Showing posts with label আইনের শাসন ও দুর্নীতি. Show all posts
Showing posts with label আইনের শাসন ও দুর্নীতি. Show all posts

10 November 2019

স্বার্থ ও দ্বন্দ্ব : আন্দোলনে নানামুখী রাজনীতি


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন চলছে। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নানান পক্ষ সক্রিয় হয়েছে। পক্ষে বিপক্ষে নানান কথা-বার্তা, যুক্তি-তথ্য উপস্থাপন, কার্টুন-দেয়াল লিখন, ঝগড়া-বিতণ্ডা চলছে। এমনকি সারা দেশের জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে এটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তো আমাদের জানা দরকার সেই আন্দোলন কারা করছে? কেন করছে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলাম দেশের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান তৈরী করে নিয়েছেন। কিন্তু তার স্বার্থকতা এর আগের উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেনকে পদচ্যুত করার আন্দোলনে তিনি শামিল ছিলেন। তিনি আগে থেকেই জানেন একজন উপাচার্যের কি করা উচিত, কোথায় কোথায় একজন উপাচার্য দুর্নীতি করতে পারে এবং কখন একজন উপাচার্যকে পদত্যাগ করানোর জন্য আন্দোলন করা হয়।

চলমান এই আন্দোলনে বেশ কয়েকটি পক্ষ আছে, যেমন সব আন্দোলনেই থাকে। একপক্ষে উপাচার্য নিজে, তার সাথে উপাচার্যপন্থী শিক্ষক এবং ছাত্রলীগের একাংশ। অপরদিকে উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকেরা, ছাত্রদের সাধারণ প্লাটফর্ম ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এবং ছাত্রলীগের অপরাংশ। উপাচার্যবিরোধী শিক্ষকেরা নানান ঘরানার, কেউ আওয়ামীপন্থী কিন্তু উপাচার্যবিরোধী, কেউ বিএনপিপন্থী। কেবল হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের স্বার্থপন্থী এবং দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন।

যে কোনো দুর্নীতির বিপক্ষে কথা বলেন বলে সব ক্ষমতাসীন উপাচার্যের চক্ষুশূল, এমন কিছু শিক্ষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আছেন, এরাই ছাত্রদের মূল ভরসার জায়গা। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক রায়হান রাইন, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসসহ আর কয়েকজন। তারাও জানেন এই উপাচার্যের পদত্যাগ দুর্নীতি রোধের কোনো উপায় না, এরপর যে উপাচার্য হবে, সেও দুর্নীতি করবে। দুর্নীতি করবে কারন সমস্যাটা অন্য কোথাও, সমস্যাটা সিস্টেমে। উপাচার্য পদটি প্রশাসনিক কিন্তু এটার নিয়োগের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া নেই, কোনো ধরণের জবাবদিহিতা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের ক্ষমতা স্বৈরাচারী।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর, জাহাঙ্গীরনগরের প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং সাংস্কৃতিক জোটের সমন্বয়ে গঠিত একটা প্লাটফর্ম, যেখানে সাধারণ ছাত্রদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সাধারন ছাত্ররাও এখানে নিজের কথা বলতে পারে, দাবী দাওয়া তুলতে পারে। প্রগতিশীল ছাত্রজোট হচ্ছে আবার ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র মৈত্রী ইত্যাদি ছাত্রসংগঠনগুলোর জোট। ছাত্রলীগের মন্তব্য ‘এরা কেবল আন্দোলনই করে’। আসলে আন্দোলন করা ছাড়া আর কিইবা করার আছে এদের? এটা খুবই স্বাভাবিক যে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ দেখে রাখে না। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো সেটা দেখাই লাগবে।

লাইব্রেরীতে সিট সংকট, সিট বাড়াও আন্দোলন; উপাচার্যের দুর্নীতি, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন; ভর্তি ফরমের মূল্যবৃদ্ধি; মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন; এইসব আন্দোলন করতে করতে আর সাধারণ ছাত্রদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলতে বলতেই প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতারা তাদের ক্যাম্পাস জীবন সমাপ্ত করেন। ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল এসময় কি করে? তারা করে টেন্ডার বানিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, পার্সেন্টেজবাজি, বাকি খাওয়া, হলে অযথা ক্ষমতা দেখানো, টাকাপয়সা এবং স্বার্থ নিয়ে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং এবং মারামারি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তিনটি গ্রুপ এভাবেই আলাদাভাবে প্রকট হয়েছে। একটি গ্রুপ সভাপতি জুয়েল রানার, আরেকটি গ্রুপ সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের, আরেকটি গ্রুপ যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের। এর মধ্যে উপয়াচার্যের ঈদ সালামীর ২৫% নেয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগ করেছে সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল, এ সপ্তাহে সে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পদত্যাগপত্রও জমা দিয়েছে। আরেক গ্রুপের নেতা সাদ্দাম সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রব্বানীর সাথে সালামীর ২৫% নিয়ে ফোনালাপ করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। সাদ্দাম ও তার গ্রুপও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। আর বাকি যে এক গ্রুপ থাকলো সভাপতির নেতৃত্বে, যারা সালামীর ৫০% পেয়েছে, তারাই গত কয়েকদিন আগে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষক ও ছাত্রদের মারধর করেছে।

এদের কারো ছাত্রবাদী কোনো স্বার্থ নেই। এদের চলাফেরা দেখলেই বোঝা যায় এদের হাতে টাকা আছে। দামী ফোন, দামী মোটর সাইকেল, বিলাশবহুল জীবনযাপন, হলের রুমে ফ্রিজ, টিভি, সোফা ইত্যাদি। এদের অনেকের পিতাই বাকী ছাত্রদের অভিভাবকদের মতো মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত। পিতার কামাইয়ে এরকম দামী মোটরসাইকেল চালনা করা অসম্ভব। এই খরচের টাকার উৎস কোথায়? অনেক উৎসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কাজের একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ অন্যতম। আর এখানেই উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম ফেঁসে গেছেন।

প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে কেবল ছাত্রলীগকে টাকা বা পার্সেন্টেজ দেয়ার অভিযোগই শেষ নয়। এই পার্সেন্টেজের লেনদেন তিনি সম্পন্ন করেন তার স্বামী ‘আখতার হোসাইন’ ও গুণধর সুপুত্র ‘প্রতীক’ এবং তার পিএস ‘সানোয়ার’এর মাধ্যমে। তার সমস্ত অপকর্মের সহযোগী এই তিন পুরুষ। তার পুত্র প্রতীক এর আগেও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং সেখানে ঘুষ গ্রহণের কেলেঙ্কারীতে জড়িত। বেশ কয়েকটি শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্য- কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি মোতাহার মোল্লার ছেলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মোস্তাকিম বিন মোতাহারের নিয়োগ।

আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের অংশটি মূলত আগের উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত, ড. ফারজানা উপাচার্য হওয়ার আগে নিজেও শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত শিক্ষক ছিলেন। শরীফ এনামুল কবিরের অনুগত শিক্ষকরা একটি বিশেষ স্বার্থের জায়গা থেকে আন্দোলনে আছেন। তারা যতটুকু ফারজানাকে ক্ষমাতাচ্যুত করতে চান তার চেয়ে বেশি শরীফ এনামুল কবিরের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান। বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের রাজনীতি করার জায়গা এখন খুবই সীমিত। বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে তারা নিজেদের চাঙ্গা রাখেন। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের দলাদলিতে আসলে বিএনপি-জামাতপন্থী শিক্ষকদের লাভ বেশি। তারা বিভিন্ন পক্ষ অবলম্বন করে প্রশাসনিক সুবিধাদি নিয়ে থাকেন।

ড. ফারজানা ইসলামের পর যিনি উপাচার্য হবেন তিনি দুর্নীতি করবেন না বা নিয়োগ বাণিজ্য করবেন না বা সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ দেখে রাখবেন এমনটা বলা যায় না। তিনি ড. ফারজানার চেয়েও বেশি দুর্নীতিগ্রস্থ হতে পারেন, কিন্তু এই ভয়ে তো ড. ফারজানার বিরুদ্ধে আন্দোলন থামিয়ে দেয়া যায় না। পদত্যাগ না করলেও তার কৃতকর্মের তদন্ত হওয়া উচিত, কোথায় কোথায় তিনি দুর্নীতি করেছেন, সেই দুর্নীতির বিষয়ে তার ব্যাখ্যা কি?

জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি এবং আন্দোলন আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সারা দেশ এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৈনন্দিন চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে এই ঘটনাগুলো। স্বচ্ছতার অভাব, জবাবদিহিতার অভাব, দক্ষ ও যোগ্য লোকের যথাজায়গায় না থাকার ফলাফল এই দুর্নীতি। আর দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে গায়ে না মাখিয়ে নির্লিপ্ত থাকা, যা করেছি বেশ করেছির মনোভাব পোষণ করাই আন্দোলনের কারণ।

ছাত্রবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় নির্মানে প্রশাসনের করণীয় কি হতে পারে? 
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তিকে অর্পন করা, সাধারণ ছাত্রদের প্রতি যার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। 
২. শিক্ষক নিয়োগকে আরো স্বচ্ছ করা, মেধার পাশাপাশি প্রয়োজনে লিখিত পরীক্ষা ও ডেমো ক্লাসে ছাত্রদের মার্কিং এর উপর ভিত্তি করে শিক্ষক নিয়োগ। 
৩. অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জ্ঞানের মৌলিক চর্চা এবং গবেষণাকে প্রাধান্য দেয়া। গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। 
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তা নিরীক্ষা করা। 
৫. কোনো ধরণের অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর আলামত পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার তদন্ত করা, তদন্তের রিপোর্ট অতিদ্রুত জনগণের সামনে প্রকাশ করা। 
৬. অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িত থাকলে স্বেচ্ছায় পদত্যাদের সংস্কৃতি চালু করা।

10 October 2019

দৈনন্দিন আলাপ ২২

বাংলাদেশ আজ অতিক্রম করছে এক বিপর্যস্ত সময়। বাংলাদেশের অসৎ রাজনীতিবিদরা এখন সীমাহীন লোভে জর্জরিত, একমাত্র টাকা কামানোই যাদের ধ্যানজ্ঞানে পরিনত হয়েছে। তারা বুঝতে পারছেনা তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আসলে বিষ রেখে যাচ্ছে। তারা মনে করছে প্রচুর সম্পত্তি রেখে গেলে আমার ছেলেমেয়েরা বিদেশে ভালো থাকবে। তারা এটা বুঝতে পারছেনা, তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের ছেলেমেয়েদের জবাবদিহি করা লাগতে পারে। 

সরকারি অফিসগুলো পরিনত হয়েছে ডাস্টবিনে। সেখানে যারা কাজ করছে তাদের মেধা এবং যোগ্যতা নিয়ে তো প্রশ্ন তোলাই যায়, উপরন্তু তারা দুর্নীতিতে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। যে যার মতো দেশ লুটেপুটে খাচ্ছে। মন্ত্রী-সচিব থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত, একটা স্ট্রাকচারের সবাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এবং তারা এইখানে এগুলাই চলে বলে দুর্নীতিকে নিয়মও বানিয়ে ফেলেছে। বরং যারা দুর্নীতি না করে বেতনের পয়সায় চলতে চাইছে তাদের ব্যাকডেটেড বলে গালাগাল করছে। এভাবে সট্রাকচার চলতে পারেনা। যেকোনো সময় এই স্ট্রাকচার তার মন্ত্রী থেকে পিয়ন সবাইকে নিয়ে কলাপ্স করবে। 

কোন জায়গায় দুর্নীতি নাই? রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, ফরিদপুর মেডিকেল, চট্টগ্রাম মেডিকেল, সবগুলো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, সবগুলো সরকারী দপ্তর-অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন থেকে পৌরসভা, সব জায়গায়। যে দেশের রাজনীতিবিদরা দুর্জন আর সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসৎ-দুর্নীতিগ্রস্থ,  সেখানে জিডিপির গল্প কয়দিন টিকে, দেখা যাক। 

যে দেশে বিচারব্যবস্থা বলতে কিচ্ছু বাকি নাই, যে দেশে একের পর এক খুন-ধর্ষন হতে থাকে, যে দেশে একটা খুনিকে ধরতে হলেও প্রধানমন্ত্রীকে কনসার্ন হওয়া লাগে, সে দেশ চ্যাম্পিয়ন অব দা আর্থ হলেই কি, গ্যালাক্সি হলেই কি? একটা বিচার দেখান যেটা বিচারবিভাগ স্বাধীনভাবে করেছে। একটা খুন বা ধর্ষণ বা যে কোনো ফৌজদারী অপরাধের বিচার। আছে? তনু, নুসরাত, বিশ্বজিৎ, একটা বিচার দেখান... স্বাধীন বিচার বিভাগের চেয়ে একটা সার্কাসের দল বেশি স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। 

পুলিশ-র‍্যাব পরিনত হয়েছে রক্ষীবাহিনীতে। আগে রক্ষীবাহিনী সরকারের স্বার্থ দেখে রাখতো, এখন এরা রাখে। এরা ২ টা ইয়াবা সাথে পেলে মাদকের মামলা দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা খায়। আর ২ কোটি ইয়াবা পেলে তাকে প্রটোকল দেয়, স্যার বলে। এরা আল-জাজিরাকে সাক্ষাতকার দিলে আইসিটি আইনে জেলে নিয়ে অত্যাচার করে। আর যুবলীগ-ছাত্রলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ভাই বলে, সালাম দেয়, আগেপিছে দৌড়ায়। 

একটা খুনের বিচার না হলে আরেকটা খুন হয়। বিশ্বজিৎ এর খুনিরা সাজা পেলে কয়টা খুন কম হতো আল্লাহই জানে। যেহেতু বিশ্বজিৎ এর খুনিরা সাজা পায়নি, তাই আরো কতো খুনি গজিয়ে গিয়েছে... তনুর ধর্ষক সাজা পেলে আজ কতোগুলো নারী ধর্ষনের হাত থেকে বেচে যেতো। কয়েকদিন পর যখন নুসরাতের খুনিরা ঘুরে বেড়াবে, তখন বেশ কয়েকজন ধর্ষক-খুনি খুন করতে উৎসাহ পাবে। এই উৎসাহের জন্মদাতা কে- এই রাষ্ট্র, এই সরকার আর এই বিচারব্যাবস্থা। 

চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়। চুপ থাকলে অন্যায় আমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে। অন্যায় দেখে আপনি মুখ লুকাতে পারবেন, কিন্তু আরো খারাপ সময় আসছে। আপনার ছেলে লাশ হয়ে বাড়িতে আসবে, আপনার মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে কাদতে কাদতে দড়িতে ঝুলে পরবে, আপনার বৌয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দেবে ক্ষমতাসীনদের বাচ্চা শাখা। সময় থাকতে থাকতে প্রতিবাদ করতে শিখুন। নিজের দাবীর কথা নিজে বলতে শিখুন। নিজের স্বচ্ছ আওয়াজ পৌছে দিন দুর্নীতিবাজদের কানের গোড়ায়। 

মনে রাখেন তাদের সংখ্যা এবং শক্তি আপনাদের চেয়ে কম। কিন্তু তারা সংঘবদ্ধ। সংঘবদ্ধ চক্রের মোকাবিলা করতে হবে সংঘবদ্ধ হয়েই। আপনার পাশের ভাইটির পাশে কাধে কাধ মিলিয়ে দাড়ান, আপনার বোনটিকে সাহস দিন আপনি আছেন। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। প্রয়োজন শুধু ভালো হাতগুলোর একতা। 

এই কথা গুলো সবাই জানে, তবু কেন বলতেছি? নিজেরে হালকা করার জন্য। মাঝেমাঝে নিজেকে খুব ভারী মনে হয়। চিৎকার গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকে। মনে হয় সব কিছু লাথি দিয়ে ভেঙে ধ্বংস করে দেই।   

7 October 2019

দৈনন্দিন আলাপ ২১

কি বলবো বলেন? কতো কথা গিলে ফেলি...
সীমাহীন লোভ মানুষকে নিয়ে গেছে ধ্বংসের কিনারায়। মানুষ আজকে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে, সৎ থেকে ভুল করছিনাতো!

ভেবেছিলাম দুর্নীতি নিয়ে কয়েকটা কথা বলবো। দুর্নীতি আজকে ফাসের মতো গলায় আটকে আছে। সব জায়গায় দুর্নীতি। মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী সকল প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি করাকেই নিয়ম মনে করছে। এই প্রত্যেকটা কাজের জবাব দেয়া লাগবে। আল্লাহর বিচার আল্লাহ করবেন, মানুষের দুনিয়ায় মানুষই বিচার করবে।

তারপর ক্যাসিনো, যুবলীগ ইত্যাদি ইস্যু। সাধারণ মানুষ সারাদিন কাজ করে দিনের খাবার দিনে জোগায়। সারাটা দিন খাটে। আর কেবল যুবলীগ করার কারনে এরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। বিশেষ সুবিধার ভার বাংলার মানুষ আর বহন করতে পারছে না। জনতার নাভিশ্বাস উঠে গেছে। যেকোনো দিন তারা এইসব চেতনাধারী, বঙ্গবন্ধুকে বাজারে বিক্রিকারী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ বা অন্যান্য আর সকল লীগকে রাস্তায় ফেলে পায়ের গোড়ালি দিয়ে পিষে ফেলবে।

গুটিকয়েক লোকের জন্য বাংলাদেশ আজকে আগাতে পারছেনা। এদের ছাড়াই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। লোভী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে বাংলাদেশের মুক্তি আর বেশি দূরে না। বাংলাদেশে এখন জনগণের বিপ্লবের সকল প্রতিবেশ বিদ্যমান। 

এরমধ্যেই শেখ হাসিনা ভারতের সাথে চুক্তি করলেন। চুক্তির বিষয়ে জনসাধারণকে অবহিত না করেই চুক্তি করলেন। জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী চুক্তি তিনি আগেও করতে পারেন নাই, এখনো পারেন না। বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছে ভারতের স্যাটেলাইট স্টেইটে। বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারনে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি হলে, এর দায় বর্তমান সরকারপ্রধানকে নিতে হবে।

আবার এটা নিয়ে কথা বলার কারনে বুয়েটের এক ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। পেটানোর আগে তার ফোন, ফেসবুক, মেসেঞ্জার চেক করা হয়েছে। যাই ঘটুক পক্ষেই থাকতে হবে কেন? সমালোচনার অধিকার, কথা বলার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য আমরা দেশ স্বাধীন করি নাই।

কথা না বলে থাকতে চাইতেছিলাম। আর সবার মতো চুপ থেকে পরিবার-সংসার নিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করতে চাইছিলাম। কিন্তু ঐ যে- অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে... 

11 September 2019

দৈনন্দিন আলাপ ১৯

বালিশ, পর্দা, পুকুর ট্রেনিং একের পর এক দুর্নীতির খবর বের হয়ে চলেছে। জনগণ কয়টা দুর্নীতির খবর মনে রাখবে, কয়টার বিপক্ষে কথা বলবে? জনতা আজ বিরক্ত। এরকম পরিস্থিতিতে কেউ যদি এগুলো দমানোর বিপরীতে বলে এগুলো ছিচকে চুরি, আমাদের কি করা উচিত? আমাদের উচিত সরকারী কর্মকর্তা আর ক্ষয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদদের তাদের সীমা মনে করিয়ে দেয়া।
দুর্নীতি কমানোর জন্য এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় নাই। ধারাবাহিক দুর্নীতিগুলোও বন্ধের কোনো নমুনা নাই। রাস্তায় চাদা দিতে দিতে পরিবহন শ্রমিকরা ত্যাক্ত। জনপ্রতিনিধিদের বরাদ্দ বাজেটের ভাগ দিতে দিতে ঠিকাদাররা বিরক্ত। লোকজন ব্যাবসা করবে কেমনে?
দুর্নীতি অর্থাৎ জনতার হক নষ্ট করা, আল্লাহর দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় অপরাধ। বাংলাদেশের একেকজন দুর্নীতিবাজের হাতে যে পরিমান টাকা, তারচেয়ে অনেক কম টাকায় পাশের দেশ ভারত চন্দ্র অভিযান পরিচালনা করেছে। আমরা চন্দ্রে অভিযান না করি ঠিক, বাড়ির পাশের রাস্তাটা তো ঠিক করতে পারি, নতুন উদ্যোক্তাদের বিনাসুদে ঋণ দিয়ে তাদের উদ্যোগকে সম্প্রসারিত করতে পারি, মরণাপন্ন দুইজন কৃষককে ভর্তুকি দিতে পারি, দুইজন বিধবাকে সেলাই মেশিন কিনে দিতে পারি।
আমরা জানি না ঠিক কার টাকায় দুর্নীতি করা হচ্ছে? টাকাটা ভ্যাট-ট্যাক্সের মাধ্যমে সরকারের কাছে যায়, সরকার সেটা বাজেট করে, বন্টন করে। সেখান থেকে দুর্নীতি হয়। জনতার টাকার এই নিদারুণ অপচয় ঠেকাতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের পতন অনিবার্য। জিডিপির ১০% গ্রোথের পরিসংখ্যানও এই পতন ঠেকাতে পারবেনা।
আমাদের এক হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। দুর্নীতি ঠেকাতে পারা এই শতকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও তার জনগনের জন্য একটা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের সন্তানকে, আমাদের পরের প্রজন্মকে একটা বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দিতে; দুর্নীতি বন্ধ করার কোনো বিকল্প নাই।

30 June 2019

দৈনন্দিন আলাপ ১৮

কিছু কিছু রাজনীতিবিদ একটা খুন বা ধর্ষণ হওয়ার পর ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তারা দেখেন খুনের সাথে কোনো মেয়ের সম্পর্ক আছে কিনা। এই সমাজে মেয়ে একটা সেন্সেটিভ বিষয়। যাই হোক না কেন মেয়েটার চরিত্র ভালো না। মেয়েদের চরিত্র এতো কোমল বিষয় যে পাতা নড়লেও তাদের স্বভাব খারাপ হয়। 

সাগর-রুনি মারা যাওয়ার পর এরা বলেছে রুনির চরিত্র খারাপ ছিলো। তনু মারা যাওয়ার পর বললো- তনুর চরিত্র খারাপ ছিলো। এখন রিফাত মারা যাওয়ার পর তার বৌ এর ও চরিত্র খারাপ ছিলো। এই বিষয়ে গ্রামবাংলার একটা প্রবচন আছে- নিজের পুটকিতে গু রাইখা আরেকজনের পাছায় কাপড় নাই দেখতে যাওয়া। 

আফসোস বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা অপরের পশ্চাতদেশ নিয়ে যতটা সোচ্চার, নিজের বর্জ্য পদার্থ নিয়ে এতোটা সোচ্চার নয়। তারা নিজেরা বিভিন্ন রকম দুর্নীতির সাথে যুক্ত থেকে, আরেকজনের চরিত্র নিয়ে কথা বলেন। 

দুইএকজনকে বলতে শুনলাম- মেয়েটা বেশ্যা ছিলো। এককথায় মেয়েদের বেশ্যা বলে ফেলা পুরুষদের চিনে রাখুন। এরা হলো সেই মাদারচোদ প্রকৃতির পুরুষ, যারা আরেকজনের চরিত্র হননকে নিজের অস্ত্র মনে করে। এই ঘটনার মাধ্যমে তারা কাউকে কাউকে বাচানোর চেষ্টা করে৷ 

প্রথমত তারা খুনি আর ধর্ষককে বাচানোর চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত তারা দেশের বিদ্যমান বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে জোড়াতালি দেয়ার চেষ্টা করে। মানে দেশে বিচার নাই এইজন্য খুন হয়েছে এই দিক থেকে জনতার নজর সরায়া তারা তাকে নিয়ে যায় মেয়েটার চরিত্রের দিকে। এতে খুনি-ধর্ষকদের নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু মেয়েটার চরিত্র খারাপ ছিলো, ধর্ষনটা হওয়া স্বাভাবিক।

খুন ও ধর্ষন নিজেই একটা অপরাধ। এমনকি যদি কেউ বেশ্যা হয় তাকেও ধর্ষন করা অপরাধ। আবার খুনের পর অতি উৎসাহী জনতা অপরাধীর ক্রসফায়ার চায়। ক্রসফায়ার নিজেই একটা বিচারহীন প্রক্রিয়া। মানে এক বিচার নাই ঠেকাইতে আমরা চাচ্ছি আরেকটা বিচার নাই। 

যদি তনু হত্যার বিচার হতো তাইলে নুসরাত হত্যা হতো না। নুসরাত হত্যার বিচার যেহেতু হচ্ছে না তাই এইরকম আরো ঘটনা সামনে আসছে আশা করা যায়। বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার হলে রিফাত হত্যা হতো না। এইভাবে একটা অপরাধের সাথে আরেকটা অপরাধ সম্পর্কিত। 

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচারহীনতার এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনতার ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে কথা হতে পারে৷ 

19 May 2019

দৈনন্দিন আলাপ ৪


দেশে যাই ঘটুক না কেন ঘুরেফিরে আইনের শাসনের কথা চলে আসে। আইনের শাসন থাকলে এমন হতো না! আইনের শাসন রক্ষায় এইটা এইটা হওয়া দরকার! ইত্যাদি। আইনের শাসন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। রাষ্ট্র আছে কিন্তু সেখানে আইনের শাসন নাই, তার সোজা মানে রাষ্ট্র চলতেছেনা, রাষ্ট্র অকার্যকর। রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকায়া রাখতে হইলে অবশ্যই সেখানে আইনের শাসন থাকতে হবে। আজকে না কেবল, প্রাচীন সুমেরিয় সভ্যতায় রাজা হাম্মুরাবির শাসনামলে পৃথিবীর সর্বপ্রথম আইন যখন লিখিত হয়েছিলো, তখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সেই আইনে বলা ছিলো যদি কোনো বাসা তার স্থপতির দোষে ধ্বসে পরে, এবং সেখানে বাসার মালিক মৃত্যুবরণ করে, স্থপতিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। যদি বাসার মালিকের ছেলে মৃত্যুবরণ করে, স্থপতির ছেলেকে মেরে ফেলা হবে। এমনটা হয়েছিলো যেন স্থপতি তার কাজে গাফেলতি না দেয়, মনোযোগ দিয়ে কাজটা সম্পন্ন করে। কারণ তার কাজের উপর একটা পরিবারের নিরাপত্তা নির্ভর করছে।  

অথচ তার প্রায় ৪,০০০ বছর পর এই আধুনিক রাষ্ট্রে আমাদের রানা প্লাজা ধ্বসে পরে। সেখানে প্রায় ৩,০০০ লোক মৃত্যুবরণ করে। ৩,০০০ লোক মানে কেবল ৩,০০০ লাশ না। ৩,০০০ কর্মক্ষম ব্যক্তি, ৩,০০০ পরিবার। ৩,০০০ পরিবার ধ্বংস করে ফেলার জন্য রানার কি হইছে? কি করছে সরকার? আইন তো লোকজনের হাতে না, আইন সরকার আর আদালতের হাতে। এমনকি তাকে ধরতেও স্থানীয় পুলিশ গরিমসি করছে, কারণ সে সাভারের যুবলীগ কর্মী, তৎকালীন সাভারের এম্পি মুরাদ জং এর খাস লোক, খুব পাওয়ার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লোকজন প্রচণ্ড চাপ তৈরী করলে শেষে রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ৬ তলা বিল্ডিঙের অনুমতি নিয়া ৯ তলা বিল্ডিং কি রানা একলা বানাইছে? এইটা করতে ইঞ্জিনিয়ার লাগছে, ঠিকাদার লাগছে, সরকারী অনুমতি লাগছে। তো সেই দ্বায়িত্বশীলরা কই? সেই রানারে আবার জামিনে মুক্তিও দিছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কি বোঝা যায়? বোঝা যায় দেশে রাজা হাম্মুরাবি ক্ষমতায় নাই।  

যে বিচার দেশে একটা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা আছে বইলা জানান দিতে পারতো, যে বিচার লোকজনকে আইন ও সরকারের প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল করতে পারতো, সেখানেও কারা কারা যেন গাফেলতি করছে। রানার জামিন একটা উদাহরণ তৈরী করছে দেশে। যে যুবলীগ করলে, ছাত্রলীগ করলে, শ্রমিকলীগ করলে ছাড় পাওয়া যায়। ভাইরাল না হইলে তো পুলিশ ধার দিয়াও যায়না, ভাইরাল হইলে জেলে নিয়া দুয়েকদিন রাখে। ক্রমেই লোকেরা ইস্যু ভুইলা গেলে ছাইড়া দেয় বা জামিন দিয়া দেয় ইত্যাদি।

ভাত হইছে কিনা এইটা ২-৩ টা ভাত টিপ দিয়া দেখে। দেশে যে আইনের শাসন নাই এইটা বোঝার জন্যও দুইএকটা ঘটনাই যথেষ্ট। রানা প্লাজা সাভারে হওয়ায় সাভারের অধিবাসী আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের মনে সেই স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে।  

এরপর বিশ্বজিৎ হত্যা যেটার বিচার হয় নাই, তনু হত্যা থেকে শুরু করে হালের নুসরাতের হত্যা। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই লিস্ট দীর্ঘ হইতেই থাকবে। যে বিচারগুলা অতিদ্রুত হওয়ার কথা সেগুলাই পিছায়া যায়। কারণ সেই অপরাধগুলা এমন লোকেরা করে যাদের বিচার করা যায় না। হয় খুনির আত্মীয় বাহির হয় মন্ত্রী, নাইলে ধর্ষকের দুলাভাই বাইরায় এম্পি, নাইলে সে নিজে ছাত্র-যুব-শ্রমিক লীগ করে। 

আচ্ছা সারা দেশে নগর, মহানগর, জেলা, উপজেলা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন মিলায়া কয়টা আছে যুবলীগের ইউনিট? ধরি ৫ হাজার। প্রতি ইউনিটের ক্ষমতাবান মেম্বার গড়ে ২০ জন কইরা হইলেও ১ লাখ। এইরকম ছাত্রলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, পেশাজীবীলীগ, তাঁতিলীগ, মাঝিলীগ, মহিলালীগ, তরুণলীগ, বৃদ্ধলীগ সব মিলায়া ধরি আরো ৪ লাখ। এইরকম প্রায় ৫ লাখ লোকের হাতে জিম্মি দেশের আইন আর বিচার ব্যবস্থা! এইরকম মাত্র ৫ লাখ লোকের ক্ষমতার কাছে ঠোক্কর খায় ১৭ কোটি লোকের অধিকার? এই ৫ লাখ লোক কম বা বেশি হইলে এই ১৭ কোটি লোকের কিচ্ছু আসবে যাবে না। ১৭ কোটি লোক সংখ্যায় একটুও কমবে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ক্ষমতা ছিলো এইরকম আর ৫ লাখ লোকের হাতে। এরা জাস্ট রিপ্লেস হইছে। আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে যা করছে, তা স্রেফ বিএনপির ৫ লাখ লোক সরায়া নিজের ৫ লাখ লোকের পুনর্বাসন।  

আইন শাসন প্রতিষ্টা করার জন্য আশপাশের অনেক দেশ অনেক উদ্যোগ নিছে। সেগুলা কোনো গোপন উদ্যোগও না। ইরানের আইনে আল্লাহর দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় দুনিয়াবী অপরাধ- রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি। এইক্ষেত্রে ইরান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি। কোনো ওজর-আপত্তিই গ্রহণযোগ্য না। একবার ইরানে ফ্লাইওভার ভাইঙ্গা পরছিলো। বেশ কয়েকজন সাধারণ জনগণ যারা নিচে দিয়ে যাচ্ছিলো মারা গিয়েছিলো। তদন্ত কমিটি ইরান সরকারও করেছিলো। কিন্তু তারপরো ফলাফল- ইরান সরকার দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে। তদন্তে ইঞ্জিনিয়ার আর ঠিকাদারের দুর্নীতি বেরিয়ে আসে। দুইজনকেই প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসি দেয়া হয়। ফলে আর যারা দুর্নীতি করতো তারা সাবধান হয়ে যায়। কি মনে হয় ইরানি ঠিকাদারের কাছে টাকা কম ছিলো? আর বাংলাদেশে ভেতরে রডের বদলে বাঁশ দেয়া হয়, সেটার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়। সরকার বাঁশ খুজে পায় না।  

আচ্ছা ইরান বাদ, সিঙ্গাপুরের কথা বলি, আমাদের এক পা তো সিঙ্গাপুরে চলেই গেছে। সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার পর তাদের সরকারী কর্মকর্তারাও দুর্নীতিগ্রস্থ ছিলো। সিঙ্গাপুরের সরকারপ্রধান তো ভেবে পান না কি করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি কমবে। শেষে তাদের বেতন ডাবল করে দিলেন। টাকা-পয়সার যে অভাব ছিলো তা মিটে গেলো। অভাবে যারা দুর্নীতি করতো তারা দুর্নীতি করা বাদ দিলো। কিন্তু যাদের স্বভাব তাদেরটা? তাদের দিলেন টাইট। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার কঠোর নিয়ম করলেন। সরকার তো আপনাকে বেতন দিচ্ছেই, তাহলে ভূমি জরিপ করতে পয়সা লাগবে কেন? পাসপোর্ট করতে পয়সা লাগবে কেন? লাইসেন্স বের করতে পয়সা লাগবে কেন? কারণ তো দর্শাতে হতোই, সরকারী কর্মকর্তাদের চাকুরিচ্যুত করারও বিধান ছিলো। ফলাফল- সিঙ্গাপুর আজকে সিঙ্গাপুর, আজকে তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে এইখানে।  

আর বাংলাদেশে শুধুমাত্র বেতনই বাড়ানো হয়েছে। কোনোপ্রকার জবাবদিহিতা নাই। স্বচ্ছতা নাই, দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নাই। পদেপদে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি। আমাদের সরকারের ধারনা অবকাঠামোগত উন্নয়নই উন্নয়ন। না; জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হলো প্রকৃত উন্নয়ন। অবকাঠামোগত উন্নয়নটাও ঠিকমতো হচ্ছে না। একটা পুঁজিবাদী দেশ কতোটুকু পুঁজিবাদী তা নির্ভর করে তার যোগাযোগব্যবস্থার উপর। ১০০ কিলোমিটার পথ যেতে আপনার কয় মিনিট লাগে তার উপর। এই কারনে আমেরিকা সরকার ১৯৫০-৬০ সালেই পলিসি তৈরী করে একদম গ্রামের বাসাবাড়ির সামনের রাস্তা পর্যন্ত পাকা করে গুছিয়ে আনে।  

মালয়েশিয়াতে মাহাথির যখন ক্ষমতায় আসেন ১৯৮১ তে, এসেই রাস্তাঘাটের উপর মনোযোগ দেন। দশ বছর কেবল রাস্তাঘাটই ঠিক করেন। এখন মালয়েশিয়া কোথায়? বাংলাদেশের কে বলতে পারবেন তার বাড়ির সামনের রাস্তা ঠিক আছে? কে বলতে পারবেন গাবতলী থেকে গুলিস্তান মাত্র ১৪ কিলোমিটার রাস্তা যেতে আপনার কয় মিনিট সময় লাগবে? কে বলতে পারবেন ঠিক ৩ টায় দেখা করার জন্য সময় দিয়ে সময়মতো পৌছাতে পেরেছেন?  

যাই হোক, এই বিষয়গুলো পরষ্পর সম্পর্কিত। রাস্তা ঠিক হলে সময় বাঁচবে। বেঁচে যাওয়া কর্মঘন্টায় মানুষ কাজ করবে বা বিশ্রাম নেবে। পন্যের যোগান ও চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্যতা রক্ষা হবে। দেশ পুঁজিবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। আবার আমরা বাস করছি এক অসামাজিক দুষ্টচক্রে। যেখানে দুর্নীতি বন্ধ না হলে রাস্তা ঠিক হবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে দুর্নীতি কমবেনা। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল সরকারপ্রধানের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। সবাইকে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। এই দুষ্টচক্র আমাদের ভাঙতে হবে।  

কোথাও না কোথাও তো এই দুষ্টচক্র ভাঙার রসদ মজুদ আছে। সেটা কোথায়?