৮
ভাষা
ও
সাহিত্য
আজটেক ভাষা ছিলো খুবই সমৃদ্ধ।
আজটেকদের ভাষার নাম ছিলো- ‘নাহুয়াত্ল’। নাহুয়াত্ল ‘উতো-আজতেকান’ ভাষাপরিবারের সদস্য।
নাহুয়াত্ল এখনো জীবিত ভাষা। বর্তমান মেহিকো রাষ্ট্রে নাহুয়াত্ল দ্বিতীয় বৃহত্তম
ভাষা, প্রথম স্প্যানিশ। নাহুয়াত্ল ভাষা সাহিত্যেও সমৃদ্ধ। বর্তমানে তেমন সাহিত্য
রচিত না হলেও একসময় নাহুয়াত্ল প্রভাবশালী সাহিত্যের ভাষা ছিলো। এমনকি আশাপাশের
জাতিগুলো তখন নাহুয়াত্ল ভাষা ব্যবহার করে সাহিত্য রচনা করতো। সাহিত্য রচনার
ক্ষেত্রেও আজটেকরা মনে করতো এটা বংশানুক্রমিক, অর্থাৎ সাহিত্যের গুণ পুত্র পায়
তার পিতার কাছ থেকে।
৮.১ ভাষা
আজটেকদের ভাষা এখন স্প্যানিশ
দ্বারা প্রভাবিত। তবে একইভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় নাহুয়াত্ল শব্দ আছে। সবচেয়ে
বেশি নাহুয়াত্ল শব্দ প্রবেশ করেছে স্প্যানিশ ভাষায়। সেখান থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং
তারপর পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায়। কমপক্ষে দুইটা নাহুয়াত্ল শব্দ আমরা বাংলা ভাষায়
প্রায় প্রত্যেকদিন ব্যবহার করি। টমেটো এবং চকোলেট। টমেটো শব্দটার মূল নাহুয়াত্ল-
‘তোমাত্ল’ এবং চকোলেট এর মূল- ‘চকোলাত্ল’। এছাড়া স্প্যানিশ এবং ইংরেজি ভাষা আরো বিভিন্ন শব্দের জন্য নাহুয়াত্ল ভাষার
কাছে ঋণী।
নাহুয়াত্ল ভাষার অনেকগুলো
উপভাষা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ইশ্তমুশ, মেহিকানেরো, পিপিল, মিশোয়াকান, পোমারো, তেতেল্কিঙ্গো
ইত্যাদি। দুইএকটা ব্যঞ্জনবর্ণ উচ্চারণে সামান্য তারতম্য ছাড়া উপভাষাগুলোতে তেমন
কোনো পার্থক্য নেই। এক উপভাষা ব্যবহারকারী অপরকে বুঝতে পারে এবং নিজেরা যোগাযোগ
করতে পারে। আজটেক ভাষায় মৌলিক স্বরধ্বনি ছাড়াও রয়েছে ব্যঞ্জনধ্বনি। তবে আজটেকদের
ব্যবহৃত নাহুয়াত্ল ভাষায় ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। বর্তমানে স্প্যানিশ
বিভিন্ন উচ্চারন নাহুয়াত্ল ভাষায় প্রবেশ করেছে। আজটেকদের ব্যবহৃত নাহুয়াত্ল
ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো হলো- ম, ন, প, ত, ক, ক্ব,
ট্স, ত্ল, ত্শ, স, ল, শ, হ এবং য়। শব্দের শেষ ‘হ’
অনুচ্চারিত থাকতো। ত্ল, ত্শ শব্দগুলো উচ্চারণের সময় অনুরণিত হতো। ‘স’ এর
উচ্চারণ ক্ষেত্রবিশেষে ‘য’ এর মতো হতো।
আজটেকরা মূল শব্দের সাথে ‘ত্ল’
এবং ‘ত্লি’ উপসর্গ যুক্ত করতো। নাহুয়াত্ল ভাষায় সন্ধির উদাহরণও আছে। যেমন- হোশিত্ল মানে ফুল এবং মিল্লি মানে মাঠ বা বাগান। ফুলের বাগান হবে
হোশি(ত্ল)+মিল্লি বা হোশিমিল্লি। আজটেকরা একটা পুরো বাক্যও এক শব্দের মতো বলতো।
যেমন- মিত্যমোত্যাতযাকুইলতিতিমানিযকু অর্থাৎ তারা তোমার পক্ষে যাবে, হয় বামে নয় ডানে।
৮.২ লেখনরীতি
আজটেকদের লেখনরীতি ছিলো
চিত্রভিত্তিক। প্রতিটি শব্দের জন্য একটি চিত্র। অনেকসময় একই শব্দ বিভিন্ন চিত্রে
বোঝানো হতো, আবার একই চিত্র দিয়ে বিভিন্ন শব্দ বোঝানো হতো। এই ধোঁয়াশার কারণে আজটেকদের
লেখনরীতি যথেষ্ট দুর্বোধ্য। আজটেকদের সময়ে সবাই লিখতে পারতো না। লেখার ক্ষমতা
কাউকে কাউকে দেয়া হতো। তবে সবাই পড়তে পারতো। এখন নাহুয়াত্ল ভাষা লেখা হয়
স্প্যানিশ বা রোমান লিপি ব্যবহার করে।
৮.৩ গণনারীতি
আজটেকদের গণনা ছিলো ২০ ভিত্তিক। হাতের ১০ আঙুল এবং
পায়ের ১০ আঙুল, এই থেকে আজটেকদের ২০। আজটেকদের
১-৪ পর্যন্ত গণনা ছিলো সোজা, এরপরের
গণনা একটু কঠিন। তবে পাঁচটা মূল শব্দের মাধ্যমে গণনাকে সহজ করা যেতো। মূলশব্দগুলো
হলো- সেম বা সেন, মাতলাক্তলি, পহুয়াল্লি,
যোন্তলি এবং সিকুইপিল্লি। আজটেকদের সংখ্যাগুলো
নিচে দেয়া হলোঃ
|
সংখ্যা
|
নাহুয়াত্ল
|
সংখ্যা
|
নাহুয়াত্ল
|
|
১
|
সে
|
২১
|
সেম্পহুয়াল্লিয়নসে
|
|
২
|
ওমে
|
২৯
|
সেম্পহুয়াল্লিয়নশিসোনাহুই
|
|
৩
|
ইয়েই
|
৩০
|
সেম্পহুয়াল্লিয়নমাতলাক্তলি
|
|
৪
|
নাহুই
|
৩৯
|
সেম্পহুয়াল্লিয়নসাহতোল্লিয়ন্নাহুই
|
|
৫
|
মাকুইল্লি
|
৪০
|
ওম্পহুয়াল্লি
|
|
৬
|
সিচুয়াসে
|
৬০
|
ইয়েইপহুয়াল্লি
|
|
৭
|
সিচোমে
|
৮০
|
নাউহপহুয়াল্লি
|
|
৮
|
সিচুয়েই
|
১০০
|
মাকুইল্পহুয়ালতেত্ল
|
|
৯
|
সিচোনাহুই
|
৪০০
|
সেন্তযোন্তলি
|
|
১০
|
মাতলাক্তলি
|
৪০১
|
সেন্তযোন্তলিয়নসে
|
|
১১
|
মাতলাক্তলিয়নসে
|
৪০৫
|
সেন্তযোন্তলিয়নমাকুইল্লি
|
|
১২
|
মাতলাক্তলিওমোমে
|
৫০০
|
সেন্তযোন্তলিইপানমাকুইল্পহুয়াল্লি
|
|
১৩
|
মাতলাক্তলিওমেই
|
৮০০
|
ওমযোন্তলি
|
|
১৪
|
মাতলাক্তলিওন্নাহুই
|
১,২০০
|
ইয়েতযোন্তলি
|
|
১৫
|
সাহতোল্লি
|
৪,০০০
|
মাতলাক্তযোন্তলি
|
|
১৬
|
সাহতোল্লিয়নসে
|
৮,০০০
|
সেমসিকুইপিল্লি
|
|
১৭
|
সাহতোল্লিওমোমে
|
১৬,০০০
|
ওমসিকুইপিল্লি
|
|
১৮
|
সাহতোল্লিওমেই
|
২৪,০০০
|
ইয়েসিকুইপিল্লি
|
|
১৯
|
সাহতোল্লিওন্নাহুই
|
৮০,০০০
|
মাতলাকসিকুইপিল্লি
|
|
২০
|
সেম্পহুয়াল্লি
|
৩২,০০,০০০
|
সেন্তযোনসিকুইপিল্লি
|
টেবিলঃ আজটেক সংখ্যা।
সংখ্যাগুলো লেখায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ১-৪
পর্যন্ত আজটেকরা ডট ব্যবহার করতো। ১- ১ ডট,
২- ২ ডট, ৩- ৩ ডট। পাঁচে যাওয়ার পর ব্যবহার করতো একটা বক্স বা বার। আবার ৬-৯ এর
ক্ষেত্রে বার এর উপর একটা ডট, দুইটা
ডট। এভাবে ১০ প্রকাশ করতো একটা বারের ভিতর আরেকটা বার। ২০ ব্যবহার করতে একটা পতাকা, ৪০ দুইটা পতাকা। ৪০০ এর জন্য একটা পাতা। ৮০০ এর
জন্য দুইটা পাতা।
৮.৪ সাহিত্য
আজটেকদের ছিলো সমৃদ্ধ সাহিত্য। সাহিত্যের মধ্যে ছিলো কবিতা। প্রাচীন আজটেক সাহিত্যধারায়
কবিতাই ছিলো মুলস্রোত। প্রার্থনা, স্তুতি,
লোককথা এমনকি দার্শনিক
চিন্তাভাবনা পর্যন্ত কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। দার্শনিক চিন্তাভাবনা যারা
কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করতেন তাদের বলা হতো- কবি-দার্শনিক। কবিতার ভাষা ছিলো সহজবোধ্য
যেনো সাধারণ জনগন তা বুঝতে পারে। কবিতার ভাষায় গল্প বলারও প্রচলন ছিলো আজটেক সমাজে।
আজটেক সমাজের কিছু বিখ্যাত কবি এবং কবি-দার্শনিকের
নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- তেহকোকোর
শাসক নেযাহুয়াল্কোয়োত্ল, তেনোশতিতলান এর
তোশিহুইতযিন, ত্লাতেলোল্কো এর তেমিলোতযিন, তেকামাশাল্কো
এর যুবরাজ আয়োসুয়ান সুয়েতযপালিন, হুয়েহুতযিঙ্কো এর তেকায়েহুয়াতযিন, কবি-দার্শনিক
সুয়াউহতেকোযত্লি। কালের বিবর্তনে এবং স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে এখন বেশিরভাগ আজটেক
কবিতাই হারিয়ে গেছে। কিছু কবিতা কেবল রয়ে গেছে আজটেকদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের উদাহরণ
হিসেবে।
No comments:
Post a Comment