8 February 2026

জামায়াত কেন বারবার ইতিহাসের ভুল দিকে থাকে

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সুসংগঠিত ও আদর্শিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের সমাজ ও রাজনীতিতে অনেক বছর ধরেই গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিতে দলটি আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে, কথা থাকে ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বারবার ইতিহাসের ভুল দিকে ছিলো দলটি! ইতিহাসের ভুল দিক বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, বিস্তারিত না হলেও, কিছুটা হয়ত জেনে নেওয়া সম্ভব!

১। পাকিস্তান জন্মের বিরোধিতা

জামায়াতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জটিলতা শুরু হয় পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা দিয়ে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মওদুদীর দৃষ্টিতে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি রাষ্ট্র এক বিষয় ছিল না। দলটির লোকজন পূর্ণ শক্তি দিয়ে ভারতভাগের বিরোধিতা করে। তারা পাকিস্তানকে কাফেরদের রাষ্ট্র বলেও ট্যাগ দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর জামায়াত সেখানে রাজনীতি শুরু করলেও, ‘দেশবিরোধী’ (অর্থাৎ, পাকিস্তান-বিরোধী) তকমাটি তাদের ওপর দীর্ঘকাল ছায়ার মতো লেগে ছিল; যা সাধারণ মানুষের সাথে তাদের সংযোগ স্থাপনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি ও দাঙ্গা

পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পেরে, জামায়াত রাজনীতি করার জন্য একটি সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে। ১৯৫৩ সালে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানায়। শুধু দাবি জানিয়ে ক্ষান্ত হয়নি দলটি। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সংঘবদ্ধ দাঙ্গা ঘটায় দলটি। লাহোরে কাদিয়ানীদের বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদে (বা উপাসনালয়) আক্রমণ করে জামায়াতের কর্মীরা। এসময় কাদিয়ানীদের সহায়-সম্পত্তি লুট করা হয়, প্রায় ২০০-এর মতো কাদিয়ানীকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তান। ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর জামায়াতের কর্মীদের সংঘবদ্ধ আক্রমণ (মব-সন্ত্রাস বা অনলাইনে বটবাহিনী) আজকে নতুন কিছু নয়। এটা তাদের অনেক পুরনো প্রবণতা। মূলত দলীয় ক্যাডারভিত্তিক কাঠামোর কারণে এই আক্রমণ করা তাদের জন্য বেশ সহজ।

৩। নারী নেতৃত্ব হারাম ফতোয়া দিয়েও ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন

জামায়াত মনে করে নারী নেতৃত্ব হারাম। অথচ তাদের বেশিরভাগ সময়েই নারীদের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে রাজনীতি করতে হয়। এটাকে তারা ‘কৌশল’ হিসেবে উপস্থাপন করে। এই কিছুদিন আগেও তারা বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বে জোটসঙ্গী হিসেবে ছিলো। ১৯৯১ সালে প্রথম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মেনে নেয় বাংলাদেশ জামায়াত এরপর, ১৯৯৪ সালে তার ওপর অনাস্থা এনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ছায়ায় যায়। এরপর ২০০১ সালে আবার জোট করে খালেদা জিয়ার সাথে সংসদে আসে, দলটির দুইজন মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে। তবে, এই কৌশলের ইতিহাসও বেশ পুরনো। পাকিস্তানেও ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দেয় জামায়াত। অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে পরে কৌশলগত ও আদর্শিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

৪। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) ভূমিকা

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ছিল দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক বিপর্যয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে সমর্থন ও সাধারণ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোয় দলটির ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত দলটিকে সারাবিশ্বে গণবিরোধী ও প্রগতি-বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করার পেছনে কারণ হিসেবে ছিলো, পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিরোধীতা করার যে ভুল, তার কাফফারা দেওয়া।

সক্রিয়তার পাশাপাশি, দলটি বাংলাদেশ-বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের (মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি) তুলনায় বেশি তৎপর ছিলো। নিজেদের পাকিস্তানপন্থী প্রমাণ করতে এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল তারা। এই অতি-সক্রিয়তা ও অতি-তৎপরতা আমরা ছাত্রলীগের মাঝে লুকিয়ে থাকা ছাত্রশিবিরের (জামায়াতের ছাত্র সংগঠন) মাঝেও দেখেছি; সেখানে নিজেদের ছাত্রলীগ প্রমাণ করতে তাদের সবকিছুই(!) একটু বেশি বেশি করতে হয়েছে। যাই হোক, এটাকেও তারা একটি কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করে।

৫। জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় যোগদান

এরপর, জেনারেল জিয়াউল হকের (১৯৭৭-১৯৮৭) সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে পাকিস্তান জামায়াতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল একটি বড় রাজনৈতিক ভুল। জেনারেল জিয়ার ইসলামীকরণের প্রলোভনে পড়ে তারা স্বৈরশাসকের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে পাকিস্তান জামায়াত সেখানকার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের সমর্থন হারায়। এরপর, নব্বইয়ের দশকে বেনজীর ভুট্টোর পিপিপিকে রুখতে এস্টাবলিশমেন্টের (পাকিস্তান মিলিটারি) পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত আইজেআইতে যোগ দেয় জামায়াত। ফলে, দলটি নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের লেজুড়বৃত্তিক দলে পরিণত হয় ও নিজস্ব ভোটব্যাংক হারায়।

৬। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অস্পষ্ট নীতি

এরপর, জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল দোদুল্যমান। একদিকে রাজপথে আন্দোলন, অন্যদিকে সরকারের সাথে সমঝোতা, এই দ্বিমুখী নীতি সমর্থকদের বিভ্রান্ত করে। অন্যদিকে, পাকিস্তানি তালেবান যখন দেশটিতে হামলা চালাচ্ছিল, তখনও জামায়াতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট। তারা সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করলেও সরাসরি টিটিপির নাম নিয়ে সমালোচনা করতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। এই মনোভাব পাকিস্তানিদের মধ্যে জামায়াত সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি করে।

৭। হাতিয়ার হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার

জামায়াত প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইসলামকে যথেচ্ছা ব্যবহার করে আসছে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার সময় তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে, কারণ এতে নাকি উপমহাদেশের ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাকিস্তান ১৯৫৬ সালে নতুন সংবিধানে নিজেদের ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করলে, এটাকে জামায়াত নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখে। আবার, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়, তারা বিরোধিতা করে; এবং পাকিস্তান আর্মির সাথে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগী হয়। কারণ হিসেবে, এবারও ইসলামকে ব্যবহার করে তারা, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে নাকি ইসলাম বিপন্ন হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে জামায়াতের কাছে কথা বলার মতো খুব বেশি বিষয় নেই।

তবে মনে রাখা ভালো, ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক একটা গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। গণভোটটি ছিলো মূলত জিয়াউল হককে ক্ষমতায় রাখতে চান কিনা! তবে সেখানে শব্দগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, ‘না’ ভোট দেওয়ার মানে হলো আপনি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে পাকিস্তানের আইন চলুক, এটা চান না। যাই হোক, না জানলেও ক্ষতি নেই, হাস্যকর সেই গণভোটে ‘হ্যা’ পড়েছিল ৯৮.৫৩%। একইভাবে, জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা ইসলামের বিরুদ্ধে চলে যা! জামায়াতে ইসলামের কথা মতো না চললে, সেটা ইসলামবিরোধিতা হয়ে যা, কোরআন-সুন্নাহের বরখেলাফ হয়ে যা

ষাটের দশকের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি করা কঠিন। জামায়াত তাদের দলীয় কাঠামো আধুনিক করতে দেরি করে ফেলেছে। সম্ভবত, এবারই প্রথমবারের মতো (হয়ত একমাত্র) গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি হিসেবে ইতিহাসের ঠিক দিকে রয়েছে তারা। কিন্তু, ধারণা করা যায়, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক স্বভাবের কারণে, খুব দ্রুতই তারা আবার মানুষের মুক্তির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিবে। নিজেদের সবকিছু ইসলামের নামে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।

সামনে ভোট, আর আমাদের সামনে খুব বেশি সুযোগও নেই। দেখা যাক কী হয়!