচুর।

এখানে একটি বৃহৎ অংশ রাজনীতিকে ঝুকিপূর্ণ মনে করে এর থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। হয় তারা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে অথবা বাধ্য হয়। আরেক পক্ষ রাজনীতিকে নিজের ও নিজের পরিবারের উন্নয়নের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। যেকোনো উপায়ে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করতে গিয়ে এমন কোনো হীন কাজ নেই যা তারা করে না। মজুতদারী, চোরাকারবারী, জাতীয় সম্পদ চুরি করা, জাতীয় সম্পদ নষ্ট করা, লুটপাট, দূর্নীতি ইত্যাদি।

কেবল একটি ছোট্ট অংশ সচেতনভাবে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে জনতার মঙ্গলের উদ্দেশ্যে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। তারাও যদি দিবস পালন, ব্যক্তি পূজা, বাদ-বিবাদের তত্ত্বে বিভক্ত হয়ে পরেন, জনতার কথা ভাববে কে!

রাজনীতি মানে পলিসি মেকিঙের গুণগত মান পরিবর্তন করা। অর্থাৎ পলিসিতে এমন কিছু বাস্তবায়ন করা যেটাতে বৃহত্তর জনগোষ্টীর মঙ্গল হবে। অথবা এমন কোনো পলিসি হতে না দেয়া যেটাতে জনতার অমঙ্গল হবে। উদাহরন হিসেবে বলা যায় বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের (২০০৯-২০২১) সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত।

সুন্দরবন বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। বাংলাদেশের সকল নাগরিক এর মালিক। এমনকি যে ব্যক্তি তেতুলিয়া থাকে এবং জীবনে একবারও সুন্দরবন দেখে নি, সেই বাংলাদেশী নাগরিকও এর মালিক। তারচেয়েও বড় কথা সুন্দরবন প্রকৃতির দান, আমরা এটা বানাই নি। প্রকৃতি যে দান আমাদের হাজার বছর ধরে দিয়েছে, আমরা সেটা এক অবিবেচক সরকারের অন্যায় ইট-পাথরের উন্নয়নের স্লোগান তুলে ধ্বংস করে ফেলতে পারি না। একদিন হাসিনা সরকার থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জনতা আর বঙ্গোপসাগরের ভয়াল জলোচ্ছ্বাস থাকবে। সরকারের কোন বংশধর উন্নয়নের প্ল্যাকার্ড হাতে সেই জলোচ্ছ্বাস ঠেকাবে।

যাই হোক, রাজনীতি হতে হবে পলিসি মেকিং বিষয়ে। ক্ষমতায় যাওয়ার পরে একজন জনতাবাদী রাজনীতিবিদ যেমন জনতাবাদী পলিসি করবে, তেমনি ক্ষমতায় না থাকলেও বিদ্যমান সরকারকে জনতাবিরোধী পলিসি করতে দিবে না। মানে রাজনীতিতে জনতাবাদ ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার সাথে সম্পর্কিত নয়।

এই সহজ বিষয়টা রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারছে না। সরকারের চাপে যদি আপনি হক কথা বলতে ভয় পান, তাহলে রাজনীতি আপনার জন্য না। সরকার তো চাইবেই জনতাকে অন্ধকারে রেখে, সৎ রাজনীতিবিদদের চাপের উপর রেখে, নিজের লুটপাট নিষ্কন্টক করতে। আপনার দুর্নীনিবিরোধী আন্দোলন তার পেটে লাত্থি। সে এটা বরদাশত করবে কেন?

যারা বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের দিয়ে প্রভাবিত, তারা নেতাদের জন্মদিন-মৃত্যুবার্ষিকি পালনের পাশাপাশি একবার ভেবে দেখতে পারেন; ঠিক এই সময়ে, ঠিক এই দুর্যোগে, সুভাষ থাকলে কি করতেন, ভাসানী থাকলে কি করতেন। তারা থাকলে যেটা করতেন, সেটা যদি বুঝতে পারেন, সেটা যদি করতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে তাদের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।

সুভাষ আর ভাসানীর নাম নিচ্ছি কারন তারা এমন নেতা, যারা জনতার মঙ্গলের সাথে কোনোদিন আপোষ করেননি। নিজের ব্যক্তিস্বার্থে জনতার বৃহৎ স্বার্থ বিসর্জন দেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কল্যান কামনা করে গেছেন। তাদের সারা জীবন আমাদের কাছে সেই বার্তা দেয়। জনতার মঙ্গল কামনার রাজনীতি তাই তাদের স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শন, দিবস পালন নয়।

প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে সম্মানের সাথে ভালোভাবে জীবন যাপন করার। সরকার ও রাষ্ট্রের কাজ তাদের সেই জীবন যাপনকে সহজ করা, নির্বিঘ্ন করা। কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি জনতার অজ্ঞতার সুযোগে অকল্যানকামী পলিসি চাপিয়ে দেয়, তাহলে জনতা সেই সরকার ও রাষ্ট্র দিয়ে কি করবে!

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের এসব নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। কিন্তু তারচেয়েও বড় বিপর্যয় হবে যদি আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য স্বনির্ভর বাংলাদেশ রেখে যেতে না পারি।

 

 

13 June 2020

দৈনন্দিন আলাপ ৩৬

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।
আমাদের একপাশে স্বৈরাচারী সরকার ও তার লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাট, অরাজকতা ও অব্যবস্থাপনা, জীবনের সর্বস্তরে শোষণ এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য।
অপরপাশে দেশকে বদলানোর অফুরন্ত সুযোগ, একটি দুর্নীতি ও লুটপাটমুক্ত রাষ্ট্র, সমাজ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাওয়া স্বনির্ভর-স্বাবলম্বী বাংলাদেশের স্বপ্ন।
আমাদের আসলে হারানোর কিছু নাই। এর মধ্যে যা হবে সব অর্জন।
আমদের সংগ্রাম দুইটা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে।
একদিকে সরকারের স্বেচ্ছাচার-স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও লুটপাট, শোষণ ও বৈষম্য। অপর ফ্রন্টে জনতার মধ্যে প্রোথিত দীর্ঘদিনের অশিক্ষা-কুসংস্কার, কলোনিয়াল মানসিকতা, বৈষম্যে অভ্যস্ততা ইত্যাদি।
সংগ্রামটা সমানভাবে চালাতে হবে দুই ফ্রন্টের বিরুদ্ধে। আমরা যে আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সরকারের স্বৈরাচার ও জনতার মানসিকতার পরিবর্তন করতে না পারলে সে স্বপ্ন কখনো সফল হবে না।
প্রশ্ন হলো কোনটা আগে দরকার, কোনটা পরে দরকার! কোন সংগ্রামই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। দুইটাই সমানভাবে চালাতে হবে। সরকারকে তার দুর্নীতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে জনতা। আর রাষ্ট্র জনতার জন্য জনতাবাদী পলিসি বাস্তবায়ন করবে। জনতার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও কলোনিয়াল মানসিকতা দূর করা গেলেই, জনতা আগামীর বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুত হবে। তার আগে জনতার প্রস্তুত হতে হবে সরকারের অসীম ক্ষমতা আর তার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে।
জনতার জন্য রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের জন্য জনতা নয়।
যে সরকার জনতার আশা-আকাঙ্খা পূরন করতে ব্যর্থ, সে সরকারের দরকার নাই। সে সরকারকে জনতা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাড়া করাবে। আস্তাকূড়ে নিক্ষেপ করবে।
এই সংগ্রামে জয় জনতার। আগামীর বাংলাদেশ- জনতার বাংলাদেশ। আগামীর বাংলাদেশ দুর্নীতি ও লুটপাটমুক্ত, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত, স্বনির্ভর-আধুনিক বাংলাদেশ। সমস্ত প্রতিকূলতাকে প্রবল ঝড়ের মতো ঝেরে ফেলে বাংলাদেশের জনতা নিজেদের জন্য এমন রাষ্ট্র নির্মান করবে।
কলোনিয়াল মানসিকতা আমাদের এতো দূরে নিয়ে গেছে যে, প্রতি পরিবার থেকে একজনের ভিকটিম না হওয়া পর্যন্ত আমরা চুপ থাকবো। আমাদের বাবা চিকিৎসা না পেয়ে ৮-১০ হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে রাস্তায় মরবে। আমাদের বোন ধর্ষণের পর পাশের জঙ্গলে মৃত পরে থাকবে, আর তার খুনীরা ক্ষমতা দেখিয়ে ঘুরে বেড়াবে, মামলা না করার জন্য আপনাকেই চাপ দিবে, থানা-পুলিশকে টাকা দিয়ে কিনে নিবে। আপনার ভাই কৃষক বা শ্রমিক, ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে পাউরুটি চুরি করতে গিয়ে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের পায়ের নিচে পরবে।
যতোদিন আপনি অত্যাচারিতের অনুভূতি অনুভব করতে না পারবেন, ততোদিন আওয়াজ করার দরকার নাই। কিন্তু আপনি যদি দেখে থাকেন, যা চোখের দেখা উচিত; আপনি যদি শুনে থাকেন, যা চোখের শোনা উচিত; আপনার হৃদয় যদি অনুভব করে থাকে, যা হৃদয়ের অনুভব করা উচিত, তাহলে চুপ করে থাকবেন না।
হৃদয়ের আওয়াজ শুনতে শুনতে যদি আপনি বুঝতে পারেন, আপনি একটি অরাজক রাষ্ট্রে আছেন; যদি আপনি বুঝতে পারেন এমন এক দেশে আপনি আছেন, যে দেশ আপনি আশা করেন না, তাহলে আওয়াজ তুলুন। যে যার জায়গা থেকে আওয়াজ তুলুন। দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন।
আমাদের স্বামর্থ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হবেন না। আমাদের পূর্বপুরুষ একটা প্রশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে পরনের লুংগি গিট দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো বলেই আজ আমরা স্বাধীন। আপনার আওয়াজহীনতা স্বৈরাচারকে শক্তি জোগালে পরের প্রজন্মকে কি জবাব দিবেন, সেটা এখনি প্রস্তুত করে রাখুন।
কারণ আগামীর বাংলাদেশ- জনতার বাংলাদেশ। আগামীর বাংলাদেশ দুর্নীতি ও লুটপাটমুক্ত, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত, স্বনির্ভর-আধুনিক বাংলাদেশ।
জয় জনতা।

10 November 2019

স্বার্থ ও দ্বন্দ্ব : আন্দোলনে নানামুখী রাজনীতি


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন চলছে। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নানান পক্ষ সক্রিয় হয়েছে। পক্ষে বিপক্ষে নানান কথা-বার্তা, যুক্তি-তথ্য উপস্থাপন, কার্টুন-দেয়াল লিখন, ঝগড়া-বিতণ্ডা চলছে। এমনকি সারা দেশের জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে এটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তো আমাদের জানা দরকার সেই আন্দোলন কারা করছে? কেন করছে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলাম দেশের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান তৈরী করে নিয়েছেন। কিন্তু তার স্বার্থকতা এর আগের উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনকে পদচ্যুত করার আন্দোলনে তিনি শামিল ছিলেন। তিনি আগে থেকেই জানেন একজন উপাচার্যের কি করা উচিত, কোথায় কোথায় একজন উপাচার্য দুর্নীতি করতে পারে এবং কখন একজন উপাচার্যকে পদত্যাগ করানোর জন্য আন্দোলন করা হয়।

চলমান এই আন্দোলনে বেশ কয়েকটি পক্ষ আছে, যেমন সব আন্দোলনেই থাকে। একপক্ষে উপাচার্য নিজে, তার সাথে উপাচার্যপন্থী শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের একাংশ। অপরদিকে উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকেরা, ছাত্রদের সাধারণ প্লাটফর্ম ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এবং ছাত্রলীগের অপরাংশ। উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকেরা নানান ঘরানার, কেউ আওয়ামীপন্থী কিন্তু উপাচার্যবিরোধী, কেউ বিএনপিপন্থী। কেবল হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের স্বার্থপন্থী এবং দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন।

যে কোনো দুর্নীতির বিপক্ষে কথা বলেন বলে সব ক্ষমতাসীন উপাচার্যের চক্ষুশূল, এমন কিছু শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আছেন, এরাই ছাত্রদের মূল ভরসার জায়গা। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক রায়হান রাইন, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসসহ আর কয়েকজন। তারাও জানেন এই উপাচার্যের পদত্যাগ দুর্নীতি রোধের কোনো উপায় না, এরপর যে উপাচার্য হবে, সেও দুর্নীতি করবে। দুর্নীতি করবে কারন সমস্যাটা অন্য কোথাও, সমস্যাটা সিস্টেমে। উপাচার্য পদটি প্রশাসনিক কিন্তু এটার নিয়োগের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া নেই, কোনো ধরণের জবাবদিহিতা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের ক্ষমতা স্বৈরাচারী।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর, জাহাঙ্গীরনগরের প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং সাংস্কৃতিক জোটের সমন্বয়ে গঠিত একটা প্লাটফর্ম, যেখানে সাধারণ ছাত্রদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সাধারন ছাত্ররাও এখানে নিজের কথা বলতে পারে, দাবী দাওয়া তুলতে পারে। প্রগতিশীল ছাত্রজোট হচ্ছে আবার ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র মৈত্রী ইত্যাদি ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট। ছাত্রলীগের মন্তব্য ‘এরা কেবল আন্দোলনই করে’। আসলে আন্দোলন করা ছাড়া আর কিইবা করার আছে এদের? এটা খুবই স্বাভাবিক যে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ দেখে রাখে না। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো সেটা দেখাই লাগবে।

লাইব্রেরীতে সিট সংকট, সিট বাড়াও আন্দোলন; উপাচার্যের দুর্নীতি, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন; ভর্তি ফরমের মূল্যবৃদ্ধি; মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন; এইসব আন্দোলন করতে করতে আর সাধারণ ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলতে বলতেই প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতারা তাদের ক্যাম্পাস জীবন সমাপ্ত করেন। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল এসময় কি করে? তারা করে টেন্ডার বানিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, পার্সেন্টেজবাজি, বাকি খাওয়া, হলে অযথা ক্ষমতা দেখানো, টাকাপয়সা এবং স্বার্থ নিয়ে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং এবং মারামারি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তিনটি গ্রুপ এভাবেই আলাদাভাবে প্রকট হয়েছে। একটি গ্রুপ সভাপতি জুয়েল রানার, আরেকটি গ্রুপ সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের, আরেকটি গ্রুপ যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের। এর মধ্যে উপয়াচার্যের ঈদ সালামীর ২৫% নেয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগ করেছে সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল, এ সপ্তাহে সে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পদত্যাগপত্রও জমা দিয়েছে। আরেক গ্রুপের নেতা সাদ্দাম সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রব্বানীর সাথে সালামীর ২৫% নিয়ে ফোনালাপ করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। সাদ্দাম ও তার গ্রুপও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। আর বাকি যে এক গ্রুপ থাকলো সভাপতির নেতৃত্বে, যারা সালামীর ৫০% পেয়েছে, তারাই গত কয়েকদিন আগে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষক ও ছাত্রদের মারধর করেছে।

এদের কারো ছাত্রবাদী কোনো স্বার্থ নেই। এদের চলাফেরা দেখলেই বোঝা যায় এদের হাতে টাকা আছে। দামী ফোন, দামী মোটর সাইকেল, বিলাশবহুল জীবনযাপন, হলের রুমে ফ্রিজ, টিভি, সোফা ইত্যাদি। এদের অনেকের পিতাই বাকী ছাত্রদের অভিভাবকদের মতো মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত। পিতার কামাইয়ে এরকম দামী মোটরসাইকেল চালনা করা অসম্ভব। এই খরচের টাকার উৎস কোথায়? অনেক উৎসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কাজের একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ অন্যতম। আর এখানেই উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম ফেঁসে গেছেন।

প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে কেবল ছাত্রলীগকে টাকা বা পার্সেন্টেজ দেয়ার অভিযোগই শেষ নয়। এই পার্সেন্টেজের লেনদেন তিনি সম্পন্ন করেন তার স্বামী ‘আখতার হোসাইন’ ও গুণধর সুপুত্র ‘প্রতীক’ এবং তার পিএস ‘সানোয়ার’এর মাধ্যমে। তার সমস্ত অপকর্মের সহযোগী এই তিন পুরুষ। তার পুত্র প্রতীক এর আগেও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং সেখানে ঘুষ গ্রহণের কেলেঙ্কারীতে জড়িত। বেশ কয়েকটি শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্য- কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি মোতাহার মোল্লার ছেলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মোস্তাকিম বিন মোতাহারের নিয়োগ।

আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের অংশটি মূলত আগের উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত, ড. ফারজানা উপাচার্য হওয়ার আগে নিজেও শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত শিক্ষক ছিলেন। শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত শিক্ষকরা একটি বিশেষ স্বার্থের জায়গা থেকে আন্দোলনে আছেন। তারা যতটুকু ফারজানাকে ক্ষমাতাচ্যুত করতে চান তার চেয়ে বেশি শরীফ এনামুল কবিরের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের রাজনীতি করার জায়গা এখন খুবই সীমিত। বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে তারা নিজেদের চাঙ্গা রাখেন। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের দলাদলিতে আসলে বিএনপি-জামাতপন্থী শিক্ষকদের লাভ বেশি। তারা বিভিন্ন পক্ষ অবলম্বন করে প্রশাসনিক সুবিধাদি নিয়ে থাকেন।

ড. ফারজানা ইসলামের পর যিনি উপাচার্য হবেন তিনি দুর্নীতি করবেন না বা নিয়োগ বাণিজ্য করবেন না বা সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ দেখে রাখবেন এমনটা বলা যায় না। তিনি ড. ফারজানার চেয়েও বেশি দুর্নীতিগ্রস্থ হতে পারেন, কিন্তু এই ভয়ে তো ড. ফারজানার বিরুদ্ধে আন্দোলন থামিয়ে দেয়া যায় না। পদত্যাগ না করলেও তার কৃতকর্মের তদন্ত হওয়া উচিত, কোথায় কোথায় তিনি দুর্নীতি করেছেন, সেই দুর্নীতির বিষয়ে তার ব্যাখ্যা কি?

জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি এবং আন্দোলন আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সারা দেশ এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৈনন্দিন চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে এই ঘটনাগুলো। স্বচ্ছতার অভাব, জবাবদিহিতার অভাব, দক্ষ ও যোগ্য লোকের যথাজায়গায় না থাকার ফলাফল এই দুর্নীতি। আর দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে গায়ে না মাখিয়ে নির্লিপ্ত থাকা, যা করেছি বেশ করেছির মনোভাব পোষণ করাই আন্দোলনের কারণ।

ছাত্রবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় নির্মানে প্রশাসনের করণীয় কি হতে পারে? 
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তিকে অর্পন করা, সাধারণ ছাত্রদের প্রতি যার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। 
২. শিক্ষক নিয়োগকে আরো স্বচ্ছ করা, মেধার পাশাপাশি প্রয়োজনে লিখিত পরীক্ষা ও ডেমো ক্লাসে ছাত্রদের মার্কিং এর উপর ভিত্তি করে শিক্ষক নিয়োগ। 
৩. অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জ্ঞানের মৌলিক চর্চা এবং গবেষণাকে প্রাধান্য দেয়া। গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। 
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তা নিরীক্ষা করা। 
৫. কোনো ধরণের অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর আলামত পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার তদন্ত করা, তদন্তের রিপোর্ট অতিদ্রুত জনগণের সামনে প্রকাশ করা। 
৬. অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িত থাকলে স্বেচ্ছায় পদত্যাদের সংস্কৃতি চালু করা।

16 October 2019

দৈনন্দিন আলাপ ২৪

১৯৪৭ এর আগে আমাদের শত্রু কারা এটা চিহ্নিত করতে আমাদের সমস্যা হতো না। আমরা সাদা চামড়ার বৃটিশদের খুব সহজেই আলাদা করতে পারতাম। বৃটিশরা আমাদের লুটপাট করে নিজেদের দেশকে শিল্পোন্নত করেছে, আর আমাদের বলেছে ব্লাডি ব্ল্যাক।  আমরা দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের শত্রুদের তাড়িয়েছি। 

১৯৪৭-৭১ আমরা শত্রু চিহ্নিত করতাম মুখের ভাষা দিয়ে। ৫২ তে ভাষার লড়াই থেকে শুরু করে ৭১ এ মুক্তিসংগ্রাম পর্যন্ত আমরা আমাদের আত্মসম্মান বিসর্জন দেইনি। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশও বৃটিশদের উত্তরাধিকার হিসাবে আমাদের উপর চালিয়েছে লুটপাট। আমাদের টাকা তারা পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গেছে। আমরা থেকেছি ব্লাডি বাঙ্গাল হয়ে। 

১৯৭১ এ আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, যে দেশের নাম বাংলাদেশ, যে দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু আমাদের অবস্থার উন্নতি হয়নি। আমাদের দেশের ক্ষমতায় এখন আমাদের নিজেদের দেশের লোক। অথচ লুটপাট কমেনি। পরাধীন থাকলে আমরা বৃটিশ বা পাকিস্তানিদের দোষ দিতে পারতাম। এখন এই স্বাধীন দেশে আমাদের শত্রু কারা? 

বাংলাদেশের শত্রু চিহ্নিত করা এখন খুব কঠিন। তাদের গায়ের রঙ আমাদের মতো, মুখের ভাষা আমাদের মতো, কেবল কয়েকটি আচরন বাদ দিয়ে। কিভাবে সাধারণ জনগণ থেকে জনগণের শত্রু আলাদা করবেন? 

এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই প্রায় ৫০ বছর পর, বাংলাদেশের শত্রু তারাই যারা বিভিন্নরকম দুর্নীতির সাথে যুক্ত। আগে অন্যরা লুটপাট করে দেশের সম্পদ বাইরে পাচার করেছে। এখন দুর্নীতিবাজরা বাংলাদেশের সম্পদ বাইরে পাচার করছে। এই দুর্নীতিবাজদের কাছে বাংলাদেশের জনগণ, ব্লাডি গরিব... যাদের রক্ত পানি করা টাকা তারা বিদেশ পাচার করছে, তাদের কোনো দাম নাই। তাদের কাছে তার বৌয়ের দামী হীরার আংটি জরুরি, ছেলে-মেয়েদের জন্য বিদেশের ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট জরুরি। 

বাংলাদেশের শত্রু এখন এই দুর্নীতিবাজরাই। এদের দেশ থেকে তাড়াতে হবে। অবশ্য দেশ থেকে কি তাড়াবেন? এরাতো বাইরে সব টাকা নিয়েই গেছে, ফ্যামিলির সবাইকে বাইরে পাঠিয়েও দিয়েছে, এখন শুধু নিজের যাওয়া বাকি। এদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ধরে এনে বিচার করতে হবে। 

দুর্নীতিবাজ কারা?

১. সরকারি দায়িত্ব যারা অবহেলা করে, সরকারি দায়িত্বকে কাজে লাগিয়ে যারা অবৈধ অর্থ কামাই করে, সরকারি কাজ করে দেয়ার জন্য যারা অতিরিক্ত অর্থ- ঘুষ বা উপহার দাবী করে এবং গ্রহণ করে। যে কোনো সরকারি পদ এর আওতায় পরবে- মন্ত্রী-সচিব থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের পিয়ন পর্যন্ত। 

২. সে সমস্ত ব্যবসায়ী যারা পণ্য মজুত করার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং দাম বাড়ায়। যারা বিদেশে টাকা পাচার করে, অবৈধ অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করে। 

৩. সে সমস্ত রাজনীতিবিদ যারা রাজনীতিকে টাকা কামাইয়ের পথ হিসেবে দেখে। বিদেশে অর্থ পাচার করে এবং বিনিয়োগ করে। 

তবে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য দুর্নীতি করা সহজ। একটা বালিশ ১ লাখ টাকা দিয়ে কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা কোনো রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত সহকারী কিনলে তাকে চড়ায়া কানাপট্টি লাল করে ফেলা হতো। কিন্তু সরকারি কাজে জবাবদিহিতা নাই, বিচার নাই, দেখার কেউ নাই। শাস্তি কি হবে? ওএসডি, অব্যহতি... কিন্তু সরকারি টাকা মানে জনগণের টাকা দুর্নীতি করার জন্য কেনো তাদের দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করা হবে না? 

বাংলাদেশের শত্রু এখন এই দুর্নীতিবাজরাই। এদের না ঠেকানো গেলে দেশ আগাবে না। 

13 October 2019

দৈনন্দিন আলাপ ২৩

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলাম। তো একবার সায়েদুর রহমান স্যার আমাদের ক্লাস নিচ্ছিলেন। স্যার আমাদের রাষ্ট্র বিষয়ক বিভিন্ন বাদ-বিবাদ পড়াচ্ছিলেন ক্লাসে; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র ইত্যাদি। সম্ভবত তখন ২০১১ সাল, আমরা স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্যার বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলে? এটাকে গণতন্ত্র বলা যায় কিনা? স্যার সমস্ত দল-মতের উর্ধ্বে উঠে, সেদিন ক্লাসরুমে জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন- 'বাংলাদেশে যেটা চলে, সেটাকে পরিবারতন্ত্র বলা যায় বা গোষ্ঠীতন্ত্র বলা যায় বা কতিপয়তন্ত্র বলা যায়। ঠিক গণতন্ত্র বলা যায় কি না...' 

যদিও বাংলাদেশের সরকারি নামের সাথে পিপলস রিপাবলিক আছে; সংবিধান, গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র ইত্যাদি ভারী ভারী টার্মে বোঝাই; নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্র আছে ভান করার জন্য, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে; কিন্তু আসলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন? 

বাংলাদেশে আসলে কখনো গণতন্ত্র ছিলো কিনা এটা নিয়ে আরো ৫০-১০০ বছর পর গবেষকেরা তাত্ত্বিক আলোচনা করবেন। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কয়টা নির্বাচনে মানুষ অংশগ্রহণ করেছে? মাঝখানে সামরিক শাসনে থেকেছে কয়বছর? কয়টা পার্টি সংসদে বসে মানুষের কথা বলেছে? এগুলো আমরা জানি। 

এখন কি চলছে সেটা নিয়ে কথা বলি।

এখন বাংলাদেশে চলছে একনায়কতান্ত্রিক কতিপয়তন্ত্র। কতিপয়তন্ত্র কেন? কারন এখানে বেশ কয়েকজন লোকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। বেশ কয়েকটা পরিবারের হাতে ক্ষমতা আর অর্থ। এখানে কেবল আওয়ামী লীগের কথা বলা হচ্ছে না, এখানে বিএনপির কথাও বলা হচ্ছে। আসলে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি একই টাইপের পার্টি, একই মুদ্রার ওপিঠ এবং এপিঠ। আওয়ামী লীগে মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হয়, এম্পির ছেলে এম্পি, বিএনপিতেও তাই। রাজনীতি আর দেশ হয়ে গেছে পারিবারিক সম্পত্তি। সংসদ হয়ে গেছে মামা বাড়ি, আইনকানুন হয়ে গেছে মামা বাড়ির আবদার, আইনজীবী আর বিচারকরা হয়ে গেছে তাদের খালু। 

বাংলাদেশের ১৬ কোটি লোক, ১৬ কোটি মত। কয়জন বুঝে ভোট দেন? কার কই বাড়ি, আগে কে এম্পি ছিলো, ক্ষমতায় কে যেতে পারে, কার বেশি টাকা আছে, কে ভোটের আগে চা খাওয়ালো, এগুলো দেখে ভোট দেন তারা। নিজের ভালো বোঝেন কয়জন ভোটার? কে আসলে কাজ করবে, ইশতেহার কয়জনের মনে থাকবে, কে রাজনীতি ব্যবহার করে ব্যবসা  করবেনা, সন্ত্রাস করবেনা, এগুলো তারা বুঝলেও, ভোটের সময় খাটান না। এতো কথার দরকার কি, এখন তো ভোট ও দেয়া লাগে না। জায়গায় দাড়াবেন, ভোট হয়ে যাবে... 

যাই হোক, বাংলাদেশের মানুষ ৫ বছরে ১ বার ১ টা ছাপ্পা দিয়েই মনে করে গণতন্ত্র এসে গেলো। ভোটাররা মনে করে তাদের কথা রাজনীতিবিদরা মনে রাখবে, নিজের গরজে এলাকার কাজ করবে। স্থানীয় প্রশাসনের সব দায়িত্বে তারা এলাকার এম্পিকে দেখতে চায়। মানুষ চায় গণপ্রতিনিধিরা তাদের কথা বলবে। মানুষের মুক্তি আসবে, দেশে উন্নয়নের চাকা লাইনেই থাকবে। চাকা কি লাইনে থাকে? লাইন হয়ে যায় আঁকাবাকা, ভালো না হাতের লেখা... 

তারা একবার আওয়ামী লীগকে সুযোগ দেয়, আরেকবার বিএনপিকে সুযোগ দেয়। দুইটাই খারাপ অপশন। বিষয়টা এমন যে আমি আপনাকে চড় মারবো নাকি লাত্থি মারবো, দুইটাই অপশন আর কোনো অপশন নাই, এবং এরমধ্যে একটা আপনাকে নেয়াই লাগবে। মজা না? এই বিষয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উদাহরণ দিয়েছিলেন, ফেনীর সাংবাদিক টিপু। তিনি বলেছিলেন- বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিয়ে ঠিক করে, এই ৫ বছর কে তার পু*কি মারবে!! এই বক্তব্যের কারনে সাংবাদিক টিপুকে মেরে তার পা ভেঙে দেয়া হয়েছিলো। কে মেরেছিলো? আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপি, নাকি আওয়ামী লীগ? কি আসে যায়? টিপু তার পা হারিয়েছিলেন, আমরা চুপ হয়েছিলাম। 

কথা বলতে গিয়ে আবরার ফাহাদ খুন হলেন। সারা দেশ সমব্যথী হলো। নতুন প্রসঙ্গ মানুষের সামনে আসবে, নতুন ইস্যু মানুষের জীবনে আসতেই থাকবে। কিন্তু মৌলিক আলাপ ভুলে গেলে চলবে না। আবরার কি কারণে খুন হয়েছেন? ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন... আবরার খুন হয়েছেন দেশের স্বার্থে দুইটা কথা বলতে গিয়ে। 

কথাগুলো যখন আপনি একলা বলবেন তখন আপনার খুন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু যখন সকলে বলবে তখন? তখন সরকারে যেই থাকুক না কেন, দাবী মানতে বাধ্য হবে, মানুষের কথা ভাবতে বাধ্য হবে, জনতার পালস বুঝতে বাধ্য হবেই হবে। সরকার চাইবেই কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে, এটাই সরকারের রাজনীতি, এটাই রাজনীতিবিদদের রুটিরুজি। আপনি দুই একজনকে সাথে নিয়ে মোদ্দাকথায় মাটি কামড় দিয়ে পরে থাকলে এদের পেটে লাত্থি পরে, রুটিরুজি নষ্ট হয়। বিশ্বাস করেন, এরা সংখ্যায় খুব কম; মানুষের সম্মিলিত শক্তির কাছে এরা পালকের মতোই হালকা। 

এখন আমরা একটু প্রশ্নোত্তর খেলবো। বাইনারী পদ্ধতিতে তার উত্তর দিবো। 

১. তিস্তা পানি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা কি ভারতকে ফেনী নদীর পানি দিবো? 
উত্তরঃ না। 

২. আমরা কি আমাদের বন্দর এবং বঙ্গোপসাগর এলাকায় ভারতকে নজরদারি চালাতে দিবো? 
উত্তরঃ না। 

৩. আমরা কি দেশের চাহিদা না মিটিয়ে ভারত বা অন্য যে কোনো দেশে গ্যাস রপ্তানি করতে দিবো?
উত্তরঃ না। 

৪. আমরা কি যে কোনো সরকারের যে কোনো দেশবিরোধী চুক্তি মেনে নিবো? 
উত্তরঃ না। 

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।
জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরিয়সী... 

এই প্রসঙ্গে দ্বিমত থাকলে আলাপ চলতে পারে, আর একমত থাকলে দৃঢ়কণ্ঠে আওয়াজ তুলুন- 

দল বড় না দেশ বড়, 
দেশ বড়, দেশ বড়।

দেশ কার? দেশ কার? 
জনতার... জনতার... 

জয় জনতা স্লোগান তুলুন... 
বাংলাদেশের পক্ষে থাকুন... 

24 May 2019

দৈনন্দিন আলাপ ৯

আমরা এখন আছি এক হাহাকারের রাষ্ট্রে। কেবল উন্নয়নের গালগল্প, কয়েকজন স্বার্থপর লোকের সম্পদবৃদ্ধি, অন্ধ আনুগত্য আর নজিরবিহীন তোষামোদ-স্তুতি, চেতনা এবং অনুভূতির ব্যবসা দেশকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার কিনারায়। যেখান থেকে লোকেরা কেবল হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। কেউ কিছু করছেনা এখানে। একটা একটা করে দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, যেন দিন এভাবে শেষ হয়ে গেলেই হলো। গ্রামের বাংলাদেশ এখনো অন্ধকারে, শহরে নাই নাগরিক সুবিধা, ছাত্ররা পড়াশোনা করে চাকরীর জন্য, চাকুরেরা কাজ চালায়া নেয় দুইবেলা খাবারের জন্য আর ব্যবসায়ে মন্দা-স্থবিরতা। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই নাই। এমন একটা বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। 

৯৭ সালের একটা রাজনৈতিক প্রবন্ধের বই পড়তেছিলাম। সেখানে লেখক হাসাহাসি করছেন কারণ আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোলমডেল বলছেন। কাকতালীয়ভাবে তখনো শেখ হাসিনার শাসনকাল ছিলো। এখনো বাংলাদেশ আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নয়নের রোলমডেল, এই কিছুদিন আগে আবার আমেরিকার আরেক মন্ত্রী আইসা এটা বইলা গেছে। এখনো শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। এইখানে দুইটা বিষয়, এক আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই কথা বইলা মস্করা করতে চাইছে, আবার সরকারপ্রধানকে খুশিও করতে চাইছে। আমাদের সরকারপ্রধানও এটা শুইনা খুশি হইছে। কিছু না কইরা যদি রোলমডেল হওয়া যায় তাইলে কিছু করার দরকার কি! ২য় বিষয়, রোলমডেল এইভাবে যে বাংলাদেশ যেভাবে রাষ্ট্র চালায় সেভাবে উন্নত বিশ্ব রাষ্ট্র চালাবে না, তাইলে দেশ আগাবে। 

মানুষের ইতিহাস সংঘবদ্ধতার ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস একসাথে থাকার ইতিহাস। একসাথে থাকলে গেলে টুকটাক ঝামেলা হয়, সেগুলা কমায়া নিয়া আসাই রাষ্ট্রের কাজ। জমিজমা নিয়া প্রতিবেশীর সাথে বিরোধ। আমি বললাম- আমি ঠিক, প্রতিবেশী বললো- ও ঠিক। মারামারি হওয়ার অবস্থা। রাষ্ট্রের কাজ এই বিষয়টার নিষ্পত্তি করা। রাষ্ট্র এইখানে নিরপেক্ষ থাকবে, রাষ্ট্র এইখানে সৎ থাকবে। 

আচ্ছা রাষ্ট্র কি? রাষ্ট্র তো একটা বায়বীয় বিষয়, একটা আইডিয়া। কিছু মানুষের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একসাথে থাকাই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রে যেহেতু অনেক লোক থাকতে পারে, তাই তাদের চালানোর জন্য আর দুইটা বিষয় লাগে, সার্বভৌমত্ব আর সরকার। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বেশ বিশাল ১৬-১৭ কোটি লোক। সেইজন্য আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা আর সরকার ডিসেন্ট্রালাইজ করা হয়। সরকার যতো কম লোক ডিল করবে তত দ্রুততার সাথে সেবা পৌছাই দিতে পারবে। সেইজন্য গড়ে উঠে লোকাল গভমেন্ট। সিটি কর্পোরেশন, তার মধ্যে ওয়ার্ড। জেলা, তার মধ্যে উপজেলা, তার মধ্যে ইউনিয়ন। যেন ওয়ার্ড আর ইউনিয়ন পর্যায়ে লোকেদের কাছে সেবা নিয়া যাওয়া যায়। 

রাষ্ট্রীয় সেবা কি? আমার বাসার সামনের রাস্তা নাহয় আমি বানায়া রাখতে পারি। একটা কাজে আমার দিনাজপুর যাওয়া দরকার। দিনাজপুর পর্যন্ত কি আমি রাস্তা বানাইতে বানাইতে যাবো? না, সরকারের কাজ দিনাজপুর পর্যন্ত রাস্তা বা ট্রেনলাইন বানায়া রাইখা আমার কাজটারে সহজ করা। যেন আমি সহজে দিনাজপুর যাইতে পারি, দিনাজপুরের লোকটা সহজে আমার কাছে আসতে পারে। এইরকম রাষ্ট্রীয় সেবা খাত কয়েকটা আছে, যোগাযোগ, শিক্ষা, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, অর্থ ইত্যাদি। কয়েকটা সেক্টর ঠিক কইরা ফেললেই ঠিকঠাক চলতে থাকবে রাষ্ট্রীয় সেবা। 

কথা হচ্ছে যারা ক্ষমতায় আছে, তারা সরকারের কাজটারে সেবা হিসেবে দেখা কিনা? এইটা পুরাপুরি দৃষ্টিভঙ্গি। ক্ষমতা হিসেবে দেখলে শাসন করতে চাইবেন, সেবা হিসেবে দেখলে সেবা করতে চাইবেন। আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই? 

আমরা এরকম এক রাষ্ট্র চাই যেখানে দুর্নীতি বলতে কিছু থাকবেনা। দুর্নীতিরকে ঘৃণা করবে সরকারের কর্মকর্তারা। বিশেষ সুবিধা দিতে চাইলেও নিবে না। যেখানে লুটপাট বলতে কিছু থাকবেনা। রাষ্ট্র হবে জনতার কল্যাণকামী। জনগণের কিসে কল্যান, কোথায় সবচেয়ে ভালো হবে সেটা বের করবে তারা। জনগণের মতের মূল্য দিবে, চাহিদার মূল্য দিবে। জনতার শ্রম আর আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিদান দিবে রাষ্ট্র। একটা রাষ্ট্র যেখানে কেউ না খেয়ে থাকবে না। যেখানে সবাই নির্ভয়ে চলাচল করবে, কারণ সে জানে তার কিছু হলে তার পেছনে তার রাষ্ট্র আছে। যেখানে এতিম বাচ্চারা বিকালে খেলবে, রাতে শান্তিতে ঘুমাতে যাবে, কারণ সে জানে তার রাষ্ট্র তাকে দেখে রাখবে। 

মালয়েশিয়াতে একবার অবৈধ লোক ধরপাকড় শুরু হলো, অবৈধদের ধরে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। মালয়েশিয়া রাষ্ট্রের সুন্দর একটা পলিসি আছে। প্রথম ২ বছরের ভিসায় লোক কাজের জন্য নেয়। মোট ১০-১২ বছর দেয়ার কথা। ২ থেকে ৪ বছর ভিসা দেয়ার পর ভিসা রিনিউ করা বন্ধ করে দেয়। কাজের জন্য যাওয়া লোকেরা অবৈধ হয়ে যায়। অবৈধ শ্রমিকদের কাছ থেকে পুলিশ টাকা খায়, শিল্পপতিরা কম টাকায় তাদের খাটায় নেয়। ধরা পরলে দেশে পাঠায়া দেয়। সে আবার বৈধভাবে আসে। সরকার আবার টাকা পায়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ফিলিপাইন আর ইন্দোনেশিয়ার লোক অবৈধ হয় বেশি। 

তো সেবার একটা ফ্লাইটে ভারতের প্রায় ৪০০ অবৈধ লোক দেশে ফেরত পাঠায় তারা। ভারত রাষ্ট্র কি প্রতিক্রিয়া দেখায় তাতে? ভারতের বিমানমন্ত্রী ফিরতি ফ্লাইটে মালয়েশিয়া আসে ২০ টা বিমান সাথে নিয়ে। এসে বলে মালয়েশিয়ায় কতজন ভারতীয় আছে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে? ১০-১২ লাখ। সবাইকে দেশে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনাদের দেশে আর কোনো ভারতীয় আসবে না কাজ করার জন্য। এতো সংখ্যাক লোক একবারে চলে গেলে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব পরবে। মালয়েশিয়ার পুনর্গঠনে এইসব শ্রমিকদের মূল্য জানে মালয়েশিয়া সরকার। -কি করা লাগবে? –অবৈধ করছেন আপনারা, বৈধও করবেন আপনারা। আপনাদের কাজের ভিসা দেয়া আপনাদের দায়িত্ব, ভারত সরকারের না। ফলাফলে সেই ৪০০ জন আবার মালয়েশিয়া ফেরত আসে। ভিসা পায়। ভারতীয় অবৈধদের জন্য ভিসা প্রসিডিউর সহজ করা হয়। 

আর বাংলাদেশের বিদেশ মিশনগুলোতে জুনিয়ার অফিসারদের সাথেও কথা বলা যায় না। কার সাথে কথা বলবে, এই অশিক্ষিত, নিজের নাম লেখতে পারে না, আগে কৃষক ছিলো পরে শ্রমিক হয়েছে, এর সাথে? বড় কোনো অফিসারকে সমস্যা খুলে বলা তো অসম্ভবই। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশীরা একলা। কোনো আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু থাকলে সে আছে আর নাইলে ঐ শ্রমিক একদম একা। রাষ্ট্র তার পাশে নাই। ঐটাতো বিদেশ, দেশেই রাষ্ট্র জনগণের পাশে নাই।

আচ্ছা, জনগণ সরকার বিরোধী হয়, নাকি সরকার জনগণ বিরোধী হয়? জনগণ তখনি সরকারের বিরুদ্ধে যায় যখন সরকার জনগণের বিপক্ষে থাকে। এর আগের আলাপে বলেছিলাম, দেশে যে আইনের শাসন নাই দুইএকটা উদাহরণ দেখলেই তা বোঝা যায়। আপনি জানেন না দিনের বেলা কাজে বের হয়ে সন্ধ্যায় ঠিকঠাক মতো বাসায় এসে পৌছাতে পারবেন কিনা? আপনার মেয়েটা সন্ধ্যায় টিউশনিতে গিয়ে রাত্রে বাসায় ফিরবে কিনা আপনি জানেন না। যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে তার কি বিচার হবে আপনি জানেন। এইরকম বিচারহীন রাষ্ট্র কে চায়? এইরকম রাষ্ট্রে কে থাকতে চায়?

রাষ্ট্রের এই অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য কাজ করা লাগবে। অনেক কাজ করা লাগবে একসাথে হয়ে। মানুষের জোটবদ্ধতাই মানুষের শক্তি। রাজনীতি খারাপ রাজনীতি খারাপ বলে, আই হেইট পলিটিক্স বলে, রাজনীতি থেকে দূরে থেকে আপনি নিজেও এই নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছেন। এইরকম অথর্ব দেশ প্রতিষ্ঠায় আপনারও অবদান আছে। রাজনীতি খারাপ এই ধারনা থেকে আমাদের বের হতে হবে। সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে হবে। 

তার আগে মনঃস্থির করতে হবে আপনি কেমন রাষ্ট্র চান? আপনার রাষ্ট্র আপনার সাথে, জনগণের অধিকারের সাথে কেমন আচরন করুক আপনি চান? দেশ আপনার, দেশ ভবিষ্যৎ এ কেমন হবে এটা ঠিক করার অধিকারও আপনার। চেষ্টা না করে কেবল হাহুতাশ করলে ভবিষ্যৎ ঠিক হবে না, এটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন। ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্য আলাপে অংশ নিন। চাইলে কমেন্টে আলাপে অংশ নিতে পারেন। না চাইলে ইনবক্সেও আলাপ করতে পারেন।