৫
যুদ্ধবিগ্রহ
আজটেক সভ্যতায় যুদ্ধ খুবই গুরুত্ব বহন করতো। আজটেক
সমাজে যুদ্ধের গুরুত্ব ছিলো প্রধানত দুই কারনে। প্রথম কারন অর্থনৈতিক। আজটেকদের
কৃষি এবং বাণিজ্যের প্রসারের জন্য নতুন নগররাষ্ট্রে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা বা সম্প্রসারণ
করা জরুরি ছিলো। দ্বিতীয় কারন ধর্মীয়। আজটেকদের ধর্মীয় প্রথাগুলোর মধ্যে অত্যন্ত
গুরুত্ব বহন করতো- নরবলি। আজটেকরা নিজেদের
নাগরিকদের সাধারণত বলি দিতে চাইতো না। ফলে নতুন নতুন অঞ্চলে যুদ্ধের মাধ্যমে
প্রাপ্ত যুদ্ধবন্দীদের ধরে নিয়ে এসে বলি দেয়া হতো। বিভিন্ন ধর্মীয় কারনে এক বছরে
২০,০০০ পর্যন্ত নরবলি দেয়ারও
উদাহরণ আজটেক সভ্যতায় আছে।
আজটেক সংস্কৃতিতে যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করতো। আজটেকরা যোদ্ধা জাতি। পুরুষ আজটেকদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত
হতো তাদের যুদ্ধের ভূমিকার উপর। সমস্ত আজটেক পুরুষ সদস্যদের জন্য সামরিক শিক্ষা
নেয়া বাধ্যতামূলক ছিলো। এমনকি আজটেক নারীরাও যুদ্ধের সংস্কৃতিতে বাস করতো।
সন্তানজন্মদানকে আজটেক সমাজে সম্মুখযুদ্ধের সাথে তুলনা করা হতো। শিশুজন্মের সময়
মৃত্যুবরণকারী মায়েদের, যুদ্ধে
মৃত সৈনিকের মর্যাদা দেয়া হতো। আজটেক স্কুলগুলোতে যুদ্ধের সরঞ্জাম আর কলাকৌশল
সম্পর্কে শেখানো হতো। আজটেক স্কুলগুলোর উদ্দেশ্য ছিলো সমাজের জন্য ভালো যোদ্ধা
তৈরী করা।
৫.১ সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দাবাহিনী
আজটেক
সেনাবাহিনীর প্রধান
ছিলেন
সম্রাট
নিজে। তারপর তার চিহুয়াকোয়াত্ল (সহকারী) ছিলেন
সেনাবাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তারপর ছিলো চারজন প্রধান সেনাধ্যক্ষের সমন্বয়ে
গঠিত একটি ‘যুদ্ধসংক্রান্ত সর্বোচ্চ পরিষদ’। তারপর ‘শিকুইপিল্লি’ বা ব্যাটেলিয়ন।
আজটেক সেনাবাহিনী খুবই সংঘবদ্ধ ছিলো। প্রথমেই সেনাদের ৪ বা ৫ জনের একটা ইউনিট করা
হতো। এরকম ৪ বা ৫ টি ইউনিটে হতো একটি স্কোয়াড। প্রতিটি স্কোয়াডে থাকতো ২০ জন সেনা।
প্রতিটি ইউনিট গঠিত হতো একই স্কুল বা এলাকা থেকে,
যেনো তাদের মধ্যে সহযোগীতার মনোভাব থাকে। প্রতিটি
স্কোয়াডে থাকতো একজন করে গ্রুপলিডার। এরকম ২০ টি স্কোয়াড নিয়ে হতো একটি রেজিমেন্ট।
অর্থাৎ প্রতিটি রেজিমেন্টে ছিলো ৪০০ করে সেনা। প্রতিটি রেজিমেন্টের দায়িত্বে
থাকতেন একজন সেনাপতি। এরকম ২০ টি রেজিমেন্ট নিয়ে তৈরী হতো একটি কমান্ড। অর্থাৎ
প্রতিটি কমান্ডে ছিলো ৮,০০০
সেনা। কমান্ডের দায়িত্বে থাকতেন একজন সেনাধ্যক্ষ কমান্ডার।
২০ আজটেকদের নিকট পবিত্র সংখ্যা। সেনাবাহিনীর
সদস্যসংখ্যা ২০ দিয়ে যেনো বিভাজিত হয় এদিকে তারা খেয়াল রাখতো। এছাড়া আজটেক
সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন র্যাংকের বিশেষায়িত সেনাসদস্য থাকতো। এদের মধ্যে
উল্লেখযোগ্য- ঈগল যোদ্ধা, জাগুয়ার
যোদ্ধা, কোয়োতে যোদ্ধা ইত্যাদি।
![]() |
| র্যাংক অনুযায়ী আজটেক সেনাবাহিনী। বাম থেকে; ঈগল যোদ্ধা, জাগুয়ার যোদ্ধা, কোয়োতে যোদ্ধা এবং সাধারণ যোদ্ধা। |
আজটেক গোয়েন্দাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলো।
গোয়েন্দাদের বলা হতো- ‘সম্রাটের চোখ ও কান’। সাধারণ আজটেকরা এদের ডাকতো ‘কুইমিশিন’
অর্থাৎ ইঁদুর। আজটেক গোয়েন্দা হিসেবে মূলত কাজ করতো ব্যবসায়ীরা। কারন তাদের সব
জায়গায় যাওয়ার অধিকার ছিলো, এমনকি
শ্ত্রুরাষ্ট্রেও। তারা বাণিজ্যের পাশাপাশি খবর সংগ্রহ করতো। শহরের বিবরণ, শহরের অধিবাসী,
তাদের প্রস্তুতি,
তাদের সৈন্যসংখ্যা ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে
ব্যবসায়ীদের খোঁজখবর আনতে হতো। এমনকি ব্যবসায়ীদের নদী,
পাহাড় সমেত মানচিত্র তৈরী করতে হতো। এ বিষয়ে
ব্যবসায়ীরা সম্রাটের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা পেতো। কোনো কারণে কোনো ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হলে তার
ফলাফল অবশ্যই হতো যুদ্ধ। এরা ছাড়াও সাম্রাজ্যের সেনা-গোয়েন্দাবাহিনী ছিলো। তারা
ছিলো অত্যন্ত চৌকস। তাদের প্রতিপক্ষের ভাষা শেখানো হতো,
কাপড়, কথা বলার ধরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি
সব শেখানো হতো। এমনকি চুলও কাটা হতো শত্রুপক্ষের মতো করে। যুদ্ধের প্রস্তুতির সময়
তাদের পাঠিয়ে দেয়া হতো শত্রু রাজ্যে। যুদ্ধ শুরুর আগে তারা ফেরত আসতো।
৫.২ অনুশীলন ও যুদ্ধাস্ত্র
আজটেক শিশুদের যুদ্ধের কলাকৌশল শেখার জন্য দুই
ধরনের স্কুল ছিলো। প্রথম- কালমেকাক। কালমেকাক মূলত রাজপরিবার ও উচ্চ অভিজাতদের
জন্য বিশেষ স্কুল। সেখানে সবই শেখানো হতো। তবে যাজকীয় পাঠ এবং যুদ্ধসংক্রান্ত
বিদ্যার প্রতি আজটেক সমাজের বিশেষ নজর ছিলো। দ্বিতীয়- তেল্পোশকাল্লি।
তেল্পোশকাল্লিতে সবাই পড়তে পারতো। এটা মূলত সেনাস্কুল। এখানে আজটেক শিশুরা পড়তে
আসতো সৈনিক বা যোদ্ধা হওয়ার জন্য। তবে পাশাপাশি জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় হাতের
কাজও শেখানো হতো। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলন স্কুলেই করানো হতো। যুদ্ধে
পাঠানোর আগে যোদ্ধা শারীরিক এবং মানসিকভাবে তৈরী হয়েছে কিনা তা যাচাই করা হতো।
স্কুলের শিক্ষানবীস যোদ্ধাদের কঠোর পরিশ্রম,
অনুশীলন এবং আনুশাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
আজটেকদের প্রধান যুদ্ধাস্ত্র ছিলো- তীর এবং বর্শা।
তারা ঢাল ব্যবহার করতো। তবে তীর, বর্শা
এবং ঢালে আজটেকদের নিজস্বতার ছাপ পাওয়া যায়। তারা ‘মাকুহুইত্ল’ নামে একধরনের
তলোয়ার ব্যবহার করতো। এই তলোয়ার ছিলো কাঠের তৈরী। কাঠের পাতের দুইপাশে কাচের মতো
দেখতে একপ্রকার আগ্নেয়শিলার ব্লেড লাগানো থাকতো। যুদ্ধক্ষেত্রে এই অস্ত্র ছিলো
খুবই মারাত্মক।
![]() |
| আজটেক তলোয়ার 'মাকুহুইত্ল' |
৫.৩ যুদ্ধের কৌশল ও
যুদ্ধবন্দী
আজটেকরা সাধারণত দিনের বেলায় যুদ্ধ করতো, রাতের বেলায় যুদ্ধ করতে চাইতো না তারা। যুদ্ধের
জন্য খোলা ময়দান ছিলো জরুরি। নদী, পাহাড়
বা ঘন জঙ্গলে যুদ্ধ বাধ্য না হলে এড়িয়ে চলতো। যুদ্ধ হতো সর্বাত্মক। আজটেকদের
যুদ্ধে পরাজয়ের তেমন কোনো উদাহরণ নাই। যুদ্ধ মানেই ছিলো আজটেকদের জয়। এজন্য
কমশক্তিশালী নগররাষ্ট্ররা আজটেকদের সাথে যুদ্ধে যেতে চাইতো না। আজটেকরাও যথাসম্ভব
যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাইতো, কারন
তারা চাইতো বাণিজ্যের প্রসার। যুদ্ধে আজটেকরা প্রথমে আত্মসমর্পনের জন্য আহবান
জানাতো। এতে রাজি না হলে শত্রুপক্ষকে যথাসম্ভব চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা ছিলো তাদের
কৌশল। আজটেকদের প্রধান যোদ্ধারা সম্মুখযুদ্ধের জন্য আহবান জানাতো। যুদ্ধ চলাকালীন
সময়ে আজটেকরা শত্রুদের পুরোপুরি মেরে ফেলাতে বিশ্বাসী ছিলো না। তারা বড়জোড় আহত
করতো এবং যথাসম্ভব জীবিত আটক করতে চাইতো। যুদ্ধে আটক বন্দীদের পরে বলি দেয়া হতো।
তবে আত্মসমর্পন করলে আজটেকরা যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করতো না। যুদ্ধজয়ের পর আজটেকরা
স্বীকৃতি ও অর আদায় করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজেদের রাষ্ট্রে ফেরত যেতো। বিজিত
অঞ্চলের আগের শাসনকর্তাকেই তারা বহাল রাখতে চাইতো।
যুদ্ধে বন্দীদের সাথে করে আজটেক সাম্রাজ্যে নিয়ে
আসা হতো। তাদের জন্য দুই ধরনের নরবলির ব্যবস্থা ছিলো। এক- যোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুবরণ
করা। এখানে একটা গোল বড় চাকতির উপর পরাজিত যোদ্ধাকে আজটেক যোদ্ধাদের সাথে লড়াই
করতে দেয়া হতো। বিজিত যোদ্ধাকে আজটেক যোদ্ধার চেয়ে অগ্রসর যুদ্ধাস্ত্র দেয়া হতো।
যোদ্ধাদের লড়াই প্রাণঘাতি হতো। বিশেষ গোল চাকতির উপর লড়াই করতে করতে মৃত্যুবরণ করা
যোদ্ধাকে দেবতার উদ্দেশ্যে বলিকৃতের মতো সম্মান দেয়া হতো। দুই- সরাসরি বলি দেয়া।
সরাসরি বলি দেয়ার জন্য আলাদা মঞ্চ ছিলো। যুদ্ধবন্দীকে সেই মঞ্চে প্রথমে নিয়ে যাওয়া
হতো। তারপর তাকে ধরে রাখতেন চারজন পুরোহিত। আর একজন পুরোহিত সরাসরি তার
বক্ষবিদির্ণ করে হৃৎপিণ্ড বের করে আনতেন। হৃৎপিণ্ড প্রথমে আজটেকদের প্রধান দেবতা
হুইটসিলোপোশ্তলিকে উৎসর্গ করা হতো। তারপর তা এক বিশেষ পাত্রে রাখা হতো।
৫.৪ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধবিগ্রহ
আজটেকরা যুদ্ধবিগ্রহে জড়িত হয় সাম্রাজ্য হয়ে ওঠার
পর। মূলত ১৪৪০ যিশুসনের পর আজটেক সাম্রাজ্য আকার-আয়তনে বাড়তে থাকে। শত্রুর সংখ্যাও
তখন বেড়ে যায়। আজটেকরা মনে করতো, আক্রমন করাই সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ। আজটেক ইতিহাসে
যে কয়েকটা সর্বাত্মক যুদ্ধে পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৪৫৮ যিশুসনের
কোইত্লাহুয়াকানের যুদ্ধ। কোইত্লাহুয়াকান ছিলো শত্রুজাতি মিহতেকদের রাজ্য।
আজটেকরা রাজধানী তেনোশতিতলান থেকে ৫০০ মাইল দূরে প্রায় ৩ লক্ষ যোদ্ধাসহ কোইত্লাহুয়াকান
আক্রমন করে। এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন সম্রাট নিজে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর কোইত্লাহুয়াকান
আজটেক সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত হয়। এরকম ১৪৬৮ যিশুসনের তেহুয়ানতেপাকের যুদ্ধ, ১৪৯৭
যিশুসনে চিয়াপাসের যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।



No comments:
Post a Comment