Showing posts with label রাজনৈতিক ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label রাজনৈতিক ইতিহাস. Show all posts

16 February 2022

ইউক্রেন সংকটে দায় কার?

২০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, বেলারুশের ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়া-বেলারুশ যৌথ মহড়া।
ছবি: এপি, রাশিয়ান ডিফেন্স মিনিস্ট্রি প্রেস সার্ভিস থেকে 


১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে প্রাসঙ্গিকতা হারায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক জোট ন্যাটো। কিন্তু এরপরও পৃথিবী যুদ্ধবিহীন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মিত্ররা নানা অজুহাতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয় একতরফা যুদ্ধ।

পরাশক্তির এ ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে থাকে ২০১০ সালের পর। এ সময় চীনের অর্থনীতি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়ার কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রের একক পরাশক্তি হয়ে ওঠার লক্ষ্মণগুলোকে বাধা দিতে থাকে। এ সময় বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে সংগঠিত হয় ছায়া যুদ্ধ (প্রক্সি ওয়ার)। ২০১০ থেকে ২০২০ এই সময়ে ছায়া যুদ্ধ হয় সিরিয়ায়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাশার আল আসাদের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সমর্থন জানায়। কিন্তু রাশিয়া বাশারের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যহত রাখে। ছায়া যুদ্ধ চলে লিবিয়ায়, ইয়েমেনে।

এই সময়ের মধ্যে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এক, ন্যাটো তার জোটের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। পূর্ব ইউরোপে বিস্তৃতি ঘটে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সামরিক মিত্র ন্যাটোর সম্প্রসারনবাদের। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দেশগুলো যোগ দিতে থাকে ন্যাটোতো। পোল্যান্ড, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া একে একে যোগ দেয় ন্যাটোতে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠেকানোর জন্য যে সামরিক জোট, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তার কাজ কি? প্রকারান্তারে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অস্ত্র হয়ে উঠে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চায় যে, ন্যাটো ও অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে তারা ‌‌‍‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু প্রকারান্তরে তারা জারি রেখেছে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার। আর বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের এই মিশনে তার সহযোগী ন্যাটো। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর বিস্তারকে রাশিয়া নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করবে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ২০১০ সালের পর থেকে রাশিয়া তার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে থাকে। নিজের সুবিশাল আয়তনের বাইরেও অস্তিত্ব জানান দিতে থাকে রাশিয়া। এ সময় চীন এবং ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ও সহযোগীতা বাড়তে থাকে। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের কয়েকটিকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলা হয় অর্থনৈতিক জোট। এ সময় সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে জর্জিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে দুরত্ব বাড়তে থাকে রাশিয়ার।

রাশিয়া নিজের স্বার্থে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর রুশপন্থী সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেওয়া অব্যহত রাখে। এর মধ্যে ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে জর্জিয়ার স্বাধীনতাকামী অঞ্চল আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওশেতিয়ার সমর্থনে সৈন্য পাঠায় রাশিয়া। এর পর ২০১৪ সালের মার্চে ইউক্রেনের স্বশাসিত প্রজাতন্ত্র ক্রিমিয়া রাশিয়ায় যোগ দেয়। একই সঙ্গে পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল দোনেত্সক ও লুহান্সক ইউক্রেনের অখণ্ডতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় ১ লাখ সৈন্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন দখল করে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা নষ্ট করতে চায় রাশিয়া, বলে অভিযোগের আঙুল তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই বিষয়ে রাশিয়ার ভাষ্য, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়া যাবে না এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে ন্যাটোর সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনার শর্তে চাপ প্রয়োগ করার জন্য এই সৈন্য সমাবেশ। মূলত রাশিয়া ইউক্রেনকে ঘিরে রেখেছে তিন দিক থেকে। পূর্ব দিকে ইউক্রেনের রুশ সীমান্ত ও দোনেত্সক-লুহান্সকের বিরোধপূর্ণ অঞ্চল, উত্তরে বেলারুশ সীমান্ত এবং দক্ষিণে ক্রিমিয়া ও মোলদাভিয়ার ট্রান্সনিস্ট্রিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার সেনাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

ন্যাটোর সম্প্রসারনের বিরোধীতা করতে গিয়েই আজকের এই সংকট। কিন্তু যদি রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিবে পুরো পূর্ব ইউরোপ জুড়েই। আর এই মানবিক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা ইউরোপের আছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে যে সংকটের সমাধান করা সম্ভব; তা নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা হবে একেবারে অনুচিত একটি সিদ্ধান্ত।

 

13 September 2020

ইরান-তুরস্ককে ঠেকাতে ইসরাইল-আরব জোট

 
 
সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অন্যতম দখলদার শক্তি হিসেবে দেখে থাকে। গত ৭২ বছর ধরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে শান্তিকামী সকল মুসলমান ইসরাইল থেকে নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি সেই দুরত্ব কমিয়ে আনছে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র।
 
জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনের অধিকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরাইল। আরব এবং মুসলমান রাষ্ট্রগুলো এই অন্যায় জবরদস্তিমূলক জমি অধিগ্রহণ মেনে নিতে পারে নি। ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের সাথে মোট ৪ বার আরব রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধ হয়। কিন্তু দুর্বল সমরনীতি, কূটনীতি ও গোয়েন্দাদের ব্যররথতায় প্রত্যেকটি যুদ্ধেই আরব রাষ্ট্রগুলো পরাজিত হয়। ইসরাইলকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও যাবতীয় রকম সাহায্য করে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা শক্তি।
 
ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফিলিস্তিনিদের নিজের ভূমি থেকে সরিয়ে শরনার্থী বানাতে সমস্ত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৪৯ সালে। কিন্তু ২০০৮ সালে ইসরাইলের গাজা আক্রমনের পর তুরস্ক-ইসরাইলের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। ২০০৮-৯ সালে ইসরাইল গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। তুরস্ক একটি ত্রাণবাহী জাহাজ গাজায় পাঠাতে চাইলে ইসরাইল তাতে বাঁধা দেয়। ইসরাইল গাজায় মানবিক ত্রাণ পৌঁছাতে না দিয়ে বরং জাহাজে আক্রমণ করে। সেই আক্রমনে ৯ জন তুর্কি নাগরিক নিহত হয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এরপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ইসরাইলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন এবং ইসরাইলের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক সীমিত করে নিয়ে আসেন।
 
ইসরাইলের সাথে ২য় মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে সম্পর্ক ছিলো ইরানের। পাহলভী রাজতন্ত্রের অধীনে ইরান আর ইসরাইলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। এই সম্পর্কের অনুঘটক ছিলো যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনি সরকার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে।
 
এরপর ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে মিসর ১৯৭৮ সালে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৭৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। শান্তিচুক্তির উদ্যোক্তা ছিলেন নান আদার দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। সাদাত ও বেগিন শান্তিচুক্তির জন্য শান্তিতে নোবেলও পান ১৯৭৮ সালে। শান্তিচুক্তি হলেও সাদাতকে রক্ত দিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে এর মূল্য। ১৯৮১ তে এক অভ্যুত্থানে নিহত হন আনোয়ার সাদাত। মিসরের জনগণ আজও ইসরাইলকে শত্রুরাষ্ট্র গণ্য করে। ২০০৬ সালের এক জরিপে দেখা যায় ৯২% মিসরীয় ইসরাইলকে শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে।
 
ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হলে জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করতে হয়। হয় রাজতন্ত্র নাহয় স্বৈরাচারী সরকারই কেবল পারে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে। যুক্তরাষ্ট্র তাই মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের আধিকার আদায়ের বিরুদ্ধবাদী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং রাজতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসি সরকারের সময় ইসরাইলের সাথে মিসরের ঘনিষ্ঠতা কমে আসে। কিন্তু মুরসিকে হঠিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী প্রেসিডেন্ট সিসি আবার ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সিসিকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সাহায্য লাগবেই।
 
এরপর মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র হিসেবে জর্দান ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে ১৯৯৪ সালে। শান্তিচুক্তি করলেও জর্দান-ইসরাইল সম্পর্ক সুখকর হয় নি। ইসরাইল কর্তৃক বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শর্নার্থী ও তাদের বংশধররা জর্দানের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ফিলিস্তিনি শরনার্থীদের প্রবল চাপে বিধ্বস্ত জর্দান তাই ইসরাইল থেকে নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রাখে।
 
মধ্যপ্রাচ্যের ঘোলাটে রাজনীতিকে আরো উস্কে দিয়ে সুবিধা বের করে আনতে পারদর্শী যুক্তরাষ্ট্র, সুযোগ কাজে লাগাতে ওস্তাদ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার প্রায় ১০০ বছরের সাম্রাজ্যবাদী ইন্সটিংক্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের গণবিরোধী রাজতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র। ২০১১ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর জনতা দীর্ঘ শোষন-দুর্নীতি ও রাজতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে। শুরু হয় জনতার স্বতঃস্ফুর্ত জাগরণ- আরব বসন্ত। আর অপরদিকে আরব বসন্ত থেকে সুবিধা বাগিয়ে নিতে উৎসুক যুক্তরাষ্ট্র সহ সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তি।
 
আরব বসন্তের ঢেউ একেক রাষ্ট্রে একেকভাবে লাগে। ব্যাপক আন্দোলনে একে একে পতন হয় স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্টদের। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জাইন আল আবেদীন বেন আলী, মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজতন্ত্রগুলো তখনকার মতো পরিস্থিতি সামাল দেয়। সৌদি আরব, বাহরাইন, জর্দান, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজতন্ত্রের ভিত কাপিয়ে দেয় আরব বসন্ত। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধে শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদীদের মজার খেলা- প্রক্সি ওয়ার; মাটি আপনার, যুদ্ধ আমার।
 
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ কোনোক্রমেই ক্ষমতা ছাড়তে রাজি না হওয়ায়, বিরোধী পক্ষরা সশস্ত্র পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ট ইসরাইল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিরোধীদের সবরকম সাহায্য দিতে থাকে। বাশার আল আসাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে- রাশিয়া ও ইরান। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ হয়ে যায় সৌদি আরব বনাম ইরানের লড়াই, যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়ার প্রেস্টিজ।
 
গৃহযুদ্ধ চলাকালীন দেশগুলোতে অর্থাৎ সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে; সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইন যে পরিমান মেধা-অর্থ ব্যয় করেছে তার কিয়দাংশ নিজের দেশের জনগণের জন্য ব্যয় করলে সেসব দেশের রাজতন্ত্রে অতিষ্ট জনগণ আরো একটু সুখী হতে পারতো।
 
ইয়েমেনের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সেখানে গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি চলছে দুর্ভিক্ষ। অপুষ্টিতে ভোগা ইয়েমেনি শিশুরা ঘাস আর মাটি খেয়ে থাকছে। আর নিরস্ত্র ইয়েমেনিদের উপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছে। বোমাবর্ষণ চলছে মসজিদে, বাজারে, হাসপাতালে এবং বেসামরিক এলাকায়। এন্ড অল ক্রেডিট গৌস টু, গেস হু...! দ্যা ওয়ান এন্ড ওনলি সৌদি আরব। ইয়েমেনে সৌদি আরবের সহযোগী সংযুক্ত আরব আমিরাত আর মুখোমুখি ইয়েমেনের যুদ্ধবিদ্ধস্ত জনগণ আর ইরান।
 
যে সৌদি আরব, মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম, সারা পৃথিবীর মুসলমানের ভরসা এবং নির্ভরতার জায়গা; সাম্রাজ্যবাদকে সহযোগিতা করতে গিয়ে, রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তার বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। একই সাথে বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে, ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন।
 
গত ১৩ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ১১ সেপ্টেম্বর বাহরাইন, ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে। সৌদি আরবও ইসরাইলের সাথে ক্রমেই দুরত্ব কমিয়ে আনছে। আশা করা যায় মুহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ থাকতে থাকতেই সৌদি আরব ও ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের হঠকারী এই সিদ্ধান্তকে আবার স্বাগত জানিয়েছে আরেক স্বৈরাচার মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি।
 
সিরিয়া-ইয়েমেন-লিবিয়া ফ্রন্টে ইরান ও তুরস্ককে ঠেকাতে না পেরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন প্রভৃতি রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচারি সরকার ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ইসরাইলের সাথে আরব এসকল রাষ্ট্রের যে কোনো রকম সম্পর্ক একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্নকে আরো দীর্ঘায়িত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি জোগাবে।

2 December 2019

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলঃ ভূমিকা বা উত্তরাধিকারের রাজনীতি


ওয়ান্স আপন এ টাইম দেয়ার ওয়াজ এ কান্ট্রি নেমড বৃটিশ ইন্ডিয়া। তো সেই কান্ট্রি না ছিলো বৃটিশ, না ছিলো ইন্ডিয়া। সেখানে ছিলো না কোনো রাজনৈতিক দল। বৃটিশ ভারতে প্রথম প্রথাগত রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর, সভার মতো করে। তার নাম দেয়া হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা একজন অবসরপ্রাপ্ত বৃটিশ আমলা 'এলান অক্টাভিয়ান হিউম'। তার সাথে যুক্ত হন- উইলিয়াম উইডারবার্ন, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, মনমোহন ঘোষ, লালমোহন ঘোষ, বদরুদ্দিন তৈয়বজি, দাদাভাই নওরোজি, দিন'শ ওয়াচা, ফিরুজশাহ মেহতা, উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি, মহাদেব গোবিন্দ রানাড়ে প্রভৃতি সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
কংগ্রেসের গঠনের উদ্দেশ্য ছিলো ভারতে বৃটিশদের স্বার্থরক্ষা করা। কিন্তু ক্রমেই সেখানে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউ লাগে। কংগ্রেস পরিণত হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখপাত্র একটি প্লাটফর্ম হিসেবে। এর মধ্যে ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে অতিবিপ্লবী প্রোটো-রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব দেখা যায়। বিশেষত বাংলা অঞ্চলে অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দল ছিলো এরকম অতিবিপ্লবী রাজনৈতিক দল। প্রথমে এরা সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে বিপ্লবী ধ্যানধারণায় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীতে পরিণত হয়।
তারপর আসে মার্ক্স-এঙ্গেলস এর শোষণ মুক্তির জন্য গণমানুষের রাজনীতির তত্ত্ব। ভারতের রাজনীতিবিদরা এই তত্ত্বে আকৃষ্ট হন। ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর গড়ে উঠে ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি। এর উদ্যোক্তারা হলেন- মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনি মুখার্জি, আহমেদ হাসান, হাসরাত মোহানি, রফিক আহমেদ, সুলতান আহমেদ খান প্রভৃতি। কমিউনিস্ট পার্টি না করলেও এমনকি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মতো রাজনীতিবিদ-স্বাধীনতা সংগ্রামীরা মার্ক্সের তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন।
কংগ্রেসের রাজনৈতিক লাইনে একমত থাকতে না পেরে বিভিন্ন সময় কংগ্রেস ভেঙে গেছে। এর মধ্যে স্বরাজ্য পার্টি, ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসময় মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার ধুয়া তুলে কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মুসলিম রাজনৈতিক নেতারা। মুসলিম নেতারা সৈয়দ আহমদ খান এবং সৈয়দ আমীর আলীর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার আহসান মঞ্জিলে তারা প্রতিষ্ঠা করে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- নবাব সলিমুল্লাহ খান, প্রিন্স আগা খান ৩য়, নবাব ভিকরুল মুলক, মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর প্রভৃতি।
১৯৩৯ সালে কংগ্রেস থেকে বের হয়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠা করেন সর্বভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লক। ভারতের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের লক্ষই ছিলো তখন বৃটিশদের শাসন থেকে ভারতকে আলাদা করে, ভারতের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করা। ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা স্বাধীনতা দিয়ে যায়, কিন্তু রেখে যায় একটু গুড়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করা হয়, ভারত আর পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই ভাগ আবার ভারতের দুই পাশে পরে, পূর্ব আর পশ্চিম।
বাংলা অঞ্চলের সাধারণ প্রজাদের স্বার্থ রক্ষায় ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজা পার্টি। পরে প্রজা পার্টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কৃষক প্রজা পার্টি। কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক।
কমিউনিস্ট পার্টি ভারত-পাকিস্তান উভয় অংশে কাজ শুরু করে। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকে। প্রায় পুরো পাকিস্তান আমলেই কমিউনিস্ট ঘরানার সমস্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকে। কাউকে ফাসিয়ে দিতে হলে তখন বলা হতো- ও তো কম্যুনিস্ট...
আরজ আলী মাতুব্বর যখন সত্যের সন্ধানের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছিলেন, তখন পাণ্ডুলিপির ধর্ম বিষয়ক প্রশ্নগুলো দেখে জনৈক ষড়যন্ত্রকারী তাকে কমিউনিস্ট বলে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয়।
এদিকে তখন অতি ডানপন্থী রাজনীতিও শুরু হয়ে গেছে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের হারের পর খেলাফত থাকবে কিনা এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। খেলাফত সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ভারতীয় মুসলমানরা শুরু করে খেলাফত আন্দোলন। খেলাফত আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা হলেন- মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান, শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর, সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী প্রমুখ।
ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার আলেমরা একত্রিত হয়ে ১৯১৯ সালের ১৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন 'জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ'। ১৯২৭ সালের ১২ নভেম্বর হায়দ্রাবাদের নিজামের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলেমিন'। লাহোরে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় 'জামায়াতে ইসলামী হিন্দ'। জামায়াত নেতারা অখণ্ড ভারতের পক্ষে প্রথমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে। পরে পাকিস্তান হয়ে গেলে মওদুদী সেখানে চলে যান। এবং জামায়াত পরবর্তীতে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বিরোধীতা করে।
ভারতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় কংগ্রেস আর পাকিস্তানে মুসলিম লীগ। মতাদর্শকে কেন্দ্র করে ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগে ভাঙন ধরে। মুসলিম লীগের একাংশ গঠন করে আওয়ামী মুসলিম লীগ। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক প্রজা পার্টি, জামায়াত, জমিয়তে উলামা ভারত-পাকিস্তানে ভাগ হয়ে রাজনীতি করতে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এসব দলই উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতি করতে থাকে।

17 August 2018

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিচ্যুতি অথবা বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়




গতলেখায় আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজকে বলতে চাই বঙ্গবন্ধুর নিজের আদর্শবিচ্যুতির কথা। বঙ্গবন্ধু নিজে যে আদর্শে পরিচালিত হয়েছিলেন ১৯৪০ থেকে ১৯৭১, সুদীর্ঘ ৩১ বছর; সেই আদর্শ তিনি নিজেই লঙ্ঘন করেন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের চারটি মূল স্তম্ভ- অন্যায়ের সাথে আপোষহীনতা, সত্যবাদীতা, জনগণের স্বার্থে নিজেকে নিয়োজিত রাখা এবং সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখা। ১৯৭২ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর এই চারটি মূলস্তম্ভ থেকে দূরে সরে যান বঙ্গবন্ধু। তিনি অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে শুরু করেন। যে স্বপ্ন দেখে বাঙ্গালীরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে সে স্বপ্ন হয়ে যায় অলীক কল্পনা। যে কাজগুলো দেশে ফিরেই করা দরকার ছিলো সেগুলো তিনি করেন নি।
দেশে ফিরেই একটি জাতীয় সরকার গঠন করে দেশকে একতাবদ্ধ করার প্রয়োজন ছিলো। এই প্রয়োজন তিনি এমন সময় উপলব্ধি করেন যখন সময় ফুরিয়ে এসেছে। দেশ স্বাধীন হলেও মানুষের মুক্তি দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো। সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অতিবিপ্লবী অংশটি বের হয়ে গিয়ে গঠন করে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)। জাসদ সেই সময় ত্রাসের রাজত্বকায়েম করে। জাসদকে মোকাবেলা করা আর নিজের ক্ষমতাকে পোক্ত করার জন্য তিনি গঠন করেন রক্ষীবাহিনী। এই জাসদ আর রক্ষীবাহিনীর মাঝখানে পরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সাধারণ জনগণ। অথচ বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বেশি ভাবা উচিত ছিলো জনগণের কথা।
যে সত্যবাদীতা বঙ্গবন্ধুর ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিলো স্বাধীনতার পর তার জায়গা নিয়ে নেয় আত্মম্ভরিতা আর স্বেচ্ছাচার। এসময় তিনি মানুষ চিনতে ভুল করেন। তিনি কে দেশপ্রেমিক আর কে চাটুকার তার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হন। তিনি কোনটা প্রশংসা আর কোনটা মোসাহেবী তা আলাদা করতে ব্যর্থ হন। এর দায় তাকে নিজের আর নিজের পরিবারের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। মোসাহেবের দল বঙ্গবন্ধুর লাশের উপর দিয়ে গিয়ে ক্ষমতায় বসে আর বিবৃতি দেয়- ফেরাউনের পতন হয়েছে। মানুষ চিনতে ভুল না করলে দেশ আরো এগিয়ে যেতে পারতো।
১৯৭৩-৭৪ এই সালগুলোতে বেশকয়েকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হয়। দেশে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। একটি নতুন দেশের জন্য দুর্ভিক্ষ সামাল দেয়া খুব ভয়াবহ ব্যপার যদি সেই দেশে প্রবল দুর্নীতি উপস্থিত থাকে। যেই বঙ্গবন্ধু গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুড়ে লোকেদের খোঁজখবর নিয়েছেন, সেই বঙ্গবন্ধু দুর্ভিক্ষের খবর জানতে নির্ভর করেন মোসাহেব আর দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিকদের উপর।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখা থেকেও দূরে সরে যান। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধুকে এসময় চিহ্নিত করা হয়- স্বৈরতান্ত্রিক, কতিপয়তান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, গোষ্ঠীতান্ত্রিক ইত্যাদি অভিধায়। তিনি একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন এসময়। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কমিয়ে আনা, রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীর সমমর্যাদায় বসানো, বিরোধীদের উপর দমন-পীড়ন, দেশপ্রেমিক নেতাদের চিনতে ব্যর্থ হওয়া, জনগণের চাহিদা বুঝতে না পারা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে মদদ দেয়া এসবই মূল কারণ।
অন্যায় ছাড়া কোনো সমাজ নাই। কিন্তু মানুষ অন্যায়ের বিচার চায়। বিচার না থাকা অথবা একেকজনের জন্য একেকরকম বিচার থাকাই বিচারহীনতা। বিচারের প্রশ্নে সেসময় বঙ্গবন্ধু পক্ষপাতদুষ্ট আচরন করেন। যে কারণে পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে বেশকিছু ‘বিপথগামী তরুণ’ তৈরী হয়। তরুণরা নিজেরা বিপথগামী হয়নি, তাদের বিপথগামী করা হয়েছে। তরুণদের বিপথগামী করার সমসংখ্যাক দায় বঙ্গবন্ধুরও।
তরুণদের রাগিয়ে দিয়ে যেকোনো কাজ উদ্ধার করা বেশ সহজ। এইসমস্ত ক্ষেপাটে তরুণেরা বিদেশী কিছু গোয়েন্দাসংস্থার উস্কানি পায়। মদদ পাওয়ার মতো সিনিয়র অফিসাররা এই ক্ষোভে আরো ঘি ঢেলে দেয়। ফলাফল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধুর নিজের যতোটুকু দায় ততোটুকু দায় বিপথগামী তরুণদের। এবং এই দায়ের আরেক হিস্যা বিদেশী স্বার্থবাদী কিছু বিচ্ছিন্ন লোক আর বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার।
যারা বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর অকালমৃত্যু নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন বা পুরো বাঙ্গালী জাতিকে বেঈমান বলে দোষারোপ করেন তাদের আরো বিস্তাড়িত ভেবে কথা বলার জন্য অনুরোধ করবো। ইতিহাস আপনার আবেগ দিয়ে চলে না। ইতিহাস কয়েকটা ঘটনা ছাড়া আর কিছুই না। এক ঘটনা, তার ফলশ্রুতিতে আরেক ঘটনা, এভাবেই ইতিহাস সামনের দিকে এগোয়।
ইতিহাস তার নিজের মতো আগাবে। পেছনে যা গিয়েছে তা গত হয়েছে। এখন আমাদের সময় সামনে তাকানোর। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা এখন কোনো অলীক কল্পনা নয়। যেদিন আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করবো জাতি হিসেবে আমরা অনন্য, সেদিন থেকেই আমাদের উন্নতি শুরু হবে। সেদিন থেকেই আমরা নিজের গর্ব করে বলতে পারবো- আমরা বাঙ্গালী, আমরা বাংলাদেশী।

16 August 2018

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে আমরা কি বুঝি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তার সারা জীবন। সারা জীবনে তার কর্মই তার আদর্শ। বঙ্গবন্ধু প্রথম জেলে যান চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের অধিকার রক্ষায় করা একটি আন্দোলন থেকে। এই আন্দোলন করার কারণে তাকে জরিমানা করা হয়, তার ছাত্রত্বও বাতিল হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানান, কারন তিনি জানেন তিনি হকের পথে আছেন, তিনি সঠিক বিষয়ে আন্দোলন করছেন। জেল-জরিমানা-ছাত্রত্ব বাতিল তাকে টলাতে পারেনি, এই কারণেই তিনি আপোষহীন নেতা। অন্যায়ের সাথে কোনো আপোষ নাই, এমনকি যদি জেল হয়, জরিমানা হয়। এমনকি যদি ছাত্রত্বও বাতিল করা হয়। এটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। ১৯৪৮ সালে কেড়ে নেয়া ছাত্রত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ফেরত দেয় ২০১০ সালে। ছাত্রত্ব চলে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু অসম্মানিত হন নাই, বরং অসম্মানিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, কারণ তারা ন্যায়ের পথে থাকতে পারে নাই।
রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর গুরু। সোহরাওয়ার্দীর সাথে তিনি গ্রামবাংলা ঘুড়ে বেড়ান, জনগণকে সচেতন করেন। কোনো এক কারণে মতবিরোধ দেখা দিলে সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করেন- 'তুমি কে?' বঙ্গবন্ধু উত্তর দেন- 'আমি যদি কিছু না হই, তাহলে আপনি কে?' বঙ্গবন্ধু সভাস্থল ত্যাগ করে চলে আসেন। এটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। নেতাকে সত্য বলতে পারার মতো সৎসাহস থাকাটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। এখনকার নেতারা ভুলে গেছেন কর্মীরা আছে বলেই তিনি নেতা। কর্মীরাও নিজেদের অবস্থান ভুলে গেছে। তারা মনে করে নেতাকে খুশি রাখতে পারলেই সব ঠিক। কিছু সাময়িক ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য তারা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে চুপ থাকেন, নেতার ভুল ধরিয়ে দেন না।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম ১৯২০ সালে, প্রত্যক্ষ রাজনীতি শুরু করেন ১৯৪০ সালে, মৃত্যুবরন করেন ১৯৭৫ সালে। পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৭১) আমলের বেশিরভাগ সময় তিনি জেলে কাটান। জেলে যাওয়ার কারণগুলো হলো- চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, দুর্ভিক্ষবিরোধী আন্দোলন, বাংলার স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন। এর কোনোটাই তার নিজের স্বার্থের জন্য নয়, জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এটাই। নিঃস্বার্থ ভাবে দেশের আর দেশের লোকেদের জন্য কাজ করে যাওয়াই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, এর জন্য জীবনের অধিকাংশ সময় জেল খাটাও কোনো বিষয় না।
বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোসময় স্বপ্ন দেখেছেন একটি সোনার বাংলার। সোনার বাংলা হবে, এই ভেবে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। আবার মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ নিয়ে বের হয়ে এসেছিলেন। প্রথমে স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন, পরে পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। এর সবই একটি সোনার বাংলায় তার দেশের লোকেরা থাকবে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন। এটাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। নির্দিষ্ট একটি স্বপ্নের দিকে নিরন্তর ছুটে চলাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। বঙ্গবন্ধু যদি তার স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন থেকে মাঝপথে বিচ্যুত হতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়তো আরো বিলম্বিত হতো। বঙ্গবন্ধু হয়তো যুদ্ধের মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারেন নাই, কিন্তু জনগণকে একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন ঠিকই দেখাতে পেরেছিলেন।
এখন আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের মুক্তি আসে নাই। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এখনো সফল হতে পারি নাই। বঙ্গবন্ধুর দল বা তার উত্তরসূরিদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে বোঝাপড়া না থাকা বা সেটা অনুশীলন না করা এখন একটা স্বাভাবিক বিষয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে তারা কিছুই বুঝেনা, অথবা কেবল 'বঙ্গবন্ধুর আদর্শ' এই শব্দ ব্যবহার করাকে তারা ফ্যাশন মনে করে। অথচ বাংলাদেশের সোনার বাংলা হয়ে ওঠার সব উপাদান এখানেই মজুত আছে, অভাব কেবল সদিচ্ছার আর স্বপ্ন দেখার।

18 May 2018

ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সবচেয়ে বড় শত্রু কে?




কয়েকদিন পরপর স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিরা মৃত্যুবরণ করে মিডিয়ার আলোচনায় আসে। আমরা সাধারণ জনগন হিসেবে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকি, তারপর বিবিধ ইস্যুতে আবার ব্যস্ত হয়ে যাই। ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম চলতেই থাকে। নিজের ভূমিতে বিদেশী মানুষ হয়ে থাকার যন্ত্রনা তারা নিজেরা ছাড়া আর কেউ জানেনা।

এই যন্ত্রনার প্রথম রূপরেখা প্রণয়ন করা হয় ১৯১৭ সালে, বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে। এরপর ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মাতৃভূমি হারিয়ে হয়ে যায় নিজের দেশে পরবাসী। তাদের জমিতে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইসরাইল রাষ্ট্র’। ইসরাইল রাষ্ট্রের একের পর এক ভয়াবহ সিদ্ধান্তে রসদ জুগিয়ে এসেছে আমেরিকা। সে হিসেবে ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সবচেয়ে বড় শত্রু হওয়ার কথা আমেরিকার। কিন্তু আমেরিকা এতো বছর যাবৎ কিভাবে ইসরাইলের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করছে?

আমেরিকা-ইসরাইল গংদের প্রধান শক্তি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জ্ঞানার্জনের প্রতি অনিহা, প্রচণ্ড স্বার্থপরতা এবং বৃহৎ অনৈক্য। ইসরাইল যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে, পরমানু বোমা তৈরী করছে, ন্যানোটেকনোলজিতে উন্নয়ন করছে; সেখানে মুসলিমদের মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু আপনি শিয়া নাকি সুন্নি, আপনি হানাফি নাকি সালাফি, আপনি দাঁত ব্রাশ করেন নাকি মেসওয়াক ব্যবহার করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান বলতে আপনি বোঝেন প্রায় ১ হাজার বছর আগের ইবনে সিনা, আল কিন্দী, আল ফারাবী। এদের পর পৃথিবী আরো ১ হাজার বছর এগিয়ে গেছে। এইটা ইসরাইল জানে। ইসরাইল জানে আপনি কোন কোন বিষয়ে কনসার্ন! তাই তারা তাদের পরিকল্পনা ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে।

সম্প্রতি আমেরিকা তাদের ইসরাইলি দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়েছে। এইটা মূলত ইসরাইল রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দাবী ‘ইসরাইলের রাজধানী জেরুজালেম’ এই ধারণার প্রতি সমর্থন। আমেরিকার দেখাদেখি ক্রমে আরো রাষ্ট্র এই মতের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। আমেরিকা যেভাবে ইসরাইলকে দিনের পর দিন ভরণপোষণ করে আসছে, এটা বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি।

ইসরাইলকে এই ভরনপোষণের গোঁড়ায় পানি ঢেলে এটাকে আরো সজীব আর প্রাণবন্ত করতে ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সৌদী আরবের সরকার। সৌদী আরবের বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে তার বোঝাপড়া ব্যক্ত করেছেন- ‘আলোচনার টেবিলে আসুন, শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করুন, তা না হলে অভিযোগ জানানো বন্ধ করে চুপ থাকুন।’ এই স্টেটমেন্টের মাধ্যমে তিনি আসলে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে কটাক্ষ করেছেন। সৌদী যুবরাজ না হলে তার এই বক্তব্যকে বেয়াদবি হিসেবে ধরে নেয়া যেতো। আলোচনার টেবিলে আসুন! কার সাথে আলোচনা? শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করুন! গাজায় ৬০ জন নিহত আর ৩,০০০ জন আহত ফিলিস্তিনির সংগ্রামের দাম শান্তি প্রস্তাব। কি কি শান্তির প্রস্তাব করতে পারে ইসরাইল আর আমেরিকা? আমরা কিছু ধারণা করি- ধারা ১, এখন থেকে ইসরাইলের রাজধানী জেরুজালেম। ধারা ২, এখন থেকে পশ্চিম তীর আর গাজাসহ পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডই ইসরাইল রাষ্ট্র। ধারা ৩, এখন থেকে সকল ফিলিস্তিনি ইসরাইলের ২য় শ্রেনীর নাগরিক। তা না হলে অভিযোগ জানানো বন্ধ করে চুপ থাকুন! আপনার কাছে কে অভিযোগ জানাতে গেছে? আপনি তো অনেক আগেই আপনার মস্তিষ্ক আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির কাছে বন্ধক দিয়ে রেখেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আপনার মূল আগ্রহ- ইরানকে আটকাও, ইয়েমেনে সাধারণ মানুষ মারো, সিরিয়ায় আরো বেশিদিন গৃহযুদ্ধ চলুক আর সারা পৃথিবীতে কট্টরপন্থী ইসলাম ছড়িয়ে যাক। মুসলমানদের দুই পবিত্র শহরের খিদমতগার হয়েও আপনি জেরুজালেমকে ইসরাইলের হাতে তুলে দিতে পেছনে ফিরে তাকালেন না।

কেবল সৌদী আরব নয় পুরো মধ্যপ্রাচ্য ফিলিস্তিন প্রশ্নে কাঠগড়ায়। সিরিয়া আর ইরাক নাহয় যুদ্ধবিধ্বস্ত। জর্দান,  মিসর, তুরস্ক, আরব আমিরাত, কাতার!? অনেক অনেক বিষয়ে তারা মুসলিম বিশ্বের ত্রানকর্তা হিসেবে সামনে চলে আসে। অথচ নিজেদের মধ্যে প্রবল অবিশ্বাস। জর্দান মিসরকে সন্দেহ করে। মিসর কাতারকে সন্দেহ করে। সৌদী আরব আর কাতার একই মত অবলম্বন করেও দুইজন দুই জনের দিকে পিঠ দিয়ে আছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে, আরব আমিরাত যতোটা আগ্রহ পায় তার কানা পরিমাণ আগ্রহও পায়না ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামে। তুরস্কতো আরেক স্বাধীনতাকামী কুর্দিদের ঠেকাতে ঠেকাতে নিজেদের প্রেসিয়াস শক্তি ক্ষয় করে ফেলতেছে। এর সুযোগ নিতেছে ইসরাইল আর আমেরিকা। সুযোগ নিবেইনা বা কেন? এরা এইরকম একটা পরিস্থিতির জন্যই তো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে আছে। কেউ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা বিষয়ে ন্যূনতম আওয়াজ করতে নারাজ। বাকী গরিব মুসলিম দেশগুলো যেমন- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালি এরা দর্শকের মতো। একবার সৌদী আরবের দিকে তাকায়, আরেকবার তুরস্কের দিকে তাকায়। তাকায়া তাকায়া ভাবে কার দিকে গেলে অর্থনৈতিক সাহায্য বেশি পাওয়া যাবে।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার এইরকম এক সংকট মুহুর্তে আমাদের সকলের উচিত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে দাঁড়ানো। এটা ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করার মাধ্যমে করা যায় আবার নিজের নিজের জায়গায় প্রতিবাদ অব্যহত রেখেও করা যায়। এমনকি স্বাধীনতার পক্ষে লেখা একটা লাইনও স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আপনার নাড়া দেয়া একটি মুহুর্ত একটি দিনকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি দিন একটি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি মানুষ পুরো পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পারে। এই আন্দোলন থামার নয়। ফিলিস্তিনের পূর্ন স্বাধীনতা না আসা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।

28 September 2017

রাষ্ট্র কেন স্বাধীন হবে?

কুর্দিস্তান ও ইরাকের মানচিত্র 
রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার আগে আপনি যদি তার ভবিষ্যৎ এর প্রশ্ন করেন তাহলে কিছু আপত্তি তৈরী হয়। যে সব প্রশ্ন উত্থাপনের কারনে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতে পারে, তাই নিয়ে এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটিঃ
রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে সবাই সাধারণত প্রথম যে দোহাইটি দেখান, তা হলো টেরিটোরিয়াল এন্টেগ্রিটি। এই দোহাই দিলে আসলে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলই স্বাধীন হতে পারবে না। রাষ্ট্র একটি অতি-আধুনিক ধারণা। এই ধারণা আরো কিছু গালভরা ধারণা আমদানী করে। এর মধ্যে বহুল প্রচলিত আর সবচেয়ে অস্পষ্ট ধারণা হলো- 'টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি'

যেমন বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন পাকিস্তানের টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি নষ্ট হয়। বা আমেরিকা যখন স্বাধীন হয়, তখন বৃটিশ সাম্রাজ্যের টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি নষ্ট হয়। কোনো অঞ্চলের স্বাধীনতার সময় যদি টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটির দোহাই তোলা হয়, তাহলে তা সবসময় পরাধীন বা স্বাধীনতাকামী জনতার বিপক্ষে যায়। টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি ঠিক রাখতে হলে কোনো দেশেরই আসলে স্বাধীন হওয়া উচিত না।
কাতালোনিয়ার পতাকা
ঠিক একই রকম, কুর্দিস্তানের ক্ষেত্রে ইরাকের বা কাতালোনিয়ার ক্ষেত্রে স্পেনের টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি নষ্ট হবে, যদি কুর্দিস্তান বা কাতালোনিয়া স্বাধীন হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে অনেকে মাতৃরাষ্ট্রের ক্ষমতাবলয়ের ভেতরেই দরকষাকষি করে, ইন্টেগ্রিটি নষ্ট না করে স্বাধীনতা লাভের কথা বলেন। কিন্তু এটা প্রায় অসম্ভব একটা প্রক্রিয়া। এই ঘটনা ঘটানোর জন্য যে পরিমান আন্তর্জাতিক প্রেসার তৈরী করতে হয়, অনেক স্বাধীনতাকামী অঞ্চল তা করতে সক্ষম নয়। এইরকম একবার সম্ভব হয়েছিলো পূর্ব তিমুরের বেলায়। ইন্দোনেশিয়াকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতো প্রেসার দিয়েছিলো যে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুরকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। একই ঘটনা কুর্দিস্তান বা কাতালোনিয়ার ক্ষেত্রে ঘটবে এমনটা আশা করা যায় না।
কুর্দিস্তানের পতাকা
এই ক্ষেত্রে পুরো দেশে গণভোট নেয়াও একটি আকাশকুসুম কল্পনা। পুরো ইরাক কখনোই কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার ব্যাপারে একমত হবে না। বা পুরো স্পেন কখনোই কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা দিতে চাইবেনা। স্বাধীনতাকামী নির্দিষ্ট অঞ্চলেই তাই গণভোট নেয়া হয়ে থাক। যেমন সম্প্রতি কুর্দিস্তানে স্বাধীনতার ব্যাপারে গণভোট হয়ে গেলো। বা কিছুদিন পরই কাতালোনিয়াতে গণভোট। ব্রেক্সিটের পর স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার ব্যাপারে এইরকম একটি গণভোট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়।
স্কটল্যান্ডের পতাকা
সংখ্যালঘু তত্ত্বঃ
সংখ্যালঘুর ধারণাই একটি ঔপনিবেশবাদী ধারণা। এই ধারণা আধুনিক কোনো রাষ্ট্রের সাথেই সঙ্গতিপূর্ন নয়। কিন্তু তবু এই তত্ত্ব আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে চর্চিত হয়ে থাকে কারন রাষ্ট্রের বেশিরভাগ জনগণই ঔপনিবেশিক শিক্ষাদীক্ষা থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি। রাষ্ট্রগুলোও তাদের পুরাতন ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে কল্যাণকামী রাষ্ট্র হওয়ার পথে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি। এই দায়ভার স্বাধীনতার নয়।

ইরাকে কুর্দিরা সংখ্যালঘু হিসেবে দীর্ঘদিন নির্যাতিত হয়ে আসছিলো। স্বাধীনতার যৌক্তিক এবং ধারাবাহিক দাবীর প্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালে তারা স্বায়ত্তশাসন পায়। ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি এলাকাগুলোয় তথাকথিত ছোট সংখ্যালঘুরা ইরাকের শাসনের চেয়ে বেশি সুখে ছিলো। কুর্দিস্তানে সংখ্যালঘুরা মূলত ক্যালডিয় খ্রিস্টান, ইয়াজিদি, ইয়ারসানি এবং বাহাই। এছাড়া কুর্দিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলে আরবরাও সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। কিন্তু কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার পেছনে অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এই তথাকথিত সংখ্যালঘুরা। ক্যালডিয়রা আলাদা স্বাধীনতা কমিশন গঠন করেছে। এমনকি কুর্দি এলাকার আরবরাও স্বাধীনতার পক্ষে বিপুল পরিমানে সাড়া দিয়েছে।

কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার যৌক্তিক দাবীতে কেনো সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নির্বিশেষে হ্যা ভোট দিলো? কারন ইরাক বহুদিন ধরে তার নাগরিকদের রক্ষা করতে অক্ষম। সাদ্দাম হোসেনের সময়ে সুন্নিদের দ্বারা শিয়া আর কুর্দিরা নিষ্পেষণের শিকার হয়েছে। আমেরিকান ইরাকে শিয়া কর্তৃক সুন্নি আর কুর্দিরা হয়েছে নিষ্পেষিত। বাকী অতি-সংখ্যালঘুদের কথা তো যতোটুকু গণমাধ্যমে এসেছে, ততটুকুই। সর্বশেষ আইসিসের আক্রমণে পর্যদুস্ত ইরাকি বাহিনী কুর্দি আর সুন্নি এলাকাগুলো নিজেরাই ছেড়ে রেখে চলে এসেছে। ইরাকের অন্যতম প্রধান শহরগুলো যেমন মসুল, রামাদি, ফালুজা, কিরকুক, হিত ইত্যাদি আইসিস দখল করেছে বিনা বাধায়। কুর্দিদের পেশমারগা বাহিনী সম্প্রতি কিরকুক, মসুল আইসিসের হাত থেকে উদ্ধার করেছে। নিজেদের এলাকা যেহেতু কুর্দিরা নিজেরাই দেখে রাখতে পারছে তাই রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের কি দরকার?!

নতুন রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু থাকবে কিনা বা সেখানে সংখ্যালঘুদের কি অবস্থা হবে বা নতুন রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের কিভাবে ট্রিট করা হবে এসবের উপর ‘স্বাধীনতা’ নির্ভর করে না। রাষ্ট্র যদি কল্যাণকামী হয়ে উঠে সংখ্যালঘু তত্ত্ব সেখানে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পরে। রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ এ কল্যাণকামী হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব না। যেসমস্ত ধ্রুবকের কারনে রাষ্ট্র কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠে সেসমস্ত উপাদান নতুন রাষ্ট্রে মজুত আছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

মানব প্রজাতির মৌলিক সমস্যাঃ
প্রজাতি হিসেবে মানবজাতির একটি মৌলিক সমস্যা ‘আমরা এবং তোমরা’। মানুষ নিজেদের খুব সহজেই আলাদা করে ফেলতে পছন্দ করে। আমার মতো যারা তারা ‘আমরা’ আর বাকীরা ‘তোমরা’। ইরাকের ক্ষেত্রে এই আমরা-তোমরা বেশ প্রবল। এখানে তিনটি বড় গ্রুপ সক্রিয়। শিয়া, সুন্নি, কুর্দি। যদি এই তিনটি জাতিকেই আলাদা রাখা হয় তবু সংকটের সমাধান হবে না। কারন তখন শিয়া, সুন্নি, কুর্দি থেকে নতুন নতুন আমরা-তোমরা গজাবে। সুন্নিরা ভাগ হয়ে যাবে মালেকি, হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি গ্রুপে। শিয়ারা ভাগ হয়ে যাবে যায়েদি, জাফরি, ইসমাইলিয়া গ্রুপে। কুর্দিরা ভাগ হয়ে যাবে সোরানি, গোরানি, বখতিয়ারি গ্রুপে। এটা মানবজাতির মূলগত সমস্যা। এই সমস্যা কখনোই একটি জাতির স্বাধীনতা কামনার অন্তরায় হতে পারে না। যদি দুইজন মানুষের জন্য একটা দেশ করা হয় সেখানেও দুইটা দল থাকবে। একজন সংখ্যাগুরু ক্ষমতাসীন দল, অপরজন সংখ্যালঘু বিরোধীদল।


এইসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও স্বাধীনতাকামী অঞ্চলের স্বাধীনতা চাওয়াটাকে অস্বীকার করা যাবে না। টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি, সংখ্যালঘু, অধিকার, মানবাধিকার, কি পারবে কি পারবে না, তলা বিহীন ঝুড়ি ইত্যাদি বায়বীয় টার্ম ব্যবহার করে স্বাধীনতার মৌলিক দাবীকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। 

30 January 2017

রোহিঙ্গা কারা?






আমাদের চলে যেতে হবে ১৪৩০ সালে। আরাকানের স্বাধীন রাজা মিন সাও মন পার্শ্ববর্তী 'বামার' রাজার তাড়া খেয়ে বাংলায় রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। বাংলাতেও তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা। বাংলা সালতানাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ হয়, গনেশপুত্র জালালউদ্দিন যদুর ক্ষমতায় আরোহনের মধ্য দিয়ে। সুলতান জালালউদ্দিন যদুর সহায়তায় ২৪ বছর পর আরাকানের রাজত্ব ফিরে পান, রাজা মিন সাও মন, ১৪৩০ সালে। কৃতজ্ঞতা স্বরুপ তিনি মুসলিমদের 'সুলতান' উপাধী ধারন করেন। রাজদরবারে আরব, ইরানি, তুর্কি ও বাংলার মুসলিমদের উচ্চপদে চাকরি দেন। তখন থেকে স্বাধীন আরাকান রাজ্যের সাথে বাংলার যোগাযোগ। তখন থেকে মুসলিমরা আরাকানে।
'আরাকান' শব্দটি 'রাখাইন' শব্দটির অপভ্রংশ। আঞ্চলিক ভাবে উচ্চারণ করা হয়, 'রা খাই'। মুসলিমরা আরাকানকে ডাকতো 'রৌসাং' বা 'রোসাং' বা 'রোহাং'। আর আরাকানে আরব, ইরানি, তুর্কি ও বাংলার অভিবাসী মুসলিমদের একসাথে ডাকা হতো 'রোহিঙ্গা'। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী আরাকানীদেরও বলা হতো 'রোহিঙ্গা'। তখনকার আরাকান রাজ্যে এখনকার মায়ানমারের রাখাইন স্টেট ছাড়াও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বাংলা সালতানাতের দখলে আসে ১৬৬৬ সালে। এখন পর্যন্ত আরাকানের ভাষার সাথে চট্টগ্রামের ভাষার মিল লক্ষণীয়।
আরাকান রাজ্য ১৭৮৫ পর্যন্ত স্বাধীন ছিলো। ১৭৮৫ সালে পার্শ্ববর্তী মান্দালয়-ভিত্তিক বার্মিজ রাজ্য আরাকান দখল করে নেয়। আর মান্দালয় রাজ্য বৃটিশরা দখল করে নেয় ১৮২৬ সালে। বৃটিশরা ১৯৪৮ সালে মায়ানমার ছেড়ে গেলে আরাকান মায়ানমারের একটি স্টেট হয়। মায়ানমার ১৯৬২-২০১১ সাল পর্যন্ত সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে থাকে।
১৯৮২ সালে মায়ানমারের সামরিক সরকার ১৩৫ টি নৃগোষ্ঠীর একটি তালিকা করে। তালিকাভুক্ত নৃগোষ্ঠীগুলোকে মায়ানমারের বৈধ নৃগোষ্ঠী ঘোষনা করা হয়। বাকী নৃগোষ্ঠীসমূহ মায়ানমারের অধিবাসী নয় বলে বিবৃতি দেয়া হয়। বড় তিনটি সহ আরো ১৭-২২ টি নৃগোষ্ঠী এই তালিকা থেকে বাদ পরে। রোহিঙ্গারা দলভুক্ত হয় বাদ পরা তালিকায়। মায়ানমারের 'অদ্ভুত' আইন অনুযায়ী তারা আর মায়ানমারের নাগরিক থাকলো না।
রোহিঙ্গাদের ধরা হয় সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। জাতিগতভাবে তাদের অবস্থান কুর্দীদের চেয়েও খারাপ। কুর্দীদের নিজেদের কোনো দেশ নেই। তাদের ভূমি চারটি দেশের মধ্যে ভাগেযোগে আছে। আর রোহিঙ্গারা এমন একটি নৃগোষ্ঠী যারা কোনো দেশেরই নাগরিক না। তাদের কোনো দেশ নেই।
মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৩-১৫ লাখ। আর মায়ানমারের বাইরে আছে আরো ১২-১৫ লাখ। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৩-৫ লাখ, সৌদি আরবে ৪ লাখ, পাকিস্তানে ২ লাখ, থাইল্যান্ডে ১ লাখ, মালয়েশিয়াতে ৪০ হাজার, ভারতে ৩৫ হাজার, ইন্দোনেশিয়াতে ১২ হাজার রোহিঙ্গা বাস করছে বলে জাতিসংঘের ধারণা। বর্তমানে রোহিঙ্গারা আরাকান স্টেট এর মোট জনসংখ্যার ৩৫%। সরকারীভাবে দমন করে বাইরে না ঠেলে দিলে তারা ৬০% হতে পারতো।

22 January 2017

মুসলিমদের রাজনীতি বা রাজনীতির মুসলিমগণ


প্রচলিত প্রত্যেকটি ধর্মই মানুষের জীবনাচরণের বিধান নিশ্চিত করে। কিছু কম-বেশি, সব ধর্মই মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি দিকে আলোকপাত করার চেষ্টা করে। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্মগুলোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকে। এর মধ্যে ধর্ম হিসেবে সবচেয়ে বেশি রাজনীতি-মূখী ধর্ম হলো- ইসলাম। সবচেয়ে বেশি বিধান, বর্ণিত এবং বিবৃত হয়েছে ইসলাম ধর্মে, তাই এই ধর্মেরই সবচেয়ে রাজনীতিকরন হয়েছে। আর এই রাজনীতিকরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো মহানবীর আমলেই। শাস্ত্রকারদের মতে, রাষ্ট্র-ক্ষমতা ছাড়া 'ইসলাম' সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই রাজনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং ইসলাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই, এখন পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি বহাল আছে।
ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি বহাল থাকলেও, পথ-মত-নীতি নিয়ে মতাদর্শিক পার্থক্য আছে। রাজনীতিবিদগণ বিভিন্নভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। মোটাদাগে তাদের মধ্যে অন্তত দুইটি প্রধান ভাগ আছে। এবং বর্তমান সময়ে এই দুই ভাগেরই, যারা আলাদা আলাদা ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করছেন, তাদের মধ্যে বিভেদ অত্যন্ত প্রকট। তাদের দুই দলের হাতেই যথেষ্ট পরিমান তথ্য-প্রমান, দলিল, ঐতিহাসিক উপাদান আছে, রাজনৈতিক ইসলামের মত-পথে নিজেদের সত্য এবং বাকীদের মিথ্যা প্রমান করার মতো।
এর এক পাশে আছেন, মডারেট মুসলিম রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল সমূহ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের 'জামায়াত এ ইসলাম', ইন্দোনেশিয়ার 'জেমাহ ইসলামিয়া', আরব বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে 'ইখওয়ানুল মুসলেমিন- মুসলিম ব্রাদারহুড'। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে বেনামে মুসলিম ব্রাদারহুড, যেমন- তুরস্ক এবং মরোক্কোতে 'জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি', তিউনিসিয়ায় 'আন-নাহদা আন্দোলন', মিসরে 'ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি' ইত্যাদি। এছাড়া ফিলিস্তিনের 'হামাস', মালয়েশিয়ার 'প্যান মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি' উল্লেখযোগ্য।
এইসব রাজনৈতিক দল, প্রথাগত গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত। এরা গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চায়। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতায় আসলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এই দলগুলো নিজেদের দলের ভেতরেও গণতন্ত্র চর্চা করে।
অপর পাশে আছে, বিভিন্ন জিহাদি দল। যারা মনে করে একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জিহাদের একবার ক্ষমতায় চলে আসলে, রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। এদের মধ্যে আছে, আন্তর্জাতিক জিহাদি সংগঠন 'আল-কায়েদা'। আল-কায়েদা জিহাদের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। এদের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শাখাগুলো হচ্ছে- আরব উপদ্বীপের আল কায়েদা (আল কায়েদা ইন আরাবিয়ান পেনিনসুলা- আকাপ), ভারতীয় উপমহাদেশের আল কায়েদা (আল কায়েদ ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট- আকিস), মালয় দ্বীপপুঞ্জের আল কায়েদা (আল কায়েদা ইন মালায় আর্কিওপেলাগো- আকমা), ইসলামি পশ্চিমের আল কায়েদা (আল কায়েদা ইন ইসলামিক মাগরেব), পশ্চিম আফ্রিকার আল কায়েদা, সোমালিয়ার আল কায়েদা, ইরাকের আল কায়েদা, বসনিয়ার আল কায়েদা ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন আল কায়েদার সাথে জোট বেধে আছে। এদের মধ্যে উল্লেক্ষ্য- পাকিস্তানের 'তেহরিক ই তালিবান', আফগানিস্তানের 'তালিবান', সিরিয়ার 'আল নুসরা ফ্রন্ট', ইয়েমেনে 'আনসার আল শরিয়া' ইত্যাদি। বৃহত্তম এই ছত্রি-সংগঠন ছাড়াও আরো জিহাদি দল আছে, যারা জিহাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন- আরব বিশ্বে 'হিজবুত তাহরীর', ইরাকে 'আনসার আল ইসলাম', সোমালিয়ায় 'আল শাবাব' ইত্যাদি।
জিহাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অতি জিহাদি কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের দাবী মতে, তারা এখন একটি 'ইসলামি রাষ্ট্র' এবং সারা পৃথিবীর মুসলিমদের তারা প্রতিনিধিত্ব করে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জিহাদি সংগঠন তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এদের মধ্যে আছে- নাইজেরিয়ার 'বোকো হারাম', মধ্য এশিয়া এবং চীনের উইঘুর অঞ্চলের 'তুর্কিস্তান ইসলামি মুভমেন্ট', ফিলিপাইনের 'আবু সায়াফ গ্রুপ', বাংলাদেশে 'আনসারুল্লাহ বাংলা টিম', ইরাক ও সিরিয়ায় 'জুন্দ আল খলিফা' ইত্যাদি।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে আগেই মুসলিম রাজনীতিকগণ দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। এক পক্ষে গণতন্ত্রের পক্ষে, অপরপক্ষ বিপক্ষে। সম্প্রতি, খেলাফতের প্রশ্নে গণতন্ত্রের বিপক্ষের রাজনীতিকগণ আবারো দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। এক পক্ষ এখনই খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দিয়ে দিয়েছে। অপর পক্ষের মতে খেলাফতের জন্য মুসলিম বিশ্ব এখনো প্রস্তুত না।
আগেই মুসলিম রাজনীতিবিদগনের মধ্যে গণতন্ত্রচর্চা প্রসঙ্গে মতানৈক্য হয়েছিলো। কেউ গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে ইসলামকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার রাজনীতিতে ছিলেন, কেউ সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টায় আছেন। সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় 'ইসলামিক স্টেট- আইএস' নামে খেলাফত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর, জিহাদিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে। ১৯৯০ যিশুসনের আগ পর্যন্ত জিহাদের একটা ফর্ম হিসাবে স্বাধিকার আন্দোলনও যুক্ত ছিলো। বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমদের স্বাধিকার আন্দোলনকে জিহাদ হিসেবে অভিহিত করা হতো। যেমন- ফিলিস্তিন, ফিলিপাইনের বাঙসামরো অঞ্চল, বসনিয়া, রাশিয়ার চেচনিয়া-দাগেস্তান অঞ্চল, চীনের উইঘুর অঞ্চল, মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল, ভারতের কাশ্মীর ইত্যাদি ভূখণ্ডের স্বাধিকার আন্দোলনকে জিহাদের সাথে তুলনা করা হতো।
১৯৯০ যিশুসনের পর জিহাদের চেহারা বদলে যেতে থাকে। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য, প্রতিষ্ঠিত হয় আফগান জাতীয়তাবাদী জিহাদি সংগঠন 'তালিবান' এবং বহুজাতিক জিহাদিদের আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম 'আল-কায়েদা'। তারপর থেকেই মুসলিম দেশগুলোতে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন জিহাদি সংগঠন। এছাড়া ছোট আকারে গড়ে ওঠে 'হিজবুত তাহরীর'।
আল-কায়েদা তার স্বরূপে আসে ২০০১ যিশুসনে, আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিমান হামলার মাধ্যমে। এর পর পরই পৃথিবীব্যাপী তাদের রিক্রুটমেন্ট বেড়ে যায়। তখন পর্যন্ত আল-কায়েদার জিহাদিরা গিয়ে জড়ো হতো আফগানিস্তানে। ২০০৩ যিশুসনে আমেরিকা ইরাক আক্রমন করে। ২০০৬ যিশুসনে আল-কায়েদা ইরাকে তাদের নতুন শাখা খোলে, 'ইরাকের আল-কায়েদা'। এর পর আল-কায়েদা নিজেদের বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে শাখা সম্প্রসারণ করে। একে একে খোলা হয় আরব উপদ্বীপের আল-কায়েদা, উত্তর আফ্রিকার ইসলামি পশ্চিম আল-কায়েদা, সোমালিয়ার আল-কায়েদা, মালয় দ্বীপপুঞ্জের আল-কায়েদা, চেচনিয়ার আল-কায়েদা, স্পেনের আল-কায়েদা ইত্যাদি। এছাড়া বিশ্বব্যাপী জিহাদ সংগঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের জিহাদি সংগঠনগুলো আল-কায়েদাকে সমর্থন করে এবং একসাথে কাজ করতে সম্মত হয়। এদের মধ্যে ভারতের হরকাতুল জিহাদ, পাকিস্তানের তেহরিক ই তালিবান, লস্কর ই তাইয়েবা, ফিলিপাইনের আবু সায়াফ, সোমালিয়ার আল শাবাব, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আনসার আল ইসলাম, আনসার আল শারিয়াহ, আনসার আল দিন, আনসার আল জিহাদ উল্লেখ্য।
বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদার নেতা ছিলেন ওসামা বিন লাদেন। তার মৃত্যুর পর নেতা হন, আইমান আল জাওয়াহিরি। তাদের বলা হয় শায়েখ। শাখা আল-কায়েদাগুলোর জন্য আলাদা আলাদা আমির। ইরাকের আল-কায়েদার আমির ছিলেন আবু ওমর আল বাগদাদী। তার মৃত্যুর পর আমির হন-আবু বকর আল বাগদাদী।
২০১১ যিশুসনে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরবী ভাষাভাষী দেশগুলোতে শুরু হয় 'আরব বসন্ত'। আরব বসন্ত গণতন্ত্র না আনুক, সুশাসন না আনুক, জিহাদিদের জন্য বসন্ত নিয়ে আসে। ইরাকের আল-কায়েদা সুন্নি-অধ্যুষিত কয়েকটা ছোটো শহর দখলে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে- 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক'। এই সময়েই সিরিয়ায় শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের সুযোগে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক, সিরিয়ায় প্রবেশ করে এবং প্রতিষ্ঠা করে, 'ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড শাম' বা আইসিস বা আইএস।
২০১৪ যিশুসনের ৩ ফেব্রুয়ারি 'ইসলামিক স্টেট' তাদের আমির আবু বকর আল বাগদাদীর নেতৃত্বে আল-কায়েদার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আলাদা কাঠামো তৈরী করে। ২৯ জুন, ২০১৪ যিশুসনে ইরাক এবং সিরিয়ায় তাদের অধিকৃত সুন্নি অঞ্চলগুলো নিয়ে একতরফা খেলাফত ঘোষনা দেয়। বেশিরভাগ জিহাদি সংগঠন এতে সম্মত ছিলো না, বিশেষত আল-কায়েদা এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। আল-কায়েদা সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আলাদা ফ্রন্ট গড়ে তোলে, এর নাম রাখা হয়- আল নুসরা ফ্রন্ট।
এর পর আবু বকর আল বাগদাদীকে কয়েকটি জিহাদি সংগঠন খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আনসার দ্বীন, জুন্দুল্লাহ, জুন্দ আল খালিফা, আনসার আল শরিয়া, মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তান ইসলামি মুভমেন্ট, বাংলাদেশের আনসারুল্লাহ বাংলা টিম উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশ থেকে জিহাদিরা খেলাফতের পক্ষে সিরিয়ায় গিয়ে জড়ো হতে থাকে।
খেলাফতের পক্ষের জিহাদিদের মতে এখনই খেলাফত প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত সময়। সেক্ষেত্রে আবু বকর আল বাগদাদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অপরপক্ষে আল-কায়েদা ও তার ভাতৃ-প্রতিম সংগঠনগুলো মনে করে, এখনো খেলাফত প্রতিষ্ঠার সময় আসে নি। আর খলিফা যদি হতেই হয়, তাহলে আল-কায়েদা প্রধান হিসেবে শায়খ আইমান আল জাওয়াহিরিই হবেন এ জমানার খলিফা; আবু বকর আল বাগদাদি কে? আল-কায়েদা নিজেও বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। কোনো অফিসিয়াল ঘোষনা না আসলেও এরই মধ্যে তারা ভূমিদখলের কাজ শুরু করে দিয়েছে। সিরিয়াতে আল নুসরা ফ্রন্টের ব্যানারে তারা ইদলিব ও আলেপ্পো প্রদেশের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে। কিছু কিছু স্থানে সরাসরি ইসলামিক স্টেট এর জিহাদিদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে জড়িয়ে পরছে। ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সুযোগে তাদের 'আরব উপদ্বীপের আল-কায়েদা শাখা' হাদরা মাউত, আতাক ও আবিয়ান প্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। লিবিয়াতেও গৃহযুদ্ধের সুযোগে 'শরিয়ত ব্রিগেড' দের্না, সির্ত ও বেনগাজি শহর দখল করে নিয়েছে। আফগানিস্তানের কুন্দুজ প্রদেশ অনেক আগে থেকেই আল-কায়েদার দখলে।
এভাবেই আল-কায়েদা বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই তারা ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক 'ইসলামিক স্টেট' এর খেলাফতকে অস্বীকার করে। ইতিমধ্যে দুই গ্রুপ নিজেদের আসল ইসলামের রক্ষাকারী, এবং অপরপক্ষকে মুরতাদ বলে ঘোষনা দিয়েছে। আর এই দুই গ্রুপকেই মুরতাদ বলে ঘোষনা দিয়েছে, তুলনামূলক কম শক্তিশালী জিহাদি গ্রুপ হিজবুত তাহরীর। তারাও আল-কায়েদার মতো বিশ্বব্যাপী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু বাকী গ্রুপ গুলোর তুলনায় তারা জমিদখলে পিছিয়ে।

27 September 2016

ব্রেক্সিট ও স্কটল্যান্ড ইস্যু

মানচিত্রঃ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। 


ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর প্রতিষ্ঠা ১৯৫৭ সালে। যুক্তরাজ্য সেখানে যোগদান করে ১৯৭৩ সালে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নিজস্ব কিছু নীতিমালা আছে। সদস্যরাষ্ট্র গুলো সেগুলো মেনে ইউনিয়নে যোগদান করে, এবং সেগুলো মেনে চলতে হয়।
ইউনিয়নে যোগদান করলে বড় রাষ্ট্রগুলোর আসলে অসুবিধা। আর ছোটো রাষ্ট্রগুলোর সুবিধা। যেমন কারো অর্থনীতি ডাউন হলে, তাকে সবাই মিলে টেনে তোলে। যেমন- গ্রীস। তাকে ইউনিয়নের সবাই টেনে তুলেছে, সবার কন্ট্রিবিউশন ছিলো। কিন্তু সবচেয়ে বড় অনুদানটা দিতে হয়েছে, জার্মানীর। তাই জার্মানীর অর্থনীতিতে আবার এটার প্রভাব পরেছে।
আবার এখন, ইউনিয়নের মাথাব্যাথা সিরিয়া আর ইরাক থেকে আসা শরণার্থীরা। প্রায় ৪০ লাখ শরণার্থী আছে ইউরোপে। ইউনিয়ন সেটা সবার মধ্যে ভাগ করে দিবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাগটা পরেছে জার্মানীর, প্রায় ১০ লাখ। কেউ কেউ বলছিলো, তারা শরণার্থী নিবে না। যেমন- যুক্তরাজ্য, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, এস্তোনিয়া। কিন্তু ইউনিয়ন প্রেসার দিয়েছে। শরণার্থী নেয়াই লাগবে। যুক্তরাজ্য সেই প্রেসার নিবো না।

ইউনিয়নের ব্যাপারে, যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
১. ইউনিয়ন সবসময় যুক্তরাজ্যের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চায়।
২. সেক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, জার্মানী বা ফ্রান্সের সমান মর্যাদা পায় না। (জার্মানী আর ফ্রান্সের সাথে যুক্তরাজ্যের আগে থেকেই প্রতিযোগিতা)।
৩. ইউনিয়নের কারনে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ডাউন খেয়েছে, পাউন্ডের দাম কমছে।

যুক্তরাজ্যের ব্যাপারে, ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
১. সে জার্মানী আর ফ্রান্সের সমান মর্যাদা চায়, অথচ তাদের সমান দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত না।
২. ইউনিয়নের যৌথ কাজ গুলোর ব্যাপারে যুক্তরাজ্য সহমর্মী না।
সুতরাং যুক্তরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে গণভোট নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। যার নাম দেয়া হয় 'ব্রেক্সিট'।

স্কটল্যান্ড ইস্যুঃ
স্কটল্যান্ড এর আগে ২০১৪ এর সেপ্টেম্বরে স্বাধীনতার পক্ষে গণভোট নেয়। সেই গণভোটে স্বাধীনতাকামীরা ৪৮% বাই ৫২% ভোটে হারে। স্কটল্যান্ডের জনগণ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকতে চায়। তারা ভেবেছে, যুক্তরাজ্য যেহেতু ইউনিয়নে আছে, আলাদা হয়ে গেলে আল্টিমেটলি তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবে। তারা ব্রেক্সিটেও ইউনিয়নে থাকার পক্ষে মত দেয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য যেহেতু ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবার পক্ষে জয়লাভ করছে, স্কটল্যান্ড তাই আবার স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট চায়। এবার তারা যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হয়ে, স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগদান করবে। হয়তো ২০১৭ সালেই নতুন রেফারান্ডাম আসবে।
স্কটল্যান্ডের পতাকা

একই ইস্যু উত্তর আয়ারল্যান্ড এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নে এখনো গণভোট হয় নাই, এবং হওয়ার ব্যাপারে কোনো আলোচনাও এখনো হয় নাই। তবে স্কটল্যান্ড স্বাধীন হওয়ার পর, উত্তর আয়ারল্যান্ড ইস্যু জোরদার হতে পারে।

ব্রেক্সিট ভোটে যুক্তরাজ্যঃ
১. স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড এ ইউনিয়নে থেকে যাবার পক্ষে ভোট বেশি। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস এ বের হয়ে যাবার পক্ষে ভোট বেশি।
২. যুক্তরাজ্যের তরুন সমাজ ইউনিয়নে থেকে যাবার পক্ষে, মধ্যবয়সীরা বের হয়ে যাবার পক্ষে।
৩. সংসদের সরকারি দল ও বিরোধীদল দুই পক্ষই, ইউনিয়নে থেকে যাবার পক্ষে, জনগণের বৃহৎ অংশ বের হয়ে যাবার পক্ষে।
৪. ৫১.৯০% জনগণ বের হয়ে যাবার পক্ষে, ৪৮.১০% জনগণ থেকে যাবার পক্ষে।

[সাধারণ তথ্যঃ 
দেশঃ যুক্তরাজ্য। United Kingdom.
পূর্ণ নামঃ United Kingdom of Great Britain and Northern Ireland.
রাজ্যভাগঃ ১. ইংল্যান্ড, ২. স্কটল্যান্ড, ৩. ওয়েলস, ৪. উত্তর আয়ারল্যান্ড।]