বাংলাদেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখন সহজে বেহেস্তে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। এর অধিকাংশই নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত। সমাজের এই অংশই সবচেয়ে ধার্মিক-ধর্মভীরু বা ক্ষেত্রবিশেষে ধর্মান্ধ। নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ধার্মিক হওয়ার পেছনের মূল কারণ- অপ্রাপ্তি। কারো সংসারে হয়তো ৪ টা বাচ্চা। জীবনের টানাপড়েনে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খেতে হয়। হয়তো বাচ্চাদের মাসে- ২ মাসে একবার তুলনামূলক কিছুটা ভালো খাবার দিতে পারে বা তাও পারেনা। তখন তারা হিসাব করে বের করে এই জীবনে ত পেলাম না, পরের জীবনে বেহেস্তে গেলে মাংস খাবো, দুধের নদীতে গোসল করবো, যা চাইবো তাই পাবো, টাকার জন্য কিছুই আটকাবেনা। গরীবের সম্পদ কম, তাই তার হিসাব কম, তাই তার বেহেস্তে যাওয়াও সোজা।
ধার্মিক হওয়ার জন্য কিছু খরচ করা লাগে। কিছু পড়াশোনা করা লাগে। নিম্নবিত্ত ধার্মিকরা হয়তো জীবনে একবারও বাংলা কোরান-হাদীন পড়েন নাই। কিন্তু বেসিক কিছু বিষয় জানেন, পারিবারিক ঐতিহ্য আর স্থানীয় ইমাম থেকে। এর পর ভরসা করেন ওয়াজে। কিন্তু ওয়াজে যখন ভুলভাল বলা হয়, নতুন কিছু না শিখিয়ে কেবল দোষারোপ করা হয়, পুরো পরিবার বেহেস্তে যাওয়ার উপায় হিসেবে সন্তানকে মাদ্রাসায় দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন ডান-বাম চিন্তা করার উপায় থাকেনা তাদের।
হয়ত সন্তানকে এমন মাদ্রাসায় দেন যেখানে খরচ খুব কম, অথবা ১ বেলা খাবার দানের টাকা থেকে আসে, তখন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির উপর চাপ কিছুটা কমে আসে। কিন্তু সেই সন্তানটিই যখন ধর্ষন বা বলাৎকারের শিকার হয়ে গাছের ডালে ঝুলে থাকে বা মাদ্রাসার জানালায় ঝুলে থাকে বা বস্তাবন্দী বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মর্গে যায়, পিতামাতার তখন কি করার থাকে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়গুলো কিছুটা সাহসের সাথে উঠে আসে। কিন্তু কয়টা আসে? কয়টার বিচার হয়? বিলম্বিত বিচার, বিচারহীনতার নামান্তর।
বেহেস্তে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর জাতি! অথচ এর আগে এরা যে জায়গাটায় থাকতেছে সেটাকে দোযখ বানায়া ফেলতেছে। প্রায় কেউই নিজের ময়লা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে না। ফেলবে কোত্থেকে নির্দিষ্ট জায়গাই ত নাই। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা দেয়া স্থানীয় প্রশাসনের কাজ। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট জায়গা দেয়া আর সেখান থেকে ময়লা নিয়মিত নিষ্কাশন করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসন চূড়ান্তরকম ব্যর্থ। স্থানীয় প্রশাসন জানেইনা ময়লাগুলো দিয়ে কি কি করা যায়? সাভার পৌরসভা উপায়ন্তর না দেখে একটা যুগান্তকারী আইডিয়া গ্রহণ করে। আইডিয়াটা বেশ মজার। সেটা হলো সাভার থেকে গাবতলী হাইওয়ের দুইপাশে ময়লা স্তুপ করে রাখা।
তাতে বেশ কিছু উপকার হচ্ছে যেমন- দুইপাশের খালি জমি ভরাট হচ্ছে। মাটিতে পলিথিনের স্তুপ জমে মাটিদূষণ চমৎকারভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। বৃষ্টিতে বা গরমে ময়লাগুলো পচে গিয়ে মানুষের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেই দুর্গন্ধ গায়ে মেখে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ব্যবহার করছে।
মজা যে কেবল সাভার পৌরসভা করেছে তা না, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররাও করেছে। তারা রাস্তার মধ্যে কিছু ডিব্বা দিছে ময়লা ফেলার জন্য। ডিব্বা দিয়েই খালাশ। ডিব্বা দিতে বলছেন, দিছি। ডিব্বা পরিষ্কার ত করতে বলেন নাই। সেই ডিব্বা যে পরিষ্কার করা লাগে, সেই ডিব্বা থেকে ময়লা প্রত্যেকদিন সরায়া নেয়া লাগে, ডিব্বাটা আবার ব্যবহারের উপযোগী কইরা রাখা লাগে সেইটা এই প্যারিসের মেয়ররা জানেননা। ফলাফল সবাই হাতে হাতে তের পাইতেছে। সবাই দেশ ছাইড়া ভাগার জন্য অস্থির হইয়া আছে। কেউ সুযোগ পাইতেছে, কেউ সুযোগের অভাবে যাইতে পারতেছেনা।
অথচ এই লোকেরাই দেশের বাইরে গিয়ে জায়গা মতো ময়লা ফেলবে। আর আক্ষেপ করবে ইশ! কেন এইরকম একটা জাহান্নামে জন্মাইছিলাম। জন্মায়া যখন ফেলছেনই কিছু দায়িত্ব পালন করেন। এই বিষয়ে মহানবীর হাদীসও আছে। সেই ব্যাক্তি উত্তম যার হাত ও মুখ থেকে তার প্রতিবেশি নিরাপদ। অথচ দেখেন আমাদের ব্যক্তিগত ময়লা দিয়া আমরা প্রতিবেশিদের কষ্ট দেই, তার প্রতিবেশিদের কষ্ট দেই। যার সাথে জীবনে একবার কথাও হইবোনা তারেও কষ্ট দেই। আমরা নিজেরা জায়গামত ময়লা ফেলবো এবং স্থানীয় প্রশাসনকে চাপ দিবো ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা দেয়ার জন্য, ময়লা যথাসময়ে যথাযথ জায়গায় সরায়া নেয়ার জন্য।
মানুষের জন্য দেশ, না দেশের জন্য মানুষ?
মানুষের জন্য সরকার, না সরকারের জন্য মানুষ?
মানুষের জন্য ধর্ম, না ধর্মের জন্য মানুষ?
আরে, সবার আগে ত মানুষ। মানুষ আছে এই বইলাইতো এতো আয়োজন। ধর্ম, সরকার, দেশ, প্রশাসন। মানুষ যদি ভালো না থাকে এই জিনিসগুলা দিয়া আমরা কি ফালাবো?
আচ্ছা, আমরা আবার ধর্ষনে ফিরা যাই। ধর্ষন নিয়া দুইটা কথা। ধর্ষন যে কেউ যে কোনো সময় যে কোনো বয়সে করতে পারে। একপাক্ষিক কেবল হুজুরদের দোষ দিয়া লাভ নাই। তবে এইটা সত্য হুজুরদের মধ্যে ধর্ষন, শিশুকামীতা এবং সমকামিতার প্রকোপ বেশি। এর কারনে পরিষ্কার। হুজুররা একটা দীর্ঘসময় যৌন-অবদমনের মধ্যে বসবাস করে। ফলে তারা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পরে। শুধু হুজুররা না। যেকোনো ধর্মের যাজক-পুরোহিতদের মধ্যে এই প্রবনতা লক্ষণীয়। একসময় গীর্জা ছিলো শিশুকামিতার আখড়া, এখন মাদ্রাসাগুলা। আরেকটা বড় কারণ পরিবার থেকে দূরে থাকা। পরিবারের ছায়ায় থাকলে, স্ত্রী-সন্তানাদি পাশে থাকলে ধর্ষন-বলাৎকার কিছুটা কমবে হয়ত। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হবে না। ধর্ষন-বলাৎকার, শিশুকামিতা ইত্যাদি মানবপ্রজাতির মৌলিক খারাপ গুণ (মানবপ্রজাতির মৌলিক খারাপ গুণ নিয়া আলাপ আরেকদিন)। পুরোপুরি বন্ধ হবে না, কিন্তু কমায়া আনা সম্ভব।
ধর্ষন নিয়া আরেকটা কথা হচ্ছে, ধর্ষনের বিচার করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করা লাগবে কেন? কেন বলা লাগবে ঐ ধর্ষকরে গ্রেফতার করো। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজটা কি? ৫৭ ধারায় গ্রেফতারের সময় যতো দ্রুত কাজ হয়, সেটাতো প্রথম হওয়ার কথা খুন-ধর্ষন-খাদ্যে ভেজাল এইসব ক্ষেত্রে।
না কান্না করলে মা বাচ্চারে দুধ দেয় না। আর আমাদের ধারনা আমাদের অধিকার সরকার ঘরে আইসা দিয়া যাবে। যেটা দরকার সেটা চাইয়া নিতে হবে। যতবার ধর্ষন হবে, ততবার লোকেরা রাস্তায় নামবে, বিচার চাইবে। বিচারকাজ যেন দ্রুত হয় সেটা চাইবে, বিচারে দোষী যেন অর্থ বা ক্ষমতার জোরে নির্দোষ হইতে না পারে সেটার জন্য চাপ দিবে। লোকেরা খাদ্যে ভেজাল নিয়ে কথা বলবে। আল্লাহর দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় দুনিয়াবি অপরাধ মানুষের খাদ্যে বিষ দেয়া। গুটিকয়েক সুবিধাবাদী, মুনাফাখোর, বেঈমানের জন্য কষ্ট পাইতেছে পুরা জাতি। অপরাধ হইলে জাতি প্রতিবাদ করবে। অন্যায় হইলে, দুর্নীতি হইলেও করবে। আসলে দুর্নীতিরে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার। কেবল দুর্নীতি এই শব্দটা দিয়া দুর্নীতির যে ব্যপক চিত্র সেটা দৃষ্টিগোচর হয়না।
দুর্নীতি মানে নীতিহীনতা। আমি সরকারি ডাক্তার। জনগণের টাকায় সরকারি মেডিকেল কলেজে পইড়া, বিসিএস দিয়া সরকারি ডাক্তার হইছি। সরকার আমারে সেবা দিতে পাঠাইতে চায় কুড়িগ্রামের রৌমারি। কিন্তু আমি সেখানে না গিয়া তদবির করতেছি যেন ঢাকায় দেয়, ঢাকায় দেয়। ঢাকায় টাকা উড়ে। প্রাইভেট ক্লিনিক, ডিসপেনসারি, নিজের চেম্বার। ঢাকায় থাকার জন্য কিছু ঘুষও দিলাম। এই তদবির, এই ঘুষ এগুলা দুর্নীতি। এইযে ধানের ন্যায্যমূল্য পাইতেছেনা কৃষক। অথচ বাজারে চালের দাম কমে নাই। মাঝখানের টাকাটা যাইতেছে কই? সবাই জানে। হাতে গোনা যাবে এই পরিমান মজুতদার-মধ্যসত্ত্বভোগীর পকেটে লাভের টাকাটা যাচ্ছে। এই দেখভাল যার করার কথা কিন্তু করতেছেনা, এইটাই দুর্নীতি। কিছু সামান্য নিজের লাভের কারণে বৃহৎ জাতীয় স্বার্থের দিকে না তাকানোই দুর্নীতি।
দুর্নীতি করতেছে হয়ত খুব কম লোক, কিন্তু ভুক্তভোগী পুরো জাতি। কারণ খারাপ লোকের খারাপ কাজের জন্য সমাজ নষ্ট হয়না, হয় ভালো মানুষদের চুপ থাকার কারণে। জাতীয় স্বার্থে অনুগ্রহ করে চুপ না থেকে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেন। বিশ্বাস করেন, আপনারাই সংখ্যাগুরু।
No comments:
Post a Comment