27 September 2016

আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে তুরস্কের গল্প

মানচিত্রঃ তুরস্ক ও তার প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহ।

তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভাবতে পছন্দ করে। তার কাজ কর্মে তাই পরাশক্তি পরাশক্তি একটা প্রভাব পরে। অবস্থানগত দিক থেকে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত, কিছুটা অংশ ইউরোপ ভূখন্ডে পরেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এর পর আমেরিকার সবচেয়ে ভালো বন্ধু তুরস্ক।
তুরস্ক প্রথম মুসলিম দেশ যে ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমেরিকা ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করে দূর থেকে, আর পাশে থেকে স্বার্থ রক্ষা করে তুরস্ক।
সাইপ্রাস, গ্রীসের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য গণভোট নেয়। গণভোটে সাইপ্রাসের জনগণ গ্রীসের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়। তুরস্ক সাইপ্রাসে সেনা পাঠায়। সাইপ্রাসকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেয়, উত্তর সাইপ্রাস নামে সাইপ্রাসীয় তুর্কীদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্মেনিয়া স্বাধীনতা চায়। সেই আন্দোলন কঠোর ভাবে দমন করে তুরস্ক। আর্মেনিয়াতে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। সেই গণহত্যায় ১৫-১৮ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়, স্বাধীনতা চাওয়ার অপরাধে।
বর্তমান সময়ে ইসলামি খেলাফত রাষ্ট্র, 'ইসলামিক স্টেট' এর পেছনেও তুরস্কের ভূমিকা রয়েছে। তুরস্ক কেনো ইসলামিক স্টেট কে সমর্থন করে? তুরস্ক সিরিয়া থেকে তেল যে দামে কিনতো, তার চার ভাগের এক ভাগ দামে কিনে ইসলামিক স্টেট থেকে। ইসলামিক স্টেট এর চোরাই তেল আর প্রত্ন-সম্পদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তুরস্ক। আবার অপরদিকে তারা সিরিয়া এবং ইরাকের কুর্দিরা যে স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তার বিরোধী। এমনকি তুরস্কে কুর্দি, কুর্দিস্তান, আনাতোলিয়া এই শব্দগুলো পর্যন্ত নিষিদ্ধ; যদিও তুরস্কের ২০% জনগণ কুর্দি। সে তার নাকের ডগায় এরকম স্বাধীন কুর্দিস্তান দেখতে চায় না। সিরিয়া এবং ইরাক ভেঙে ইসলামিক স্টেট হলে তুরস্কের আপত্তি নাই, কুর্দিস্তান হলে আপত্তি আছে।

তুরস্কের পতাকা

তুরস্ক কেবল আর্মেনিয়াতে গণহত্যা চালিয়েছে এমনটা ভাবলে ভুল হবে। যারাই তুরস্ক থেকে স্বাধীনতা চেয়েছে, তাদের উপরই গণহত্যা চালিয়েছে তুরস্ক। গ্রীস স্বাধীনতা চাওয়ায়, প্রায় ৯ লাখ লোককে হত্যা করা হয়। কসোভো, আলবেনিয়া, সার্বিয়া তে গণহত্যা চালায়। সেখানে মারা যায় প্রায় ৩ লাখ লোক। সিরিয়াতে আশিরিয় লোকেদের উপর গণহত্যা চালায় তুরস্ক। সেখানে মারা যায় প্রায় ২-২.৫ লাখ লোক। কুর্দিদের উপর বিভিন্ন সময় গণহত্যা চালানো হয়। বেশি চালানো হয় সিরনাক, ভান, হাক্কারি ও দিয়ারবাকির প্রদেশে। সেগুলোতে প্রায় ৮-১০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। ছোটোখাটো গণহত্যার কথাতো বাদ, যেগুলোতে হাজারের ফিগারে লাশ গুনা হয়েছে। কোনো গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়া দূরে থাক, স্বীকার পর্যন্ত করে নি তুরস্ক।
তুরস্ক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঢুকতে চায়। ইউরোপীয় সমাজ তুরস্ককে গ্রহন করতে নারাজ। কারন ইউরোপের এই রুগ্ন ব্যাক্তিটি ইউনিয়নে ঢোকার পর জার্মানি, ফ্রান্সের সমান মর্যাদা চাইবে। ইউরোপের ছোটো ছোটো জাতিরাষ্ট্র গুলোই, ইউনিয়নে তুরস্ককে চায় না।
মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো ঘটনায় তুরস্ক নাক গলায়। বিষয়টা- 'গায়ে মানে না, আপনি মোড়ল' টাইপ। সে সবাইকে পরামর্শ দিতে যায়, কেউ শুনতে চায় না। কারন সেখানে সবচেয়ে বেশি থাকে তুরস্কের স্বার্থ। আর কম করে হলেও আমেরিকার স্বার্থ থাকে সেখানে। এই চরিত্র এখন, জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (তুর্কী ভাষায়, এ.কে. পার্টি) আসার পর হয় নি। আগে থেকেই ছিলো। এর আগে স্যেকুলার সরকার থাকার সময়ও একই ভাবে নাক গলাতো তুরস্ক। এখন এই পার্টির সময়, সেটা বিস্তৃত হয়েছে। এখন মরোক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া, সব মুসলিম দেশে তাদের স্বার্থ বর্তমান। আর লোকেশন আশপাশে হলে, ইহুদী-খ্রিস্টিয়ান রাষ্ট্র নির্বিশেষে তুরস্কের স্বার্থ বর্তমান।

No comments:

Post a Comment