Showing posts with label আত্মকথন. Show all posts
Showing posts with label আত্মকথন. Show all posts

16 January 2024

লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস


ছোটবেলায় পড়া প্রবাদবাক্য এভাবে সত্য হয়ে জীবনে ফিরে ফিরে আসবে, কখনও ভাবিনি। কিন্তু আমাদের ভাবনা দিয়ে তো আর দুনিয়া চলে না, প্রবাদ তাই আমাদের জীবনে বারবার ঘুরেফিরে আসে।

‘লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস’ প্রবাদবাক্যটি আমি প্রথম শুনি, অনেক ছোটবেলায় আমার আব্বার মুখে। তখন আমি হয়তো কলেজে উঠেছি। রাত জাগা শুরু করেছি। দিনে ঘুমাই, রাতে বসে মুভি দেখি, বই পড়ি, কবিতা লেখি। কেমন এক স্বপ্নের মতো জীবনে বসবাস ছিল তখন, এখন তা ভাবি। কোনো চিন্তা বা দুশ্চিন্তা নেই; বাসা ভাড়া দেয়া, বাজার করা, বাসে চড়া, চাকরি করা, বসের অকারণ বকাবাজি শোনা, সুন্দর মুখোশের কলিগদের অকারণ পলিটিক্স কিছুই ছিলো না জীবনে।

তখনকার রুটিন ছিল অনেকটা এরকম - সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে বের হতাম, কমপক্ষে রাত ১১টা পর্যন্ত গল্পের উজির-নাজির মেরে বাসায় এসে খাওয়া-দাওয়া করতাম, রাত ১২টায় মুভি দেখা শুরু করতাম বা নতুন কোনো বই বা কবিতা, নতুবা এমনি বসে থাকা, ভোরে নাস্তা করে ঘুমুতে যাওয়া, দুপুর ২টায় ঘুম থেকে উঠে ভাত খেয়ে ঝিমুতে ঝিমুতে সন্ধ্যার আড্ডার জন্য প্রস্তুতি নেয়া, ব্যাস এইটুকুই। আব্বা মাঝেমাঝে রাতে উঠলে দেখতে পেতেন আমার রুমের লাইট জ্বালানো, ছুটির দিনে দেখতেন অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠছি। তখন একদিন রাতে আমার রুমে এসে আব্বা এই প্রবাদবাক্যটি বলেছিলেন।

আমার আব্বা অনেক ভালো ভালো কথা বলেছেন আমাদের, কিন্তু বলার ধরণ হয়তো ভালো ছিল না। সত্যি বলতে কি, তখন এসব কথা আমাদের ভালো লাগতো না। ওপরের বাক্যের সাথে প্রাসঙ্গিক নানান কথা আব্বা বিভিন্ন সময় আমাদের বলেছেন, বাইরের দুনিয়া কতো কঠিন, টাকা কামাই করা কতো কঠিন, মানুষ ও সম্পর্ক মেইনটেইন করা কতো কঠিন; অফিস, বস আর কলিগদের সাথে চলা; পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়া, বাজার করা, অর্থ লেনদেন করা ইত্যাদি সব বিষয় নিয়েই বলেছেন। কিন্তু কখনও কানে তুলিনি। এখন মনে হয়, তখন যদি মন দিয়ে আব্বার কথা শুনতাম, এখন কিছুটা হলেও ঝামেলা কম হতো! এখন এই লেখা যারা পড়বেন তারাও হয়ত আমার মতো - ‘ধ্যাত, খালি বেশি কথা বলে’ ভেবে রঙিন জগতে ডুব দিবেন। তবে সময় হওয়ার পর যখন এই কথাগুলো বুঝতে শুরু করবেন, তখন দেখতে পাবেন, পেছনে ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় খোলা নেই। আমার আব্বা নিজের দায়িত্ব ঠিকই পালন করেছেন, আমারই বোঝার মতো বয়স তখন হয়ে উঠেনি।

এখন যখন আস্তে আস্তে সব বুঝতে শুরু করেছি, সারভাইভাল টু দ্য ফিটেস্টের দুনিয়ায় একদম তলানিতে নিজেকে আবিষ্কার করেছি। আবার নতুন করে সব শুরু করতে হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যেই কেটে গেছে অনেকখানি সময়। পশ্চিমা দুনিয়ার বাচ্চাদের কমপক্ষে এক যুগ পর নিজের দায়িত্ব নেয়া শিখেছি। প্রতিটি পদক্ষেপে ঠকে-ঠেকে মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি, এখনও পাচ্ছি। অন্তর্দৃষ্টি-সম্পন্ন কোনো জ্যোতিষীর মতোই আব্বার দিব্যবানী প্রতিদিন হুবহু মিলে যায়। 

আমি পাবলিক বাসে মানুষের গাদাগাদির ভেতর একলা বসে ভাবতে থাকি পুরনো দিনের কথা। 

4 June 2022

মাটির চুলা

 


অনেক ছোটবেলায় রোজার ঈদ করতে নানাবাড়ি যেতাম আমরা। রোজার ঈদ নানাবাড়ি আর কোরবানির ঈদ দাদাবাড়ি। তখন নানাবাড়ি যেতে খুব ভালো লাগতো। আমরা তিন ভাই সারা বছর অপেক্ষা করে থাকতাম কখন নানাবাড়ি রোজার ঈদ হবে, আর কখন নানাবাড়ি যাবো! অন্তত ক্লাস টেন পর্যন্ত এই ছিলো আমাদের ঈদের ছুটির রুটিন। ঐ সময় মনে হতো নানাবাড়ির দিককার আত্মীয়স্বজনেরাও রোজার ঈদে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছেন।

কতো স্মৃতি সেই সময়ের! কতো মানুষ, খোলা উঠান, শুকনো চরা, সমবয়সী কাজিনেরা মিলে গ্রাম আর গ্রামের হাট-বাজার ঘুড়ে বেড়ানো, দিনভর খেলাধুলা, আব্বা-আম্মার শাসনহীন সাতদিন। কিন্তু এর মধ্যে আজকে বলবো একদম ছোটবেলাকার একটা স্মৃতি। আমি পড়ি ক্লাস টু বা থ্রিতে, ঠিক মনে নেই। নানাবাড়িতে আম্মার এক চাচাত বোন ছিলেন, আমাদের খালা, নাম হাসিনা। তিনি তখন পড়তেন ক্লাস নাইন বা টেনে। তিনি আমাদের খুবই আদর করতেন।

হাসিনা খালা খুবই হাসি-খুশি মানুষ ছিলেন। আমার যতোদূর মনে পড়ে খুবই চঞ্চল ছিলেন তিনি। দৌড়াদৌড়ি করতেন, খেলতেন, আশপাশের সবার সঙ্গে হেসে কথা বলতেন, দুষ্টামি করতেন। চানরাতে আমাদের হাতে মেহেদী দিয়ে দিতেন। আমার নাকের নিচে কলম দিয়ে গোঁফ এঁকে দিতেন। তারপর সবাইকে দেখাতে নিয়ে যেতেন; পুশকিনে বড় হইয়া গেছে, দেখেন অর মোচ হইছে! তখন বাড়িতে আম্মার বেশ কয়েকজন চাচাত বোন ছিলেন, যারা স্কুলে পড়তেন। মাইনূর, কোহিনূর, হাসিনা খালার এক বড় বোন; নাম মনে নেই, তার সাথেই পড়তেন। সবার চেয়ে বেশি প্রাণোচ্ছল ছিলেন হাসিনা খালা।

হাসিনা খালা আমাকে কোলে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতেন। খেতের মাঝখানের আইল ধরে আমাকে কোলে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতেন তিনি। আশপাশের বাড়িতে নিয়ে যেতেন, বলতেন- আমাদের মুশফিকা আপার ছেলে, ঢাকা থাকে। নানাবাড়ির পেছনের দিককার খেতগুলোর মাঝখানে তখন দুইটা বড় তাল গাছ ছিল। সেই তাল গাছের ছায়ায় আমাকে নিয়ে বসে থাকতেন তিনি। তার স্কুলের বান্ধবীরা আমাকে দেখতে একবার তার বাড়িতে এসেছিলেন।

তখন মাটির চুলায় রান্না হতো। আমারও একদিন শখ হলো নিজের জন্য একটা মাটির চুলা লাগবে। হাসিনা খালারা প্রথমে আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, এগুলো মেয়েদের খেলা; চুলা, হাঁড়ি-পাতিল, রান্না-বান্না। ছেলেদের খেলা হলো ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, হাডুডু। আমি যখন নাছোড়বান্দা, তখন তিনি রাজি হলেন, ঠিক আছে তোকেও একটা চুলা বানিয়ে দিবো। সেই দুই তাল গাছের নিচে আমার জন্য চুলা বানাতে বসলেন তিনি। খেতের পাশের খাল থেকে কাদা তুলে আনলেন। সেগুলো আকার দিয়ে, লেপে, রোদে দিয়ে, দুই দিনেই বানিয়ে ফেললেন মাটির চুলা। সেই চুলার ওজন একটু বেশি হলেও তিনি সেটা ধরে এদিক-ওদিক সরাতে পারতেন।

এই ছিল হাসিনা খালার সাথে আমার স্মৃতি। আত্মীয় এবং কাছের লোকদের খোঁজখবর না নেওয়ার বিষয়ে আমার একটা দুর্নাম আছে। এর মধ্যে জীবন চলেছে জীবনের গতিতে। নানান কাজে ও অকাজে ব্যস্ত থেকেছি। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর দীর্ঘদিন নানাবাড়ি যাইনি। এসময় ঢাকাতেই ঈদ করতাম। তখন চিটাগাং রোড-কাচপুর এলাকায় মারাত্মক যানজট হতো। যানজট ভালো লাগতো না বলে দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি কোথাও যেতাম না। মাঝখানে শুধু আম্মার কাছ থেকে শুনেছিলাম, পাশাপাশি কোনো এক গ্রামে হাসিনা খালার বিয়ে হয়েছে।

এরপর কোনো এক কাজে নানাবাড়ি যাই মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার পর, ২০১৩ সালে। নানাবাড়ি আর আগেকার মতো নেই। নানাবাড়ির সেই খোলা উঠানে কোনো এক মামা বাড়ি বানিয়েছেন। নিজেদের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ করে কেউ বেড়া দিয়েছেন; যাদের স্বামর্থ আছে তারা তুলেছেন ইটের দেয়াল। যাদের সাথে খেলতাম, ছেলেরা কাজের জন্য ঢাকা বা বিদেশবিভূইয়ে পাড়ি জমিয়েছেন, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। পিঠাপিঠি মামাতো ভাই শ্যামলও নেই তখন ৪ বছর হয়েছে। কেমন যেনো এক শূন্যতা! কেমন যেনো এক হাহাকার!

নানীকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাসিনা খালা আসে না বাড়িতে? এই প্রশ্নটা না করলেই ভালো হতো। নানী বললেন, অয় তো এখানেই থাকে অনেকদিন। আমিতো জানি না কিছু। খুশি মনে বের হলাম, তিন ঘর পরেই হাসিনা খালাদের ঘর, গিয়ে দেখে আসি। গিয়ে দেখলাম, একটা খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা আছেন তিনি। উস্কুখুশকু জামা-কাপড়, চুল। চোখে-মুখে রাজ্যের বিষণ্নতা। সাথে সাথে আমি ধাক্কা খেলাম। হাসিনা খালা আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। ‘পুশকিনে আইছে… কেমন আছস বাবা… এত দিন পর নানিবাড়ি আসে কেউ… কেমন আছস… কতো বড় হইছে আমাগো পুশকিনে…’

আমার সাথে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বললেন খালা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার শরীর কেমন আছে, বললেন- ভালো। শিকলের কথাটা আর তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। খুব দ্রুত ভালো থাইকেন খালা, বলে সেখান থেকে চলে আসলাম আমি।
এসে নানিকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাসিনা খালার কি হয়েছে, তাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে কেন? নানি যা বললেন তার সারসংক্ষেপ হলো এই যে, তার জামাইটা ভালো পড়ে নাই। খালি মারধর করতো, অত্যাচার করতো। একটা মেয়ে হয়েছিলো তার। মাথার সমস্যা নাকি আগেই টুকটাক দেখা দিয়েছিলো। একদিন কাউকে কিছু না বলে, মেয়েকে নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে, ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন খালা। ঢাকায় গিয়ে মেয়েকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলেন তিনি। তখন মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে যায় তার।

মেয়েকে আর খুঁজে পান নি হাসিনা খালা। ঢাকায় পাগলের মতো কিছুদিন এই এলাকা ঐ এলাকা ঘোরাঘুরি করেন আর মেয়েকে খোঁজেন। একদিন তাদের গ্রামের এক লোক তাকে দেখে চিনতে পারেন। তিনি তার ভাইদের ফোন দেন। ভাইয়েরা গিয়ে তাকে ঢাকা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এমনিতে কথাবার্তা স্বাভাবিক। শুধু যখন মেয়ের কথা মনে পড়ে তখন পাগল হয়ে যান খালা। মেয়েকে খুঁজতে তখন ঢাকার দিকে রওনা দিতে চান তিনি। এ জন্যই তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। জামাই আরেকটা বিয়ে করেছে, খোঁজখবরও নেয় না।

এরপর আমি আর নানাবাড়ি যাইনি। এখন হাসিনা খালার কি খবর তাও জানি না। তার সাথে আমার দুইটা স্মৃতি। আমি যতোই মাটির চুলার কথা মনে করতে যাই ততোই তা ঝাপসা হয়ে আসে। খেতের মাঝখানে দৌড়ানো হাসিনা খালাকে আমি দেখতে পাই শিকল দিয়ে বাঁধা। ঢাকায় আমি যখন কিছু না কিছু করছিলাম, খালা তখন তার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।

মানুষের জীবন তো আসলে কয়েকটা ঘটনা মাত্র; আসলে কিছু স্মৃতির সমষ্টি। আমার জীবন আর অন্য কারও জীবন এক বিন্দুতে মিলে যায়, যখন আমাদের দেখা হয়।

2 June 2022

সুইসাইড নোট


ইদানিং শুধু সুইসাইড হচ্ছে আশপাশে। মাঝে মাঝে মনে হয়, যারা সুইসাইড করছে তারা কি আমার চেয়েও বেশি বিষণ্ন? তারা কি আমার চেয়েও বেশি কষ্টে আর হতাশায় আছে? তাদের জীবন কি আমার জীবনের চায়েও ভারী যে তা আর বহন করা যাচ্ছে না? কখনো কখনো যে আমার নিজের মনে হয় নি যে সুইসাইড করে ফেলি, তা নয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই জীবন থেকে ছুটি দরকার। কখনো মনে হয়, জীবনে যা দরকার ছিলো সব পেয়ে গেছে, নতুন করে আর কিছু পাওয়ার দরকার নেই। কখনো জীবনকে এতো ভারী মনে হয় যে, আর বহন করতে পারছি না।

এই যেমন, আজকেই ভাবছিলাম, জীবনটা যদি আবার শুরু করা যেতো, মন্দ হতো না। আবার শুরু থেকে শুরু করতাম! হয়তো শৈশবের সেই দুরন্ত সময়ে ফিরে যেতাম; কোনো চিন্তা নেই। শুধু স্কুলে ক্লাস করা, পড়াশোনা করা আর খেলা। অথবা বিশ্ববিধ্যালয় জীবনে; রাত জেগে আড্ডা দেওয়া আর ছবি দেখা, চা খাওয়া আর বই পড়া। কোনো চিন্তা নেই, অতীত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আসলেই কি তাই? এর পরেই ভাবনা এলো, জীবন তো একটাই। সুখদুঃখ, আনন্দ-বেদনা, দুশ্চিন্তা-অনুশোচনা সব এই এক জীবনকে ঘিরেই। যারা যায় আর ফিরে আসে না, আর ফিরে আসা সম্ভবও না। জীবন মাত্র একবারই আমাদের চেতনাকে এই সুযোগ দিচ্ছে। ভালো হলেও ভালো, খারাপ হলেও ভালো; আমাদের কাজ শুধু বর্তমানে বাঁচা।

আমি আমার জীবনের প্রথম সুইসাইড নোট লিখি ক্লাস সিক্সে। তখন আমি সুইসাইড শব্দটির সাথে পরিচিত, কিভাবে তা করে জানি না। কি এক কারণে যেন খুব অভিমান হয়েছিল আব্বার ওপর। বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল নিজের জীবনের ওপর। কিন্তু ঠিক কি কারনে এমনটা হয়েছিল, এখন আর তা মনে পড়ে না। মনে হলো সুইসাইড করবো; কালকেই করবো। স্কুলের কোনো এক হোমওয়ার্ক খাতার পেছনের পৃষ্ঠায় গোটা গোটা হাতে কি লিখেছিলাম এখন তাও আর মনে নেই। শুধু মনে আছে মূল বিষয়টি। ‘আমি যদি মরে যাই, আমার যা আছে, তা ছোটো দুই ভাই আসিফ আর আবীরের মধ্যে সমান ভাগ করে দিও।’

আমার যা আছে বলতে, আমার আসলে তখন কিছুই ছিলো না। কয়েকটা কমিকসের বই আর কাপড়-চোপড়। ঐ সময় আমার দুই ভাই আমার খুব কাছে ছিলো। ভাগ কিভাবে করে তাও বুঝতাম না। তবে মনে হয়েছিল, সমান দুই ভাগ করে দিতে হবে; নাহলে খুব অন্যায় হয়ে যাবে। কিভাবে মরবো সে বিষয়েও কিছুটা ভেবেছিলাম। এটা আমার এখনো মনে পড়ে। তখন শুনতে পেতাম, কেউ বিষ খেয়েছে বা গলায় দড়ি দিয়েছে। কিন্তু আমি তখন এতো ছোটো ছিলাম যে, বিষ বা দড়ি কিভাবে জোগাড় করা যায়, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তাই ভেবে বের করেছিলাম, ট্রাকের নিচে পড়ে মরে যাবো।

আমি তখন বেশ কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে হেঁটে স্কুলে যাই। স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটায় চলে ট্রাক। ট্রাককে আমার মনে হতো দানবীয় কোনো যানবাহন। এর সঙ্গে সামান্য গুঁতা খেলেও আর রক্ষা নেই। তখন ভেবে বের করেছিলাম, এরকম কোনো ট্রাক যাওয়ার সময় আস্তে করে এর নিচে পড়ে যাবো। সবাই মনে করবে এক্সিডেন্ট, কিন্তু আসলে সুইসাইড। আমার মরাও হবে আবার কেউ বুঝতেও পারবে না। হঠাৎ আবার আব্বা-আম্মা, আসিফ-আবীর, স্কুলের বন্ধু, খেলার মাঠ আর কমিক্স বইগুলোর জন্য কষ্ট হলো। কিন্তু কি আর করা কিছু পেতে হলে তো কিছু ছাড়তে হয়। মৃত্যুকে পেতে হলে এসব মায়া আমাকে ছাড়তে হবে। আমার এইটুকু মনে আছে সেদিন রাতে একাকী কেঁদে ঘুমাতে গিয়েছিলাম।

পরদিন উঠে পুরো বিষয়টা আমি একদম ভুলে যাই। পরদিন আবার স্কুলে যাই, স্কুলের মাঠে টিফিন পিরিয়ডে বরফ-পানি খেলি, স্কুল থেকে এসে নিজেদের গলিতে ক্রিকেট খেলি। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসি। রাতে টিভিতে সিন্দাবাদ বা হারকিউলিস দেখি, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমাতে যাই। ক্লাস সিক্সের পুরো বছর বিষয়টা আর আমার মনে পড়ে না।

এরপর ক্লাস সেভেনে বা এইটে, পুরোনো খাতা বিক্রি করার আগে একটু ঘেটে দেখছিলাম। তখন ঐ খাতাটা আবার আমার সামনে পড়ে। একটু ভয়ও পাই, তাও ভালো খাতাটা আম্মার হাতে পড়েনি, পড়লে তো অন্তত একদফা নিশ্চিত মাইর। আবার কষ্টও লেগেছিলো, ছোটোবেলায় কতো ছোটো মানুষ ছিলাম আমি। না হয় আব্বা কিছু একটা নিয়ে কিছু একটা বলেছে, বা কিছু একটা কিনে দেওয়ার কথা, বলেছে পড়ে কিনে দেবে, বা এরকমই কিছু একটা।

ঐ সময় আমি যদি মরে যেতাম, ক্লাস সেভেন বা এইটে ঘটা ঘটনাগুলো আমার সাথে আর ঘটতো না। তা ভালো হোক বা খারাপ, সব এখন আর মনে নেই, মনে থাকার কথাও না, নতুন ঘটনা। প্রত্যেকটা দিন নতুন হয়ে আমাদের কাছে আসে, প্রত্যেক দিন আমাদের সাথে ঘটে নতুন কোনো ঘটনা। যেদিন আমরা মরে যাবো, আমাদের সাথে ঘটতে পারে এমন সব সম্ভাব্য ঘটনাগুলোও থেমে যাবে। আমরা শুধু স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবো, আরেকজনের মনে।

সব চাওয়া যদি এক জীবনেই পূরণ হয়, তাহলে তো এই জগতটাই বেহেশতো হয়ে উঠবে। তাই সব মানুষেরই কিছু অপূর্ণতা থাকবে, অপ্রাপ্তি থাকবে। শুধু পাওয়াই জীবন নয়, পাওয়া ও না পাওয়া মিলিয়েই জীবন।

23 February 2021

বড় হয়ে আমি কি হতে চাই? পর্ব ৪


 

বড় হয়ে আমি লেখক হতে চাইতাম। কিন্তু লেখক কিভাবে হবো আমার জানা ছিলো না। আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলাম- লেখকরা কি লেখে? আব্বা বললেন- লেখকরা বই লেখে। তখন থেকে আমার মনে হতে থাকলো আমাকেও বই লিখতে হবে, লেখক হতে হবে। বড় হয় যেনো আমরা বিসিএস পরীক্ষা দেই সেজন্য আব্বা কিছু সাধারণ জ্ঞানের বই এনে দিয়েছিলেন। বাসায় সেগুলো আমাকে পড়ে শোনাতেন। আমি সেই বই শুনে শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে সাধারণ জ্ঞানের বই লিখতে হবে।

আমার বয়স তখন ৬-৭ হবে, ক্লাস ২ এ পড়ি। সবকিছু এতো স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু যা মনে আছে, তাও কম না। আমাদের স্কুলে ক্লাস ৩ পর্যন্ত মেয়েদের সাথে শিফট, মানে সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ১২ টা। একটা স্কুল ভ্যান আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতো, নিয়ে আসতো। দুপুরে এসে আমি গোসল করতাম, খাবার খেয়ে ঘুমাতে যেতাম, বিকালে উঠে নিচে খেলতে যেতাম। বড়দের খেলা যেমন- ফুটবল, ক্রিকেটে আমাদের দুধভাত খেলোয়ার হিসেবে নেয়া হতো, আমরা তাই নিজেরা বরফপানি, সাতচারা এগুলো খেলতাম।

যেদিন প্রথম বই লিখলাম সেদিন এই রুটিনের ব্যতিক্রম হয়েছিলো। আমি এসেই একটা খালি খাতা, কাঁচি, আঠা, সাধারণ জ্ঞানের বই আর বেশ কিছুদিন ধরে জমানো স্টিকার নিয়ে বসে গেলাম। আমার ছোট দুই ভাই আমাকে ঘিরে বসলো। খাতার উপরে বড় বড় করে লিখলাম- সাধারণ জ্ঞান, তারপর নিজের পুরো নাম। তারপর এর আশপাশে কিছু ছোটো ছোটো স্টিকার লাগালাম- প্লেন, বাঘ, ডাইনোসর ইত্যাদির, ব্যাস বইয়ের মলাট তৈরী।

এবার ভেতরের লেখা তৈরীর পালা। ছোটো ভাইদের দায়িত্ব দিলাম সাধারণ জ্ঞানের বইগুলো থেকে ছবিগুলো কেটে আলাদা করে দিতে।  আমি সেগুলো খাতার ভেতরে আঠা দিয়ে লাগাতে লাগলাম। বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টার- ডাইনোসর। ডাইনোসরের কিছু স্টিকার ছিলো- অর্ধেক পৃষ্ঠা সাইজের। সেগুলোর নিচে লিখলাম- ডাইনোসর। পরের চ্যাপ্টার- খেলাধুলা। সেখানে শচীন টেন্ডুলকারের ছবি লাগিয়ে নিচে নাম লিখে দিলাম। পশুপাখি বলে একটা চ্যাপ্টার করা হলো, সেখানে বাঘ, হরিণ, ইলিশ মাছ, দোয়েল পাখি ইত্যাদির ছবি বা স্টিকার লাগালাম।

সাধারণ জ্ঞানের বইগুলো থেকে ছবি কেটে আনলেও তখন রেফারেন্সিং বিষয়টা জানতাম না বিধায়, ফুটনোট দেয়া হয়নি। অন্তত তিনটা বই থেকে কাট-পেস্ট করা হলো। মৌলিক বলতে ছিলো শুধু জমানো স্টিকারগুলো।

এখন বুঝতে পারছি বইয়ের টাইটেল আসলে সাধারণ জ্ঞান না হয়ে হওয়া উচিত ছিলো- এনসাইক্লোপেডিয়া। সংগ্রহে থাকা সব স্টিকার আর ছবি সন্ধ্যার মধ্যে লাগানো হয়ে গেলো। এবার আব্বাকে বই দেখানোর পালা, আপনার ছেলে লেখক হয়ে গেছে।

বিকালে আমরা বাসায় থাকলে সাধারণত খুব চিল্লাপাল্লা করতাম, বারান্দায় পানি ঢেলে নদী-নদী খেলতাম, অথবা বালিশের উপরে চড়ে ঘোড়া-ঘোড়া খেলতাম। সেদিন কোনো চিল্লাপাল্লা নেই। আম্মা বিকালে এসে একবার দেখে গেলেন আমরা তিন ভাই মনোযোগ দিয়ে বই কাটছি আর খাতায় সেগুলোকে আঠা দিয়ে আটকাচ্ছি। আম্মা কিছু বললেন না।

সন্ধ্যায় আব্বা আসলে আমরা বই দেখালাম। আব্বা দেখে খুব খুশি হলেন-

সাধারণ জ্ঞানের বই লেখছো?

জ্বি আব্বা...

কয়টা বই নষ্ট করছো?

তিনটা আব্বা...

আচ্ছা... আবার নিয়া আসবো বই... এর পরের বই কি নিয়া লেখবা...

ডাকটিকেট নিয়া...

আব্বা বুঝতে পারলেন তার দীর্ঘদিনের জমানো ডাকটিকিটের ডায়েরী এখন বিপন্ন অবস্থায় আছে। এরপরের কিছুদিন আমরা আর ডাকটিকিটের ডায়েরীটা খুঁজে পেলাম না। অনেক বড় হওয়ার পর যখন হাইস্কুলে গেলাম তখন আব্বার বুকশেলফের ভেতরে সেটাকে পেলাম। কিন্তু তখন আর ডাকটিকিট নিয়ে বই লেখার আগ্রহ নেই।

সাধারণ জ্ঞান বইটি আমার লেখা একমাত্র এনসাইক্লোপেডিয়া, যেটার পাণ্ডুলিপি কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে।

17 February 2021

বড় হয়ে আমি কি হতে চাই? পর্ব ৩


বড় হয়ে আমি রাষ্ট্রপতি হতে চাইতাম। তখন মার্ক্স-এঙ্গেলসের ছাত্র, শোষনমুক্ত সমাজের স্বপ্নে বিভোর এক তরুন মাত্র। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়া তো মুখের কথা না, রাষ্ট্রপতি হতে গেলে একটা দেশ লাগে। আর দেশ হতে গেলে লাগে- জায়গাজমি, নাগরিক, সরকার, সার্বভৌমত্ব আর আইন-কানুন। তখন বিকেল বেলা বাসা থেকে বের হয়ে চায়ের দোকানে বসি আর বন্ধুরা মিলে মাঝরাত পর্যন্ত দেশ আর রাজনীতির চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করি।

কবে বড় হবো, কবে ক্ষমতা নিবো, তারমধ্যে এই রাজনৈতিক হাঙ্গামা, কে চায়? তারচেয়ে একটা দেশ বানিয়ে ফেলা সহজ। দেশের আইডিয়াটা আমি সবচেয়ে নিকটস্থ বন্ধুকে বলেই ফেললাম। একটা দেশ হতে গেলে কি কি লাগে বিস্তর আলাপ করলাম। বন্ধুও তাল দিলো- হ, হ। আমরা ৫ বন্ধু তখন নিয়মিত আড্ডায় বসি। এদের মধ্যে একজন সাস্টের, আরেকজন জগন্নাথের ছাত্র। ওরা সপ্তাহে দুয়েকদিন সময় দিতে পারতো। ওদের সাথেও আলাপ হলো। দেশ গঠনের কাজ শুরু হলো।

প্রথমেই জায়গাজমি। বন্ধু মৃন্ময়ের বাসাকে বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেয়া হলো। আর ওর বাসার ছাদের নামকরণ করা হলো- হাসানাবাদ, বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। আমরা ৫ বন্ধু আর ১ ছোটোভাই হলাম রাষ্ট্রের প্রথমদিককার নাগরিক। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আস্তে আস্তে এই রাষ্ট্রে আরো অনেককে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য ফরমের খসড়া রেডি করা হলো। দেশকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যে প্রথম ৬ জন মিলে গঠিত হলো অস্থায়ী সরকার।

৬ জনের রাষ্ট্র হলেও পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হলো। মৃন্ময়ের রিডিং রুমের বড় গোল টেবিলটাকে পার্লামেন্ট হিসেবে ঘোষনা করা হলো। রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং পলিসি পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া নেয়া যাবে না। পার্লামেন্টের অনুমতিক্রমে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করা হলো। রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তাকে সাহায্য করার জন্য থাকবে মন্ত্রীপরিষদ।

নির্বাহী দায়িত্ব বণ্টন করার জন্য পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকা হলো। রুদ্ধশ্বাস সেই অধিবেশনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট। ভোটাভুটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার উদ্দেশ্যে এবং বন্ধুদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ এড়ানোর জন্য ছোটভাইকে করা হলো বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাচন কমিশনার। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমি হলাম প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি, মৃন্ময় প্রধানমন্ত্রী, সিঞ্চন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মামুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মিথুন অর্থমন্ত্রী আর ছোটোভাই নাইম পার্লামেন্টের স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং একই সাথে শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।

দায়িত্ব বন্টনের পরে আসে জাতীয় পরিচয়ের প্রসঙ্গ। আলাদা রাষ্ট্র হতে গেলে সবকিছু আলাদা হওয়া লাগে। আমরা রাষ্ট্রের জন্য একটি পতাকা পার্লামেন্টে পাশ করলাম। ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা গানটিকে করলাম জাতীয় সঙ্গীত। জাতীয় পাখি- মাছরাঙা, জাতীয় ফল- আম, জাতীয় ফুল- বকুল ইত্যাদি।

রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েও আমি স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারিনি। রাষ্ট্রপতির ইচ্ছাই রাষ্ট্রের আইন, এটা বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রে ছিলো না। যেমন জাতীয় ফুলে আমার ক্যান্ডিডেট ছিলো- শিউলি। কিন্তু পার্লামেন্টে বাকিদের ভোটে আমার ক্যান্ডিডেট হেরে যায়। পার্লামেন্ট জাতীয় ফুল হিসেবে বকুলকে পাশ করে, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে পার্লামেন্টের পবিত্র সিদ্ধান্ত আমাকে মেনে নিতে হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ট্যাক্স দিতে হয়। ট্যাক্স বিষয়ক পলিসি রেডি করার জন্য অর্থমন্ত্রী দিনরাত এক করে ফেলে। ট্যাক্স হয় সাধারণত ইনকামের উপর। কিন্তু আমরা সবাইতো ছাত্র। কেউ টিউশনি করে, কেউ বাসা থেকে হাতখরচের টাকা নিয়ে চলে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো- ট্যাক্স নির্ধারিত হবে আমাদের মাসিক খরচের উপর।

পার্লামেন্টে ব্যাপক আলাপ আর ভোটাভুটির পর বিল পাশ হলো- মাসিক মোট খরচের ৪% টাকা আমরা বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবো। মানে প্রতি ১০০০ টাকা খরচের সময় ৪০ টাকা রাষ্ট্রের জন্য আলাদা করে রাখতে হবে। যখন কামাই করবো, তখন ইনকাম ট্যাক্স বলবৎ হবে বলে ধারা থাকলো। এখানেও আমার প্রস্তাব পার্লামেন্টে পাশ হয় নি। আমার প্রস্তাব ছিলো ২.৫%। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হলো নিজেরা মুদ্রা না ছাপানো পর্যন্ত বাংলাদেশের টাকাই প্রজাতন্ত্রের ডিফ্যাক্টো মুদ্রা হিসেবে থাকবে।

পার্লামেন্টে খসড়া সংবিধান আর আইনকানুন পাশ হতে থাকলো। প্রত্যেক শুক্রবার পার্লামেন্টের নিয়মিত অধিবেশন বসতো। ৬ মাস নিয়মিত ট্যাক্স কালেক্ট করা হলো। নতুন বেশ কয়েকজনকে নাগরিক করার বিষয়ে আলাপ-আলোচনাও চললো। পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিলো ট্যাক্সের টাকায় নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল কাউকে নাগরিকত্ব দিয়ে তাকে একটা রিক্সা কিনে দেয়া হবে অথবা চায়ের দোকান করে দেয়া হবে।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব পলিসি রেডি করা হচ্ছিলো। শিক্ষা হবে কমিউনিটি বেইজড, একমুখী, বিজ্ঞানমুখী এবং কর্মমুখী। মানে কমিউনিটির সব বাচ্চাকে তাদের পিতামাতার অর্থনৈতিক কন্ডিশনের উপর ভাগ না করে, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে একই স্কুলে পড়ানো। আর কমিউনিটি স্কুলের সব বাচ্চাদের দায়িত্ব আর খরচ নির্বাহ করবে কমিউনিটির সবাই। কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে নেয়া হলো। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে বাচ্চাদের এমন কোনো হাতের কাজ শেখানো হবে, যাতে তারা সাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো- নিজেদের বাচ্চাদের দিয়ে সেই স্কুল শুরু করা হবে।

নাগরিকদের জন্য কিছু আলাদা নিয়ম ছিলো। যেমন-

১। ধর্ম, লিঙ্গ, গায়ের রঙ, আঞ্চলিকতা, রাষ্ট্রীয় পদ, অর্থনৈতিক অবস্থার উপরে নাগরিকদের সাথে বৈষম্য করা যাবে না।
২। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, সবাইকে তা মেনে নিতে হবে, যদিও তা নিজের মত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিপক্ষে যায়।
৩। জায়গা মতো ময়লা ফেলা, যত্রতত্র থুথু না ফেলা, আরেকজনকে কথা বলতে দেয়া, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ইত্যাদি আরো অনেক আচরণকে নাগরিক শিষ্টাচার হিসেবে পালন করা।

৪। জাতীয় পতাকাকে সম্মান করা, জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে দাঁড়ানো এবং অন্যান্য কাজ করা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদিও নাগরিক শিষ্টাচারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

কিন্তু উত্থানের পরেই আসে পতন। যখন রাষ্ট্র খুব ভালো চলছে, তখনি হঠাৎ আমাদের আগ্রহে ভাটা পরে যায়। কবে সবাইকে বোঝানো শেষ হবে, কবে সবাই শিক্ষিত হবে, কবে সবাই নাগরিক হবে! সর্বপ্রথম অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব আর সামলাতে পারছিনা বলে পদত্যাগ করলো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠনের অনুষ্ঠানের জন্য পার্লামেন্ট অধিবেশন মিস করলো। পরবর্তী অধিবেশনে ভোটাভুটি করে রাষ্ট্রকে ডিজব্যান্ড করা হলো। এখন থেকে বঙ্গভূমি প্রজাতন্ত্র নামে পৃথিবীর বুকে আর কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। 

৬ তরুনের শোষনমুক্ত, বৈষম্যহীন, স্বনির্ভর রাষ্ট্রপ্রকল্পের স্বপ্ন এখানেই শেষ হলো।

24 August 2020

আমার বন্ধু মেরাজ

আমার বন্ধু মেরাজ, যারা তাকে চিনেন, তারা ত চিনেনই। আর যারা চিনেন না, তাদের জন্য আজকের দুটি কথা।

মেরাজ আমার স্কুলের বন্ধু, এলাকার বন্ধু, বাল্যবন্ধু (আমাদের এলাকায় এটাকে বলা হতো, ন্যাংটাকালের বন্ধু, যদিও আমরা ততোটা ন্যাংটাকালের বন্ধু না।) যার সাথে আমার প্রচুর স্মৃতি। যারা আমাকে চিনেন তারা জানেন ছোটবেলা থেকে আমি অত্যন্ত শান্ত, আজ আমি যা কিছু চঞ্চল তা এই মেরাজের জন্য। এমনকি আমার ফেসবুক একাউন্টের জন্য তোলা প্রথম প্রোফাইল পিকচারটাও মেরাজের বাসার ছাদে ওর ফোনের ক্যামেরায় তোলা। যাই হোক, ঘটনায় যাই...

তখন আমরা ক্লাস টেনে, অনেক বড় হয়ে গেছি। কিন্তু বড় হয়ে গেছি এটা বোঝানোর উপায় কি? আমরা বড় হয়েছি এটা বোঝানোর জন্য আমাদের কিছু করতে হবে। তখন রোজার মাস, হালকা শীত, রাতে মসজিদে তারাবীর নামাজ চলে। এরকম সময়ে মেরাজ বাসার নিচে এসে ডাক দিলো। আমি নিচে নেমে দেখি মেরাজ লুঙ্গি পড়ে এসেছে। মেরাজ সাধারণত লুঙ্গি পরে রাস্তার এইপাড় আসে না। রাস্তার এইপাড় মানে তখনো গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার হয়নি। এখন ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ি অংশ যে জায়গায় নেমেছে তার নাম কাজলা। কাজলার হাইওয়ের এপাশে আমার বাসা, ওপাশে মেরাজের বাসা। এই হাইওয়ের দুইপাশেই আমাদের কৈশোর সময়ের একটা বড় অংশ কেটেছে।

মেরাজ লুঙ্গি পরে আসায় আমি একটু অবাক হলাম। 'কি রে লুঙ্গি পইরা আয়া পরলি!' মেরাজ বললো- 'হ... বাইত্তে তারাবি পরমু কইয়া বাইরাইছি...' তারপর আমরা শনির আখড়ার রাস্তার দিকে হাটতে থাকলাম। শনির আখড়া থেকে ভেতরে আরেকটা রাস্তা গেছে গোবিন্দপুরের দিকে। সেই রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ, বর্ষায় হাটু পর্যন্ত কাদা, শীতে-গরমে হাটু পর্যন্ত ধুলা। স্থানীয় এম্পির বিশেষ সুনজর পড়ায় ঐ এলাকার তখন এই অবস্থা, এলাকার লোকজনও তেমন গা করে না, তারা এভাবেই অভ্যস্ত। আমরা এমনভাবে হাটছি যেনো এই এলাকায় আমরা নতুন এসেছি। বেশ কয়েকজন ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখছেও। আমরাও ডানে-বামে সন্দেহজনকভাবে তাকাতে তাকাতে গোবিন্দপুরের রাস্তায় হাটছি।

কিছুক্ষন হাটার পর রাস্তা কিছুটা নির্জন হয়ে এলো। লোকজনের আনাগোনা কিছুটা কম, রাস্তায় আলোও কম। মেরাজ একটা দোকানের সামনে দাড়ালো। আমি একটু দূরে দাড়িয়ে ডানে বামে খেয়াল করছি। মেরাজ সেই দোকান থেকে দুইটা ক্যাসেল সিগারেট, একটা ম্যাচ কিনলো। আমরা অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেলাম।

তখন ক্যাসেল সিগারেট পাওয়া যেতো, ২ টাকা দাম। গোল্ডলিফ ও ২ টাকা ছিলো, বেন্সন ছিলো ৩ টাকা। প্রথম কয়েকটা ম্যাচের কাঠি নষ্ট হলো। কিভাবে সিগারেটে আগুন ধরাতে হয় দেখেছি, কিন্তু শিখিনি। সিগারেট ধরানোর সাথে সাথে কাশি হলো, মাথা কেমন কেমন ঘুরলো। বেশ কয়েকটান দেয়ার পরই সিগারেট ফেলে দিয়ে অন্ধকার গলি থেকে বের হয়ে হলাম। বের হলাম আরো তাড়াহুড়ো করে দ্রুত পায়ে। কে যেনো গলির ভেতর আসছিলো। সে যদি জিজ্ঞাসা করে, কিরে পোলাপান কি করস!

গলি থেকে বের হয়ে খেয়াল পরলো সিগারেট খাওয়ার পর কেমন যেনো গন্ধ আসছে। আমরা দুইটা চুইংগাম কিনলাম। সেটা কিছুক্ষন চাবিয়ে দেখলাম গন্ধ যায় কিনা। তারপর হাতে-মুখে পানি দিলাম, চা-পানি এসব খেলাম। তবু মনে হচ্ছিলো গন্ধ যাচ্ছে না। বাসায় ধরা পরলে ত কড়া পিটনি! পরে হাটতে হাটতে আমি আর মেরাজ অনেকক্ষণ পরামর্শ করলাম, বাসায় গিয়েই আগে বাথরুমে চলে যাবো। সাবান দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে, জামা-কাপড় বদলে পড়তে বসে যাবো। রাতে শোয়ার আগ পর্যন্ত হু-হা দিয়ে কাজ চালাবো, পারতপক্ষে মুখ খুলবো না। আর যদি নিদেনপক্ষে ধরা খাই-ই; বলবো চা খেতে দোকানে বসেছিলাম, সেখানে কিছু খারাপ লোক সিগারেট খেয়ে ধোয়া ছেড়েছে, সেগুলো বাতাসে ভেসে ভেসে আমাদের জামা-কাপড়ে লেগেছে, তাই এই গন্ধ; জীবনে আর চায়ের দোকানে বসবো না। দেখা যাক কি হয়!

আমি তো ধরা খাইনি। মেরাজ ধরা খেয়েছিলো কিনা সেটা জানার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পরেরদিন বিকাল পর্যন্ত। বিকালে আমরা আড্ডা দিতে বের হতাম। জিজ্ঞাসা করলাম- 'কিরে আন্টি টের পাইছে?' 'নাহ...' আমরা হাসলাম। হাসলাম কারন আমরা এখন বড় হয়ে গেছি। আমরা আর নাইনের বাচ্চাদের মতো ছোটো নেই।

 

18 April 2020

কথকের দিনলিপি


হানি সিস্টার্স

হানিরা তিন বোন। তাদের মধ্যে খুব মিল। তারা তিন বোন একসাথে থাকে। কোথাও বেড়াতে গেলে একসাথে বেড়াতে যায়। বেড়াতে যাওয়ার সময় তারা মুখ বেজার করে যায়। চলে আসার সময় হাসিমুখে ফেরত আসে। তারা তিন বোন সারপ্রাইজ পছন্দ করে। কোথাও বেড়াতে গেলে তারা না জানিয়েই চলে যায়। সারপ্রাইজ!

এদের মধ্যে প্রথমে ঘরে ঢোকে, বড়বোন স্বাস্থ্যহানি। সে মাথায় হাত বোলায়। ওমা, এক বছর ধরে জ্বর আসে না! জ্বর আসে। শুধু জ্বর! জ্বরতো ছোটো অসুখ! লিভারটা ফুলে যাক, কিডনীতে পাথর জমে যাক। হার্টে ব্যাথা নাই? এটা কেমন কথা?! হার্টে একটু ব্যথা হোক। ডায়াবেটিসটাও বেড়ে যাক। তবেই না বড়বোনের আপ্যায়ন।

বড়বোনের আবদার মেটাতে, যখন আপনার স্বাস্থ্য ব্যস্ত, তখন বেড়াতে আসে মেঝোবোন অর্থহানি। এসে প্রথমে মাথায় হাত বুলায়। ক্যাশ কতো আছে? ব্যাংকে জমানো কতো আছে? এফডি থাকলে ভেঙে ফেলো। তারপর আস্তে আস্তে মেজোবোন গলায় পারা দেয়। আত্মীয়দের কাছে চা, প্রতিবেশিদের কাছে চা, বন্ধুদের কাছে চা।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন বেড়াতে আসে ছোটোবোন সম্মানহানি। বড়বোন আর মেজোবোনের চাপে শেষ সম্বল আত্মসম্মানটুকু বাক্সবন্দী করে ফেলতে হয়। একসময় তিন বোন খুশি হয়ে ফেরত যায়। তখন দাওয়াতাক্রান্ত ব্যক্তির আর কিছু বাকী থাকে না। বাকী থাকে কেবল ক্রোধ আর হতাশা। আর থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা।

তিন বোন এ ঘর থেকে ও ঘর, ও ঘর থেকে এ ঘর, ঘুরে বেড়াতে থাকে। জীবন ব্যস্ত থাকে; তার হিসাব মেলাতে।
২৮.০৯.২০১৬ 

বুল্লেহ শাহের কালামঃ না কার বান্দেয়া মেরি মেরি

বান্দা আমার আমার করিস না
বান্দা আমার আমার করিস না
দমের মালিক কেউ না, মালিক কেউ না
দয়াবান আল্লাহ যায় আর আসে
সাধকের কলবের ভেতর...
...
...
[মূল পাঞ্জাবী:
না কার বান্দেয়া মেরি মেরি
না কার বান্দেয়া মেরি মেরি
দামদা ভাছা কোই না, ভাছা কোই না
আল্লাহু দায়াভা যা আভে
কুল্লি নি ফাকির দি ভিচ্চু...
- সূফী বুল্লেহ শাহ (১৬৮০-১৭৫৭)]
০৩.১০.২০১৬ 

রামপাল ও উন্নয়নঃ ঘুরায়া প্যাচায়া মিছা কথা

ঘুরায়া প্যাচায়া মিছা কথা কইলেই কি সেটা সত্য হইয়া যায়? যায় না। সত্য সবসময়ই সত্য। আপনি স্বীকার না করলেও সত্য। ইদানীংকালে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার চলতেছে, রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে। বলা হচ্ছে, সেখানে উৎপাদিত ছাই উড়ে বেড়াবে না। তার আগেই তাদের ধরে ফেলা হবে। পানিতে ভিজিয়ে তাদের বশে আনা হবে। তারপর প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করা হবে। এর চেয়ে আরো হাস্যকর মিথ্যা কথাও আছে। বাতাস নাকি সুন্দরবনের দিকে যাবে না। বাতাস সবসময় সুন্দরবনের বিপরীতে প্রবাহিত হবে। জনাব মসনদে আ'লা, আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, বাতাস ও কি সরকারী লোক?! নাকি আপনি বাতাস বশের যাদু জানেন?

এইরকম অনেক হাস্যকর কথা বলে বিষয়টা শেষ করা যেতো। তা না। তার সাথে যুক্ত হয়েছে দোষারোপ। আন্দোলনকারীরা টাকা কোথায় পায়? তাদের পেছনে কে আছে? তারা কার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? দেশধ্বংসকারী প্রকল্প নিয়ে আন্দোলন করার জন্য পেছনে ব্যাকাপ লাগে না জনাব। জনতা যখন আন্দোলন করে, নিজের খাইয়া, নিজের পইরাই আন্দোলন করে। তাদের জন্য বিদেশ থেকে টাকা আসা লাগে না। জনতার বুঝতে একটু সময় লাগে। টেকনিকাল টার্ম বোঝা জনতার জন্য কষ্ট। কিন্তু একবার বুইঝা গেলে, জনতার অংশগ্রহণ বাড়তেই থাকে। যেমনটা আপনারা নিজে থাইকা দেখছেন, ফুলবাড়িতে। লোকজন গুলি খাইয়া মরতে রাজি, দেশবিরোধী উন্নয়নে রাজি না। রামপালের ক্ষেত্রেও লোকজন হারিকেন জ্বালাইয়া রাত কাটাইতে রাজি জনাব। আর জনতারে হুমকি দিয়া লাভ নাই। জনতার অংশগ্রহণ যদি মবে পরিনত হয়, তখন কথা উইড্র করারও সময় পাবেন না।

আর সামনে কিছু ননসেন্স সাংবাদিক বসাইয়া রাইখা যদি মনে করেন সবাই এদের মতো বশীভূত হইয়া গেছে, সবাই ক্ষমতার মধু খাইয়া ফেলছে, তাইলে মারাত্মক ভুল করবেন। ঐসব ননসেন্স সাংবাদিক আর তাদের স্টেটমেন্ট নিয়া হাসাহাসি করা যাইতে পারে, কিন্তু তাদের কেউ বিশ্বাস করে নাই।

বলা হইতেছে পিডিবি কোম্পানি হইয়া গেছে। কিন্তু এই কোম্পানিতে টাকা কাদের? টাকা তো জনগণের। জনগণের টাকারে নিজের টাকা মনে করার মতো ভুল করা ঠিক হবে না। জনতা সবসময় হিসাব নেয়ার মুডে থাকে না। তবে যদি হিসাব চাওয়া শুরু করে, হিসাব দিতে দিতে গদি নইরা যায়। জনতার কষ্টের টাকার সঠিক হিসাব করেন, সঠিক খাতে ব্যয় করেন। সব খরচরে উন্নয়ন বইলেন না। [জনতার কষ্টের টাকার হিসাব করা নিয়ে আরো কথা আছে। পরে বলবো।]
৩১.০৮.২০১৬ 
  
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হল

বিষয়টা হচ্ছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোনোদিন হল হয়, আর যদি বাংলাদেশের মসনদে আওয়ামী সরকার বাহাদুর থাকে, সবার আগে হলে উঠবে ছাত্রলীগ। হলের যাবতীয় আরাম-আয়েশ ভোগ করবে ছাত্রলীগ। হলের ক্যান্টিনে ফাঁফর দিয়ে বাকি খাবে কতিপয় ছাত্রলীগ। এমনকি হলের সিট ও বন্টন করবে ছাত্রলীগ। তখন হলের জন্য আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা হলে উঠতে পারবে না। তারা থাকবে হলের বাইরে, বা ছাত্রলীগের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে কেউ কেউ হলে উঠতে পারবে।
এতক্ষণ ছাত্রলীগ-ছাত্রলীগ করলেও এই একই কথা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তারাও সরকারের আনঅফিসিয়াল লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে। তাই বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেই দেশ এর চে ভালো চলবে বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা হল পাবে, এই চিন্তা অসার।
এবং ছাত্রলীগের উচিত এই আন্দোলনের বিরোধীতা না করে বরঞ্চ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হল পেলে, সবচেয়ে বেশি লাভ ছাত্রলীগেরই। ছাত্রলীগের লাভের কথা তাদের বিবেচনা করা উচিত।
সরকারেরও উচিত অতিশীঘ্র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হল বরাদ্দ দেয়া। ঘনবসতি কোনো যুক্তি না। ক্যান্টনমেন্টের জন্য বরাদ্দ দেয়া যায়, বাহিনীগুলার সদরদপ্তরের জন্য বরাদ্দ দেয়া যায়, সরকারী অফিসের জন্য বরাদ্দ দেয়া যায়; শুধু হলের বেলায় ঘনবসতি!
৩০.০৮.২০১৬

লাশের দাম


লাশের একটা দাম থাকে। যে লাশ নিয়ে রাজনীতি করা যায়, সে লাশের দাম থাকে। যেমন- আসাদ, বঙ্গবন্ধু, নুর হোসেন। যে লাশ নিয়ে রাজনীতি করা যায় না, সে লাশের দাম থাকে না। যেমন- তনু, রাজন, রানা প্লাজার মৃতরা প্রমুখ।
২৮.০৭.২০১৬ 

সুন্দরবনে রামপাল

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ না করা গেলে বা না সরানো গেলে, আমরা সুন্দরবনটারে ধইরা এক দিকে সরাই নেই। বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার।
সরকার বাহাদুর এবং জনতা উভয়ের নিকট আবেদন, হয় রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করেন আর নয়তো সুন্দরবন অন্য জায়গায় সরায়া নেন।
২৩.০৭.২০১৬

আমি কারো কাছে বিচার চাইবো না

দেশে অব্যাহত চলমান খুন, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন, শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, ভিন্নমত দমন-পীড়ন, সরকারী চুরি ও দুর্নীতি বিষয়ে আমি কারো কাছে বিচার চাইবো না।

দেশে এখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। আর যেটুকু বিচার আছে, সেটা প্রকারান্তরে মোড়কীকৃত অবিচার। তাই, আমি কারো কাছে বিচার চাইবো না।

অবিচার ও বিচারহীনতার এই সময়ে, আমি শুধু নিজে নিজে কথা বলবো-
'বিচারপতি তোমার বিচার করবে কারা?
এই জনতা। এই জনতা।'
২৭.০৭.২০১৬ 

রহস্যগল্প: আম গাছ

গল্পটা আমার নিজের। সামান্য একটু ধানি-জমি সহ আমার একটা বাড়ি আছে, ঢাকার অদূরে মদনপুরে। আমার পাশেই আমার বন্ধু জামালের বাড়ি। অর বাড়িটা আমার বাড়ির চেয়ে বড়। অর জমিও আমার জমির চেয়ে বেশি। আমাদের দুইজনের জমিসহ বাড়ির মাঝখানে একটা পুরানা ইটের প্রাচীর। প্রাচীর পুরানা হইলেও সীমানা বোঝা যায়।

আমার পরিবারের লোকেদের আম পছন্দ। প্রতিবছর সিজনে আম কিনা আনা লাগে। দুই এক বার আনা যায়। এর বেশি হইলেই সংসারের টাকায় টান পরে। এইটা নিয়াই ঐদিন কথা বলতাছিলাম জামালের সাথে।

- আম আম কইরাতো মাথা খারাপ কইরা ফালাইলো পোলাপান। এতো আম কি কিনা যায়?!
- আমারোতো একি কন্ডিশন। এতো আম কিনার চে একটা আম গাছ লাগায় লাওন ভালা।
- তুই একটা আম গাছ লাগায়া ফালা।
- তুই কি মনে করসস, চাই নাই। তর ভাবী কইছে, বাড়ির ত্রিসীমানায় জানি কোনো আম গাছ না থাহে। আম গাছ লাগাইলে আমারে সুদ্ধা কুইট্টা ফালাইবো। কয় যে- যে ফল-ফ্রুট আছে তাই খাইয়া কুলান যায় না।
- অ...
- তুই একটা কাম কর। তর সীমানার ভিত্তে একটা আম গাছ লাগা। আমিও টেকা দিবোনে যা লাগে। তর পরিবার সারা বছর আম খাইতে পারবো। তর আর আম কিনন লাগবো না। আম কিনার লাইগ্যা ঋনও করন লাগবো না।

বুদ্ধিটা আমার মনে ধরলো। তাইতো! আমি আমার বাড়ির ভিতরেই যদি একটা আম গাছ লাগাই, কতো লাভ। পোলাপান আর আম আম বইলা চিৎকার করবে না। সারাবছর আম। কত্তো আম!

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আম গাছ লাগাবো। তারপর, আমি হিসাব নিয়া বসলাম। কতো খরচ হয় একটা আম গাছ লাগাইতে? হিসাবে বলে ১০,০০০ টাকা। কিন্তু ১০,০০০ টাকাতো আমার কাছে নাই। আমার কাছে আছে খরচের মাত্র ১৫% মানে ১,৫০০ টাকা। জামাল কইলো, ও আমারে আরো ১,৫০০ টাকা দিবো। বাস হইয়া গেলো সমান সমান। কিন্তু তাওতো আরো ৭,০০০ টাকা লাগে। সে রাস্তাও জামাল দেখায়া দিলো। বাড়ির পাশের বাজারেই সহজ শর্তে ঋন দেয় এমন ব্যাংক আছে। ওরা আমারে দিবো বাকী ৭০% টাকা মানে ৭,০০০ টাকা। তবে আমারে সেইটার কিস্তি টানা লাগবে মাসে মাসে। সে আর এমন কি?! নিজের ঘরের আম খামু, কিস্তি দিতে সমস্যা কি। ৭,০০০ টাকা সুদ সহ গিয়া পরবো ১০,০০০ টাকা।

হিসাব করা শেষ হইলে জামালরে সিদ্ধান্ত জানাইলাম। ও বললো,
- আম কিন্তু আধা-আধা হইবো। কারন আমি আর তুই আধা আধা টেকা দিছি। দেড় হাজার, দেড় হাজার।
- হ। তাই তো। আইচ্ছা নিস, আধা আধা।
- আর যেহেতু এইটা আমার বুদ্ধি, তাই তুই এই গাছের মালিক হইতে পারবি না।
- মালিক হইতে পারুম না কেন? গাছ ত আমার জমিতে।
- জমি তরই থাকবো। গাছ আমার। এই গাছের লাকড়ি আমি দিনে দিনে আইসা নিয়া যামু। আর গাছ যখন বেচুম, তখন কাঠের দাম ও আমিই নিমু। রাজি থাকলে, ল বীজ আইনা দেই তরে।

আমি ভাবতেছিলাম। জামাল কয়- ভাবার টাইম নাই। এখনি ক। নাইলে বাজার থিককা আম কিন্না আইন্যা খা। আমি আমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকলাম। কইলাম- ল, বীজ নিয়া আসিগা। জামাল কইতে থাকলো, আর যেহেতু গাছটা তর জমিতে, ঐটারে কিন্তু তরই দেইখা রাখা লাগবো। পাশের বাড়ি থেইকা রোজ রোজ গাছে পানি দিতে আসন আর ছাগল খেদানি আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি কইলাম- তা দেইখা রাখবোনি। ও যাইতে যাইতে আবার কইলো- আম কিন্তু আধা আধা। আমি কইলাম- হ, হ। আম আধা আধা।
জামাল কইলো- ও, আর তর ছোটো পোলাডারে সামলাইছ। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, মাথায় নাকি একটু ডিস্টাপ ও আছে। আমি কই না, লোকে কয়।

- ও আমি সামলামুনে। অয় জানবোইনা।
- হ। সামলাইস। তার মধ্যে টেকাপয়সার হিসাব দেখলেতো অর মাথা আরো আউলাইয়া যাইবো।
- না। অয় জানবোইনা। টেকাপয়সার হিসাব বাদ দে, গাছ বড় হওয়ার আগে অয় জানবোইনা, এইটা আম গাছ। অর কাম আম খাওয়া। আম পাইলো, মিট্টা গেলো।
- সেই টাই।

(দুই দিন পর...)
আমি আম গাছের বীজ নিয়া আসছি। ব্যাংকে কথা কইছি। জামালও রাজি। এখন যেকোনো সময় খালি বীজটা লাগামু। কিন্তু আমার ছোটো পোলা টের পাইয়া গেছে। অয় আমারে কয় গাছ লাগাইতে দিবো না। কয় হিসাবে ভেজাল আছে। আরে তুই হিসাবের কি বুঝস?! বাড়িতে কি ময়-মুরুব্বি নাই?! হিসাব করবো ময়-মুরুব্বিরা। তুই খাবি আম। তুই আম পাইলি, মিট্টা গেলো। জামাল একটা মুরুব্বি। অয় কি তর চে হিসাব কম বুঝে?! আমার মাথা খারাপ পোলা কয়- খালি জামাল দিয়া হবে না। আপনে দশ জনরে জিগান।

আমি তাই দশ জনরে জিগাইতে চাই, আমি কি আম গাছটা লাগাবো?
[রহস্য উদ্ধার না করতে পারলে আবার পড়ুন।
*সহায়িকা:
আমগাছ- সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প,
আমি- বাংলাদেশ,
বন্ধু জামাল- ভারত,
ছোটো পোলা- মুষ্ঠিমেয় উন্নয়নবিরোধী(!) জনগণ।]
১৭.০৭.২০১৬ 

আমাদের দেশে

আমাদের দেশে সব কিছু হওয়া সহজ। এখানে দর্শন বিভাগে পড়লেই, আমরা ভাবি সে দার্শনিক হয়ে গেলো। এখানে কেউ দুই পাতা পড়লেই আমরা ভেবে নেই, পড়তে পড়তে ছেলেটা পাগল হয়ে গেলো। ফেসবুকে কেউ দুইটা উত্তম স্ট্যাটাস দিলেই ভাবি, সে বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলো। কেউ দুই পাতা লিখলেই আমরা ভাবি, সে রবীন্দ্রনাথ হয়ে গেলো। কেউ দুইটা ভালো পরামর্শ দিলেই আমরা ভাবি সে বুদ্ধিজীবী হয়ে গেলো।

যে দেশে এতো সহজে এতো কিছু হওয়া যায়, সেখানে কিছু হওয়াটা আসলে কঠিন।
১৫.০৭.২০১৬ 

বাংলাদেশ কেনো সিকিম হবে না?

বৃটিশরা যখন ভারত ছেড়ে যায়, তখন দুইটা রাষ্ট্র- ভারত আর পাকিস্তান এবং ৫৬৫ টা দেশিয় স্বাধীন রাজ্য (প্রিন্সলি স্টেট) রেখে যায়। দেশিয় রাজ্যগুলোর জন্য বৃটিশদের শর্ত ছিলো, হয় তারা ভারত যোগ দেবে, নয় তারা পাকিস্তান যোগ দেবে, অথবা তারা স্বাধীন থাকবে। বৃটিশ আমলে দেশিয় রাজ্য গুলোর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিলো বৃটিশদের। ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর দেশিয় রাজ্য গুলো হয় ভারত নয় পাকিস্তানে যোগ দেয়। [দেশিয় রাজ্যগুলোর ভারত-পাকিস্তানে যোগদানের গল্প তোলা থাকলো] বাকি থাকে কেবল নেপাল, ভুটান আর সিকিম। এই তিন রাজ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় ভারত। তিনটা রাজ্যেই রাজা ছিলো, সংসদ ছিলো, প্রধানমন্ত্রী ছিলো। তিন রাজ্যের সাথেই ভারতের যোগাযোগ ভালো ছিলো।

১৯৬৭ সালে চীন সিকিমকে তার অংশ দাবী করে, সীমান্তে সৈন্য পাঠায়। ভারতের সহযোগীতায় সিকিমের স্বাধীনতা টিকে গেলেও, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ দেখা দেয়। রাজতন্ত্রবিরোধী পার্টি 'সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস' শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভারত, সিকিমের রাজনীতিবিদদের বোঝাতে সক্ষম হয়, সিকিমের স্বাধীনতা টিকাতে হলে, ভারতে যোগ দিতে হবে, নতুবা চীন সিকিম দখল করে নেবে। ১৯৭২ সালে সিকিমের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেলে, রাজতন্ত্রের পক্ষে-বিপক্ষে দাঙ্গা হয়। সে দাঙ্গায় ভারতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ ছিলো। সবশেষ, ১৯৭৫ সালের ১৪ এপ্রিল, ক্ষমতাসীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস, সিকিমের সংসদে ভারতে যোগদান বিষয়ক একটি প্রস্তাব আনে। এবং সে প্রস্তাব পাশ ও হয়। তার ১২ দিন পর, ২৬ এপ্রিল ভারতের সেনাবাহিনী সিকিমে প্রবেশ করে, এবং সিকিমকে তার ২২ তম প্রদেশ ঘোষনা করে।

অপরদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়, বৃটিশরা ছেড়ে যাবার পর, বাংলাদেশ পাকিস্তানের পূর্ব অংশ হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলিম হওয়ায় এবং ১৯৪৭ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করায়, এই অঞ্চল অনেক আগে থেকেই ভারত-বিদ্বেষী। এখন স্বাধীন বাংলাদেশের লোকেরা সমান ভাবে, পাকিস্তান এবং ভারত বিদ্বেষী। রাজনীতিবিদগন খুব সাবধানে একে অপরকে ভারতবাদী বা পাকিস্তানবাদী বলে দোষারোপ করেন। কারন সমর্থন জানানো বা গুজব এর অতিরিক্ত যোগাযোগ যদি জনগণ টের পায়, তাহলে ঐ রাজনৈতিক দলের ক্যারিয়ার বিপন্ন হয়ে যাবে।

বাংলাদেশে সিকিমের রাজনৈতিক দলের মতো দল নাই, সিকিমের জনগণের মতো জনগণও নাই। এমনকি যদি ৩০০ সাংসদের সম্মতিতেও সংসদে বিল পাশ করা হয়, যে বাংলাদেশ ভারতে যোগদান করবে, তাহলেও ঐ রাজনৈতিক দল, ঐ সাংসদ এবং ভারতের খবর আছে, এটা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও জানে, ভারত ও জানে।

আর কি দরকার, প্রদেশ বানানোর?! বিশ্বায়নের যুগে বাজারটাই মূল কথা। বাংলাদেশ এমনিতেই ভারতের বাজার হয়ে বসে আছে। ভারত চাইবেনা, তার বাজার অস্থিতিশীল হোক, তার মার্কেট খারাপ হোক।
১১.০৭.২০১৬ 

আই হেইট পলিটিক্স

দেশ পরিবর্তনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের, 'আই হেইট পলিটিক্স' এই অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। 'আই হেইট পলিটিক্স, আই হেইট পলিটিক্স' কইরা তো পানি অনেক দূর গড়াইলো। আমাদের প্রজন্মের কাছে আহবান, আপনারা 'আই হেইট পলিটিক্স' এই বিষয়টারে হেইট করেন।
যারা মনে করেন, রাজনীতি নোংরা বিষয়, তাদের জন্যই রাজনীতি আরো নোংরা হইতেছে। কারন আপনি নিজেই এর ভুক্তভোগী, অথচ এইটার কোনো খবর আপনার কাছে নাই। এইটা একধরনের দ্বিচারিতা। যখন আপনি রাজনীতিতে মঙ্গল চাইবেন, আপনাকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে। আপনি কোনো দায়িত্ব নিবেন না, আবার সকাল বিকাল চিক্কুর পাইরা দোষারোপ করবেন, তা হবে না।
সুতরাং, রাজনীতির নোংরা নিজেদেরই পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিতে হবে। আপনি যখন রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন না, তখন প্রবল সম্ভাবনা থাকে, আপনি আপনার নিচু বুদ্ধির কারো দ্বারা শাসিত হবেন।
০৫.০৭,২০১৬

তোমাদের হাতে দেশ

'...হাজার হাজার মাইলের যে যাত্রা, সেটাও ছোটো একটা পদক্ষেপ থেকে শুরু হয়...'

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এতোদিন মায়ানমার আর ভারত থেকে নেশাদ্রব্য ইয়াবা আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। কিন্তু না, বাংলাদেশ তো এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাওয়ার সেই ছোট্ট পদক্ষেপ হিসেবে এখন দেশেই তৈরী করা হয়েছে তিনটি ইয়াবা কারখানা। দেশীয় ভোক্তাদের কথা বিবেচনায় রেখে, কম খরচে আসল পন্যটি ভোক্তাদের হাতে তুলে দিতে, এখন দেশেই পাওয়া যাবে, 'মেইড ইন বাংলাদেশ ইয়াবা'। 'মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী পুত্র রনি চৌধুরী' কে এই অসাধারন উদ্যোগ এর জন্য এখনো কোনো পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করা হয়নি।

অবিলম্বে 'রনি চৌধুরী' কে উঠতি তরুন উদ্যোক্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, ব্যাঙ্ক থেকে সহজশর্তে ঋনপ্রদানের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সাহায্য করা হোক।

'যতোদিন তোমাদের হাতে দেশ
পথ হারাবে না বাংলাদেশ।'
৩০.০৬.২০১৬ 

আপনে কোনহানকার কুতুব?

দেশের বেশিরভাগ মানুষের আসলে সরকার, বিরোধীদল, জঙ্গী, বিদেশী শক্তি, বাম-ডান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, ট্রানজিট, তিন বিঘা করিডোর, সাহারা খাতুন, মাল মুহিত ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে কোনো চিন্তা নাই। তাদের একমাত্র চিন্তা, কালকে কি খাবো?! খাবারের চিন্তা করতে করতেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাইটা যায়। তারা চায় দুই বেলা খাবার, একটা নিশ্চিত কাজ আর নিজের জীবনের নিরাপত্তা।

সকালে তারা কাজ করতে বের হয়, নিজের জান হাতে নিয়ে। সন্ধ্যায় ফিরা আসে, তাও জান হাতে নিয়ে। রাস্তা ঠিক নাই, রাস্তায় জ্যাম, রাস্তা ভাঙ্গা, নারীদের জন্য প্রচণ্ড অনিরাপদ রাস্তা, এমনকি নিজের বাসার ভেতরেও কেউ নিরাপদ না। তারপরো সরকারের কানে কোনো অভিযোগ যাবে না, যদি জিনিসপত্রের দাম হাতের নাগালের মধ্যে থাকে। যদি দ্রব্যমূল্যের দাম লোকজনের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চইলা যায়, তখন তারা পেটে লাথি অনুভব করে। পেট ভরা থাকলে, পিঠে দুই চার ঘা সওয়া যায়। পেট খালি রাইখা এতো নক্তা সওয়া যায় না। তখনই লোকজনের মাথাটা খারাপ হইয়া যায়। তারা কাজের জন্য রাস্তায় নামে, খাবারের জন্য রাস্তায় নামে, নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় নামে। চেয়ারে কার বাপ, কার ভাই বইসা আছে, লোকজনের এইটা দেখার তখন টাইম নাই।

এর আগেও বড় বড় কুতুব এই আলো বাতাসে গুজরায়া গেছে। কুতুবউদ্দিন আইবক থেইকা গাদ্দাফি-সাদ্দাম-মোবারক। আপনে কোনহানকার কুতুব?
২৮.০৬.২০১৬ 

বিপদে পরার আগে

বিপদে পরার আগে কিভাবে বোঝা যাবে যে আপনি বিপদে পরতে যাচ্ছেন? বিপদ কি কখনো বইলা আসে যে আমি আগামীকাল সকাল সাতটায় আসবো? অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদে কি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি সম্ভব?
এতোগুলা প্রশ্নের একটাই উত্তর। না।
প্রত্যেকটা বিপদ ই নতুন। আর তাকে আলাদা আলাদা ভাবে মোকাবিলা করতে হয়।
২৪.০৬.২০১৬ 

তনুর দুর্ভাগ্য

তনুর দুর্ভাগ্য, তার পরিবার একটা মধ্যবিত্ত পরিবার। তার পরিবারের কেউ বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী না, এমপি না, সরকারী আমলা না, সেনাবাহিনীর অফিসার না, এমনকি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি বা আনসার বাহিনীর অফিসার ও না। তার পরিবার এ কেউ হেভিওয়েট পলিটিশিয়ান না, যুবলীগ না, স্বেচ্ছাসেবক লীগ না, ছাত্র-তরুন-শিশু-পেশাজীবি কোনো ধরনের লীগ না। অথবা পরিবারে যদি কেউ এমন থাকেও তারা সাহায্য করতে সক্ষম না। কারন ঘটনা ঘটছে আরো উপর তলায়। একদম দশ তলায়। আমরা মধ্যবিত্তরা মাথা বাইরায়া উঠতে পারি তিন তলা পর্যন্ত। তারপরো তনুর পরিবার বিচার চায়! বিচার কেমনে চায়?! লোকেদের নিজেদের তাগদ সম্পর্কে ধারনা থাকতে হয়। আপনে মাখন মাখার ছুরি নিয়া গেলেন জলহস্তীর সাথে লড়াই করতে। আপনি খামছি খাবেন না কে খাবে??

তার উপর মানুষ প্রজাতি হিসাবে ভুলোমনা। এক ইস্যু কয় দিন মনে রাখা যায়?! আশ্চর্য মানুষের কি আর খায়াদায়া কাজ নাই? তার উপর খুন কি আর একটা হইতাছে? অয় খুন হইলো। সে খুন হইলো। তারা খুন হইলো। এক বিচার নিয়া কয়দিন লাফামু? এদের খুনের ওতো বিচার চাওন লাগবো। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

'এক তনু লোকান্তরে
লক্ষ তনু রাস্তায় ঘোরে।'
২১.০৬.২০১৬  

২০১৬ সালের প্রতিক্রিয়াসমূহ



15 January 2020

আতুরঘরে মৃত্যু অথবা হিজলের লাল : পর্ব- ৯, ১০


.


প্লাবনের একবার মনে হলো কবিতা লিখবে। কিন্তু কবিতা কিভাবে লিখবে? কবিতা লেখার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ও নীলক্ষেত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতান আর কাজী নজরুল ইসলামের সঞ্চিতা কাব্যসংকলন কিনে নিয়ে আসলো। কবিতা লিখতে বসার আগে দুইটা বই খুলে নিয়ে বসতো ও। তারপর দুইটা বই থেকেই কিছু কিছু পড়তো। এক-দুই পাতা পড়ার পর ওর কবিতা লেখার বেগ চাপতো। ওর প্রথম লেখা কবিতার প্রথম লাইন এখনো মনে আছে আমাদের৷ 'বিষ ঢেলে দাও, বিষ ঢেলে দাও মম অন্তর মাঝে...' আমি, শাকিল, পুইয়ান সবার রুমে রুমে গিয়ে বলে আসলাম এই ঘটনা, সবাই হাসতে হাসতে শেষ।

আমাদের আরেক বন্ধু ছিলো পরিসংখ্যানের ফারুক। আমরা রুমমেট ছিলাম। একবার বিকালবেলা আমি, শাকিল, প্লাবন, হৃদয় এবং সৈকত হালকা ভেষজ দ্রব্যাদি সেবন করে রুমে আসলাম। রুমে এসে দেখি ফারুক পড়ছে। ও তখন তাবলীগ করা শুরু করেছে। দুনিয়ার দুষ্ট ফারুক তাবলীগ শুরু করলেও দুষ্টামি ছাড়তে পারেনি। আমি ওকে বললাম- 'আরবের ভূরাজনীতি বুঝস?' ও বললো' 'না...' আমি ওকে চেপে ধরলাম- 'না মানে? তাবলীগ করবি আর আরব সম্পর্কে জানবি না মানে... তরে কই দাড়া...' তারপর ওকে চেপে ধরে প্রায় ১ ঘন্টা আরবের ভূরাজনীতি বোঝালাম। মহানবী, খুলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া খেলাফত, আব্বাসীয় খেলাফত, সৌদি আরব, ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, মিসর যখন ঘুরছিলাম, ফারুক তখন বলে- 'দোস্ত, আর না...' আমি আরো চেপে ধরে বলি- 'আর না মানে... তরে জানাই লাগবো...' পরে পাশের বেড থেকে হৃদয় আর শাকিল হাসাহাসি শুরু করে। বলে- 'আজকের মতো ওর ভূগোলের ডোজ কমপ্লিট দোস্ত, অরে ছাইড়া দে... আছরের আজান দেয়...' পরে অকে ছেড়ে দেয়া হয়।

একবার আমাদের ডিপার্টমেন্টে এক খান্ডাশী ম্যাডাম এসেছিলো। ৩৬, ৩৭, ৩৮ এর অনেকেই তাকে মনে করতে পারবে, তার নাম নুসরাত জাহান চৌধুরী। সে আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে ছিলো, আমাদের বিভাগে এক-দেড় বছর স্টপেজ দিয়ে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়। এই এক-দেড় বছর সে ডিপার্টমেন্টে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার কিছু নিয়ম প্রাইমারি স্কুলের নিয়ম হওয়ারও যোগ্য ছিলো না। যেমন- ক্লাসে নিয়মিত আগের ক্লাসের পড়া ধরা, ক্লাসে প্রশ্ন করা যাবে না, ক্লাস শুরু হলে ক্লাসে ঢোকা এবং বের হওয়া যাবে না, ক্লাস শুরু হলে দরজা আটকে দেয়া ইত্যাদি। সে ক্লাসে এসেই প্রথম ১৫ মিনিট সময় নষ্ট করতো- তোমরা কিছু বোঝো না, তোমরা কিছু পারো না, তোমরা কিছু জানো না, গাধাদের পড়াইতে আসছি, তোমরা জীবনে কি করবা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর সে তার পূর্বতন নোট করা ডায়েরিটা বের করতো, সেখানকার কিছু পয়েন্ট আলোচনা করতো। পরীক্ষায় আবার তার পয়েন্টের বাইরে কোনো পয়েন্ট দেয়া যেতো না। যারা তার পয়েন্টগুলো মুখস্থ দিতে পারতো তারাই তার কাছে ভালো ছাত্র ছিলো।

যাই হোক আমি আর শাকিল একবার ম্যাডামকে নিয়ে আলাপ করতে করতে হেটে গেরুয়া যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কোন প্রসঙ্গে যেনো বললাম- 'নুসরাত জাহান চৌধুরী তো আমাদের ঘাড়ে পারা দিয়া পু*কি মারতেছে...' শাকিল বললো- 'হেই মিয়া... ঘাড়ে পারা দিয়া পু*কি কেমনে মারে... এইটা তো অসম্ভব... অসম্ভব কথা বলো মিয়া...' 'শারীরিকভাবে সম্ভব না হইলেও মানসিকভাবে সম্ভব...' তারপর আমরা হাটতে হাটতে গেরুয়ার ঢাল বাইলাম।

আরেকবার, বেনসনের দাম তখন মনে হয় ১০ টাকা। মাসের শেষ, আমাদের কারো হাতে তেমন টাকা নাই। সবার টাকাই বাসা থেকে আজকে আসবে, কালকে আসবে করছে। আমাদের সৈকত এমন সময় ক্লাসে চাদা তুললো। ১ টাকা, ২ টাকা করে চাদা তুলে ১০ টাকা করলো। তারপর টারজান পয়েন্ট থেকে ১টা বেনসন কিনে নিয়ে আসলো। ফ্যাকাল্টিতে আমাদের সিগারেট খাওয়ার আলাদা জায়গা ছিলো। সমাজবিজ্ঞান ভবনের ৫ তলায় উঠার সিড়ি। আমরা ৪ তলায় ক্লাস করতাম, ঐ সিড়ি খুব কাছে ছিলো। শুধু কাছে না, সেইফ এন্ড সিকিউর। আমরা ঐ জায়গার নাম দিয়েছিলাম 'গ্যাসচেম্বার'চেম্বারের জন্য আমাদের আলাদা 'নিখিল লোক প্রশাসন বায়ুসেবনকারী কমিটি' ছিলো। কমিটির স্থায়ী সদস্য ছিলাম আমি, শাকিল, প্লাবন, তিলন, সৈকত, হৃদয় আর চশমা তানভীর। শামীম, শুভ, সুষম আর আরেক তানভীর ছিলো গেস্ট মেম্বার। তো সৈকত সিগারেট কিনে চেম্বারে নিয়ে আসলো। একটা সিগারেট, অনেক ভোক্তা। সৈকত সিগারেটটার ফিল্টারের দিকে আগুন ধরালো। আমরা সৈকতের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

আমাদের মুন্না লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করতো। তখন এরকম বিসিএসের পড়া পড়তো না লাইব্রেরিতে। অন্য অনেক কিছু পড়তো- তত্ত্ব, সাহিত্য, আউট বই। মুন্না একদিন হঠাৎ বলে উঠে- 'তিলন খালি রাজনীতিই কইরা গেলো, বোকা*দা...'বলে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লো। আবার তিলন একদিন কথা বলতে বলতে কি বিষয়ে যেনো বললো- 'এইযে মুন্না অরা বোকা*দার মতো খালি পইড়াই গেলো...'আমি এই দুই '' এর মাঝখানে পরে ছিলাম।

ফার্স্ট ইয়ারে তখন। একবার আমি মঈনউদ্দীন পাঠান ভাইকে খুজতে তার রুমে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বড়ভাই বসে বসে পড়ালেখা করছিলেন। আমি বললাম- 'ভাই... মঈন ভাই আছে?' ভাই বললো- ' ও তো রুমে নাই। আপনে কে?' বললাম- 'ভাই... পুশকিন, লোক প্রশাসন, ৩৭...' ভাই বললো- 'আমি আব্দুল কুদ্দুস মাখন। এই নামে আরেক বিখ্যাত লোক আছে, চিনেন তারে?' আমি বললাম- 'জি ভাই... রাজনীতিবিদ ছিলো... ঠিক আছে ভাই যাই...' বটতলায় গিয়ে দেখি মঈন ভাই সেখানে বসে আছেন। ভাইকে বললাম- 'ভাই, আপনার রুমে গেছিলাম। আপনে এইখানে...' মঈন ভাই বললো- 'রুমে কে ছিলো?' বললাম- 'নাম বললো আব্দুল কুদ্দুস মাখন... ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ কিছু কয় নাই...' মঈন ভাই, শুভ ভাই, রোলান্ড দা আরো সবাই সে কি হাসি! মঈন ভাই বললো- 'নিশ্চয় অলক ভাই... সে ছাড়া এই কাজ কে করবো? রুমে একটা পোস্টার আছে মাখনের... দেখসস...?' আমি বললাম- 'না ভাই...' মঈন ভাই বলে- 'কি খেয়াল করস...?'

একটু পর রুমে গেলাম। রুমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই অলক ভাই হাজির। বললো- 'ভাই আমার ভুল হইয়া গেছে... আমি বুঝি নাই... আমার নাম, ব্যাচ বলা দরকার ছিলো...' আমিতো খুব বিব্রত। আবার ভয়ে আছি, মোস্ট সিনিয়র ব্যাচ। বললাম- 'ভাই আমি আপনার নাম-ব্যাচ জানি...' ভাই বললো- 'বলেনতো কি?' আমি বললাম- 'অলক... ৩১ ব্যাচ...' ভাই বললো- 'শুধু অলক?' আমি বললাম- 'সরি ভাই... অলক ভাই... ৩১ ব্যাচ।' ভাই বললো- 'ঠিকাছে পুশকিন... গেলাম।' আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহ...

আরেকবার ক্লাস শেষে আমাদের ৩৬ ব্যাচের আকাশ ভাই আমাকে আর নাসিরকে র‍্যাগ দেয়ার জন্য সালাম-বরকত হলে নিয়ে গেলেন। হালকা কিছু র‍্যাগ-ফ্যাগ দিলেন। নাসির তখন খুব শক্ত। আকাশ ভাই যা বলে করে ফেলে। কাঠি দিয়ে রুম মাপা শেষ হলে আকাশ ভাই নাসিরকে বলেন- 'নাসির, বিড়ি খাস?' শক্ত নাসির তখন কেদে দিলো। 'না... ভাই... খাই না...' আকাশ ভাই অবাক হলেন, এতক্ষণ র‍্যাগ চললো কিছু করলো না, বিড়ির কথা জিজ্ঞাসা করতেই কেদে দিলো! আমার দিকে তাকালেন, আমি বললাম- 'আমি খাই ভাই...' ভাই বললেন- 'এ নাসির... বিড়ি না খাইলে কি কান্তে আছে? বিড়ি খাস না, খাস না... কান্দার কি হইলো... কান্দা থামা... পুশকিনরে সাথে নিয়া গিয়া ২টা বিড়ি নিয়া আয়...' আকাশ ভাই আমাকে ইশারা দিলেন, কান্দা থামা, কি একটা অবস্থা...

রাতে বটতলায় গান-বাজনা হতো। মঈন ভাই, রোলান্ড দা, কিশোর দা, শুভ ভাই, সেরু ভাই, রানা ভাই, মোমিন ভাই এরা থাকতো। রোলান্ড দা খোল বাজিয়ে গাইতো, সেরু ভাই টেবিলে তাল কাটতো, 'আর কি হবে এমন জনম বসবো রে সাধু মেলে...' রোলান্ড দা একবার আমাকে আর প্লাবনকে জিজ্ঞাসা করলেন- 'আচ্ছা, আমাদের হাত তো আমাদের অংশ। আমাদের হাত যদি কাটা পরে আর তাকে কবর দেয়া হয়, সেটা কি আর আমার থাকবে? এই 'আমি' আসলে কে...?' গভীর প্রশ্ন, আমরা ভাবতে বসে গেলাম। তার কিছুদিন পরেই দাদা হল ছেড়ে ইসলামনগর বাসা নিলেন। আমি এক বিকালে বটতলা থেকে হলে ঢুকতে গিয়ে দেখি দাদা রিক্সায় বিছানাপত্র তুলছেন। দাদার সাথে শুধু হিমেল দাঁড়ানো। আমি অনেক কষ্টে কান্না আটকালাম। আমি আর হিমেল, দাদাকে ইসলামনগর পর্যন্ত দিয়ে আসলাম।

আমাদের সময়ে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা ঘটতো, তা না। স্মৃতিচারন করার মতো অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, কেবল কয়েকটা গল্প; নাকি তার বেশি কিছু?



১০.


যাইহোক, জুবায়ের যেদিন মারা যায় সেদিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় সর্বাত্মক আন্দোলন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রথমেই রেজিস্টার ঘেরাও দেয়া হয়। আন্দোলনে সকলের অংশগ্রহণ অত্যন্ত স্বতঃস্ফুর্ত ছিলো। নেতৃত্বের জায়গায় প্রগতিশীল ছাত্রজোট বা সাংস্কৃতিক জোট থাকলেও ব্যাপক ছাত্রসমাগমকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা হয় একটি স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম- ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। এখানে কোনো ধরনের নিপীড়ন, জুলুম-নির্যাতন, অন্যায় করে পার পাওয়া মুশকিল। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। নিপীড়ক শিক্ষক হোক আর উপাচার্য হোক, কোনো লাভ নাই। তাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখীহতেই হয়। এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিপীড়নের দায় মাথায় নিয়ে বাংলার মাস্টার মোস্তফা, নাটক ও নাট্যতত্ত্বের মাস্টার সানি বিদায় নিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারটাই মারমুখী। এখানে কিছু মাস্টার বের হয় যারা কোনো জাতেরই না, পরে ছাত্রদের হাতে তাদের ঠিক হওয়া লাগে। সেদিন বটতলায় এক মাস্টার গাড়ি নিয়ে হাজির, সেতো পারলে দোকানের ভেতরেই গাড়ি পার্ক করে। এইটা নিয়ে কয়েকজন ছাত্র কথা বলতে গেলে তাদের আবার বহিষ্কারের ভয় দেখায়, আবার তাদের নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। আরে, এইখানে সেলিম আল দীন রিক্সায় করে ঘুরতো, খালি পায়ে হাটতো। এখানে আনু মুহাম্মদ এখনো খালেদা-হাসিনা দুই সরকারেরই মাইর খায়, এখানে রায়হান রাইন ট্রান্সপোর্ট এসে ছাত্রদের সাথে আলাপ করে, চা খায়। এখানে সৈয়দ নিজার আলম গাছের নিচে ছাত্রদের ক্লাস নেয়, হাইকোর্টে রিট করে কেনো ক্লাস বন্ধ করা অবৈধ হবে না?   জুবায়ের মারা যাওয়ার পর মূল আঙুল উঠে তৎকালীন ছাত্রলীগ আর উপাচার্যের দিকে। যদিও জুবায়ের অনেকটা ব্যক্তিগত কারণে মারা গিয়েছিলো, কিন্তু তারপরো কোনো ধরণের অপমৃত্যু আমরা সমর্থন করতে পারি না।

শাকিল আমাকে প্রায় ফিসফিস করে বললো- ‘প্লাবন ও নাকি ছিলো… জানো নাকি কিছু?’ আমি কিছু জানিনা এসম্পর্কে। তখন আমার সাথে হল এবং ডিপার্টমেন্টের অনেকের যোগাযোগই শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছিলো। আস্তে আস্তে একটা একটা নাম প্রকাশিত হতে থাকে। প্লাবনের পর মাসুদের নাম আসে। একটা একটা নাম আসে আর ক্ষোভে ফেটে পরে রেজিস্টারের সামনে থাকা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর। নাম ধরে ধরে স্লোগান দেয়া হয়। খুনি প্লাবনের ফাঁসি চাই…খুনি মাসুদের ফাঁসি চাই…

আচ্ছা যে ধর্ষক, সে তো বছরের ৩৬৫ দিন, দিনের ২৪ ঘন্টাই আর ধর্ষন করে না। হয়তো কোনো এক দিন, কোনো এক মুহুর্তে সে এইরকম অনৈতিক কাজ করে বসে। কিন্তু খুন, ধর্ষন এগুলো এমন পর্যায়ের অপরাধ যে একবার করে ফেললেই হয়ে গেলো। সেখান থেকে পেছনে আসার আর কোনো উপায় নাই। কিন্তু এমনো তো হয় যে খুন করেনি, কিন্তু খুনি উপাধী নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় ও নেই।

জুবায়েরকে মারা হবে এটা তৎকালীন প্রক্টর জানতো। জুবায়েরের ঐদিন ফোর্থ ইয়ারের শেষ ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো। ঐ পরীক্ষার পর ৩-৪ দিনের গ্যাপ, তারপর ভাইভা। ছেলেপেলে ভাইভার আগেই ওকে মাইর দিতে চাইলো। ওদের ধারনা ছিলো ভাইভার পর জুবায়ের আর ক্যাম্পাসে আসবে না। তো নতুন কলার সামনে জুবায়ের ওর বান্ধবীর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলো। সেখান থেকে দুই-তিনজন ওকে প্রায় জোর করে ধরে বিজ্ঞান কারখানার দিকে নিয়ে আসে। বিজ্ঞান কারখানাটা তখন যে জায়গায় ছিলো সেখানে এখন ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাগার। ঐদিন আমাদেরও ফাইনাল পরীক্ষা ছিলো।

তো জুবায়েরকে বিজ্ঞান কারখানার পেছনে নিয়ে গিয়ে রড দিয়ে মারে। জুবায়ের মাফ চায়, এরকম আর করবেনা বলে জানায়, ওকে ছেড়ে দিতে বলে, বাচাতে বলে। প্লাবন ঐ সময়ে সেখানে ছিলো। প্লাবন জুবায়েরের ঘটনায় ২২ দিন জেল ও খাটে। জেল থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ও আমার গেরুয়ার বাসায় এসেছিলো। ১ দিন থেকে পরে ওর গাইবান্ধার বাড়িতে গিয়েছিলো। জুবায়েরের ঘটনা আর জেলখানার ভেতরের কিছু বিষয় আমি ওর কাছে জানতে পারি।

প্লাবনের বক্তব্য সরাসরি কোট করা সম্ভব নয়। তবে মূল বক্তব্য ছিলো এইরকম, পরীক্ষা দিয়ে ও সমাজবিজ্ঞান থেকে হলের দিকে যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে জুবায়েরকে কয়েকজন মিলে ফিজিক্স-কেমিস্ট্রির রাস্তাটা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। জুবায়ের ওকে দেখে ডাক দেয়। জুবায়ের ওদের হাত থেকে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে বলে। প্লাবন জুবায়েরকে নিয়ে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু যারা নিয়ে যাচ্ছিলো তারা প্লাবনের কথা শুনে না। প্লাবন ওদের সাথে সাথে বিজ্ঞান কারখানা পর্যন্ত যায়। জুবায়ের প্লাবনকে প্রায় জোর করেই ওর সাথে নেয়। বিজ্ঞান কারখানার পেছনে আরো কয়েকজন আগে থেকেই মজুত ছিলো রড-লাঠিসোটা নিয়ে। তারা প্রথমে হাতে মারে, পরে রড-লাঠি দিয়ে মারে। এমনকি জুবায়েরকে হাত দিয়ে আগলাতে গিয়ে প্লাবন নিজেও দুইএকটা মাইর খায়। প্লাবনের ধারনা ছিলো দুইএকটা মাইর দিয়ে ছেড়ে দিবে।

মাসুদের বিষয়টা জিজ্ঞাসা করলাম, প্লাবন বললো- ‘মাসুদের বিষয়টাতো আরো লেইম। যেমন আমি কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পরে গিয়েছিলাম। সেখানে না পারছিলাম থাকতে, না পারছিলাম বের হয়ে যেতে। তো সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসতে আমি মাসুদকে ফোন দেই। প্রথমে ফোন দেই রিজনকে। রিজনের ফোন বন্ধ দেখায়। তারপর আমি মাসুদকে ফোন দিয়ে বলি বিজ্ঞান কারখানার পেছন থেকে যেন আমাকে এসে নিয়ে যায়। মাসুদ তখন হলে ছিলো। মাসুদ একটা রিক্সা নিয়ে আসে। রিক্সা রাস্তায় দাড়া করিয়েই বিজ্ঞান কারখানার পেছনে আসে, আমার হাত ধরে টেনে আমাকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে রিক্সায় তোলে। আমরা হলে আসি। মাসুদ ঘটনাস্থলে ছিলো ১৫-২০ সেকেন্ড। এরপর জুবায়েরের বিষয়ে আমি আর কিছু জানি না।’

পরদিন সকালে ভিসির অফিসে প্লাবনসহ কয়েকজনকে ডাকা হয়। প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা কথা বলা হয়। প্লাবনের সাথে কথা বলে তৎকালীন প্রোভিসি ফরহাদ স্যার। প্লাবন যা যা ঘটেছে, দেখেছে সব বলে। প্লাবনকে বলা হয় তাহলে তুমি স্টেটমেন্ট দাও, সাক্ষী হয়। তোমার নিরাপত্তার বিষয়টা, তুমি যেনো না ফাসো সেটা ভার্সিটি দেখবে। প্লাবন ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কথামতো কাজ করে, কিন্তু যখন মামলার আসামী সাজানো হয় তখন প্লাবন-মাসুদের নাম সহ আসামীর কাগজ জমা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এখানে মূল রাজনীতিটা করে প্রশাসন।

প্রশাসনের রাজনীতি করার আরো বেশ কিছু নজির আছে। এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উপাচার্য ছাত্রলীগকে দিয়ে সাংস্কৃতিক জোটের নেতাদের মার খাওয়ায়। মার খাওয়া নেতাদের আবার শিবির বলে হেনস্তা করারও চেষ্টা করে। এই পরিকল্পনাটা মনে হয় শরীফ এনামুল কবিরের নিজের। ওদের শিবির বললে ওরা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবে, কারণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি সবসময়ই শিবির বিরোধী। সমস্যা হয় বেশ কয়েকজন হিন্দুধর্মাবলম্বী এই সময়ে মার খায়। আর যারা মার দেয় তারা ভিসির খুব কাছের লোক বলে চিহ্নিত। এই মারামারির ফলে মূলত প্রশাসন আরো বিপাকে পরে। যাদের মারা হয় তাদের শিবির বলে কোনো প্রমান দিতে পারেনি আবার তারমধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের নেতারাও ছিলো। ফলে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

এছাড়া কিভাবে যেনো আন্দোলনের খবরাখবর লিক হতে থাকে। আজকে আন্দোলনকারীরা কি করতে যাচ্ছে এটা আগে থেকেই প্রশাসন জেনে যাচ্ছিলো। আন্দোলনকারীদের জন্য এটা একটা খারাপ লক্ষণ। তখন আমার বেশিরভাগ সময় কাটতো বটতলায় বসে থেকে। সে সময়েই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে হয়ত সর্ব বৃহৎ মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতো বড় মশাল মিছিল করা কেবল ছাত্রজোট বা সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষে করা সম্ভব না। সাধারণ ছাত্রদের ব্যাপক সমর্থন ছিলো এই আন্দোলনে। উপাচার্যের কর্মকাণ্ডের কারণে জুবায়েরের হত্যাকাণ্ডবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় ভিসিবিরোধী আন্দোলনে। শরীফ এনামুল কবির টিকে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাত্রদের অনড় অবস্থানের জন্য গদি থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।


অসমাপ্ত...