18 May 2019

দৈনন্দিন আলাপ ৩

আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। নিয়মিত নামাজ পড়ি, কোরান পড়ি। আর মাথাভর্তি রাজ্যের প্রশ্ন নিয়া ঘুইরা বেড়াই। আব্বা আমার প্রত্যেক জন্মদিনে বই গিফট করতেন। ক্লাস সিক্সে উঠার পর দিছিলেন- বিষাদসিন্ধু। হাইস্কুলে উঠছি, বড় হইছি, এইটা বোঝানোর জন্য বড় বই, বিষাদসিন্ধু। ক্লাস টেনে দিছিলেন- তিরমিযী শরীফ। বুখারী, মুসলিম আগেই বাসায় ছিলো। আমি মনোযোগ দিয়া তিরমিযী শরীফ পড়া শুরু করি। একদিন একটা হাদীস পাইলাম নামাজে আমীন বলা বিষয়ে। হাদীসটা এইরকম- ‘আমি রসুলকে (স.) দোয়াল্লিন পাঠের পর আমিন বলতে শুনেছি। আর তিনি দীর্ঘস্বরে তা পাঠ করেছেন।’ এর নিচে ইমাম তিরমিযী টীকা দিয়েছেন- জোরে আমিন বলার এই হাদিসটি সহীহ। 

আমি আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলাম- ‘মহানবী জোরে আমিন বলতেন, মসজিদে বলেনা কেন?’ আব্বা বললেন- ‘এরা হানাফি তাই।’ আমি বলি- ‘হানাফি কি?’ আব্বা বলেন- ‘সুন্নিদের একটা মাজহাব।’ -‘আমি কি করবো তাইলে?’ -‘তোমার যেইটা ভালো লাগে।’ আমার জোরে আমিন বলা পছন্দ হইলো। মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজের সময় সুরা ফাতেহার পর জোরে আমিন বলি। ইমাম তো আর পেছন থেকে দেখেনা কে জোরে আমিন বলে। পুরা মসজিদে একজনই জোরে আমিন বলে। পরের জুম্মার নামাজের খুতবায় ইমাম এইটা নিয়া আলাপ পারলেন। বললেন- ইদানিং কেউ কেউ জোরে জোরে আমিন বইলা বেশি ধর্ম ফলানোর চেষ্টা করতেছে। এরা ইমাম আবু হানিফার চেয়ে বেশি জানে। এরা লা-মাজহাবি... আরো কতো কথা মনে নাই। একটা কথা মনে রয়া গেলো সেখান থেকে। এরা গোমরাহ। আমি বুঝতে পারলাম না জোরে আমিন বইলা কেমনে গোমরাহ হয়? লা-মাযহাবি কি বস্তু? প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঐ মসজিদে যাওয়া বাদ দিলাম। 

এরপর শুরু করলাম খোঁজখবর। তখন বাজারে গুগল জনপ্রিয় হয় নাই। নিজের পিসিও নাই। কিন্তু প্রশ্ন থামে নাই। পরে জানতে পারলাম, মুসলমানদের মধ্যে দুইটা বড় ভাগ আছে। সুন্নি আর শিয়া। শিয়া শব্দটা আসছে শিয়াতে আলী থেকে, মানে আলীর পার্টি। এরা হজরত আলীকে ইমাম মনে করে। এরা মনে করে মহানবীর মৃত্যুর পর আলীই বৈধ খলিফা হওয়ার দাবীদার। কিন্তু আগের তিন খলিফা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। আর সুন্নিরা মনে করে চার খলিফাই বৈধ এবং উত্তম- রাশিদিন। শিয়ারা মনে করে, সুন্নিদের হাতে লেগে আছে নবী পরিবারের হত্যার রক্তের দাগ। এরা মূলত মুয়াবিয়ার অনুসারী। আবুবকর, ওমর এদের সময়তো কোনো ভাগবিভাগ ছিলো না। আলীর খেলাফতের বিরোধিতাকারী মুয়াবিয়াপন্থীরা পরে সুন্নি নাম ধারন করে বিপথগামী হয়ে যায়। 

মালয়েশিয়াতে পাকিস্তানী এক শিয়া আমাকে একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন- তাকে কেউ একজন জিজ্ঞাসা করেছিলো, সে কি মুসলমান নাকি শিয়া? আমারে বলে- বলেন শিয়ারা মুসলমান না? যাইহোক আলী এবং মুয়াবিয়ার দ্বন্দ্ব যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন খারিজি নামে আরেকটা শাখা বের হয়। এরা মনে করে শিয়া-সুন্নি দুইদলই বিপথগামী। এরা মুসলমানদের প্রায় অতিবিপ্লবী অংশ। এদের হাতেই পরবর্তীতে আলী মৃত্যুবরন করেন, ঘটনাচক্রে মুয়াবিয়া বেঁচে যান। 

যাই হোক। সুন্নিদের মধ্যে প্রধান ৫ টা মাজহাব। হানাফি, মালেকি, শাফেয়ী, হাম্বলী এবং জহিরি। এর মধ্যে হানাফিরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিসর, তুরস্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ। মালেকিরা উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম দেশসমূহ, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ। শাফেয়ীরা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, ইয়েমেনে সংখ্যাগরিষ্ঠ। হাম্বলীরা প্রধানত সৌদি আরবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। জহিরি মাজহাবের অনুসারী খুব সামান্য। এরা মূলত মরোক্কো, তিউনিসিয়া, মৌরিতানিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আগে যখন স্পেন ও পর্তুগালে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো, তখন জহিরি মাজহাব ঐ অঞ্চলে খুব শক্তিশালী অবস্থানে ছিলো। 

শিয়াদের মধ্যেও এইরকম ভাগবিভাগ আছে। এদের কেউ ১২ ইমামপন্থী। ১২ ইমামপন্থীদের মূলত ২ টি প্রধান ভাগ। জাফরি ও বাতিনিয়্যাহ। জাফরিদের আবার প্রধান ৩ টি ভাগ। উসুলপন্থী জাফরি, এরা ইরান ও ইরাক অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া। আখবারপন্থী জাফরি, এরা বাহরাইনে সংখ্যায় বেশি। শায়েখপন্থী জাফরি, ১৯ শতকের শুরুতে এদের একটা বৃহৎ অংশ বাহাউল্লাহকে নবী দাবী করে বাহা’ই ধর্মের প্রতিষ্ঠা করে। বাতিনিয়্যাহদেরও ৩ টি প্রধান ভাগ। আলভী, এরা সিরিয়া ও লেবাননে সংখ্যাগরিষ্ঠ। আলেভী, এরা তুরস্ক, আলবেনিয়ার শিয়াদের মধ্যে সংখ্যায় বেশি। বেকতেশি, এরা সংখ্যায় খুব সামান্য, সিরিয়া এবং লেবাননে সামান্য পরিমাণে আছে। 

১২ ইমামপন্থী ছাড়া আছে ইসমাইলি শিয়া। ইসমাইলি শিয়াদের প্রধান ২ টি ভাগ। নিজারি ও মুসতালি। মুসতালিদের বেশ কিছু শাখা থেকে এখন বোহরা নামে কেবল একটি শাখা টিকে আছে। বোহরাদের প্রধান তিনটি ভাগ দাউদি বোহরা, সুলাইমানি বোহরা এবং আলাভি বোহরা। এরা সংখ্যায় খুব সামান্য। ইসমাইলি শিয়াদের প্রায় ৯৫% ই নিজারি ইসমাইলি শিয়া। এদের বিশ্বাস ইমামত বংশপরম্পরায় এখনো চলছে। এই লাইনের ৪৯ তম ইমাম প্রিন্স আগা খান ৪র্থ। ১২ ইমামপন্থী ও ইসমাইলি ছাড়া শিয়াদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যাইদি। 

খারেজিদের একসময় ৪ টি প্রধান শাখা ছিলো। আজারিকা, নাজদাত, সুফরি এবং ইবাদি। কালের বিবর্তনে এখন কেবল ইবাদিরা টিকে আছে। ইবাদি খারেজিরা ওমানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান। এছাড়া আলজেরিয়াতে কিছু পরিমান ইবাদি আছে। 

উপমহাদেশের হানাফি সুন্নিদের মধ্যে দুইটি প্রধান ভাগ- দেওবন্দী ও বেরেলভি। হাম্বলী মাজহাবের এক অংশ নিজেদের দাবী করে সালাফি। সালাফ মানে পূর্বপুরুষ, সালাফি মানে পূর্বপুরুষপন্থী। সালাফিরা ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অনুসারী। এদেরই খানিকটা আপডেটেড ভার্সন ওয়াহাবী। ওয়াহাবীরা আব্দুল ওয়াহাবের অনুসারী। সৌদি আরবের রাজপরিবারের সাথে আব্দুল ওয়াহাবের আত্মীয়তা ছিলো। 

সুন্নি-শিয়া-খারেজিদের ভাগাভাগির কারণ ফিকাহশাস্ত্র। এরা ছাড়াও ইসলামের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধারা সূফীবাদ। সূফীবাদ ইসলামের আধ্যাত্মবাদী ধারা। সারা পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত সূফীধারাগুলো হলো- চিশতিয়া, বেকতাশি, কুব্রাবিয়া, নকশাবন্দী, মুরিদিয়া, মৌলভিয়া, নিয়ামাতুল্লাহি, নুরবকশিয়া, উয়াইসি, সুহরাওয়ার্দিয়া, তিজানিয়াহ, সেনুসি, কাদিরিয়া প্রভৃত। এরমধ্যে উপমহাদেশে চিশতিয়া, কাদিরিয়া, নকশাবন্দী ধারা বেশ জনপ্রিয়। বেকতাশি সূফীধারা ১২ ইমামপন্থী। কুব্রাবিয়া ধারা উজবেকিস্তানে, মুরিদিয়া ধারা সেনেগাল-গাম্বিয়াতে, উয়াইসি ইয়েমেনে, তিজানিয়াহ মরোক্কো-আলজেরিয়াতে এবং সেনুসি মিসরে জনপ্রিয়। মওলানা জালালউদ্দিন রুমির অনুসারী সূফীদের বলা হয় মৌলভিয়া। নিয়ামাতুল্লাহি, নুরবকশিয়া এবং সুহরাওয়ার্দিয়া ধারা ইরানে জনপ্রিয়। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক ছোটো ছোটো সূফী ধারা প্রচলিত আছে। প্রত্যাকটি ধারার আবার উপধারা-উপউপধারা আছে। 

ফিকাহ এবং আধ্যাত্মবাদী ধারার বাইরে ইসলামের আরেকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিলো দার্শনিক ধারা। দার্শনিকধারা সবগুলোই বর্তমানে বিলুপ্ত। তবে ইসলামের ইতিহাসে এদের অবদান অনস্বীকার্য। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আশ’আরি, মাতুরিদি, মুরজিয়াহ, মু’তাজিলি এবং জাহমিয়াহ। 

এছাড়া আরো ৪ টি শাখা আছে যারা নিজেদের মুসলমান দাবী করে। কিন্তু বাকিরা তাদের মুসলমান হিসাবে স্বীকার করে না, আলাদা ধর্মের মনে করে। ১. আহমদিয়া কাদিয়ানী, ২. মাহদাভি, ৩. দ্রুজ এবং ৪. আহলে হক। কাদিয়ানিরা মনে করে মহানবী (স.) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। আর তার প্রতিনিধি হিসাবে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি হলেন মীর্জা গোলাম আহমদ। কাদিয়ানীদের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। আর মাহদাভিরা মনে করে ১৫ শতকের সৈয়দ মুহাম্মদ জৌনপুরীই ইমাম মাহদি।এরা সংখ্যায় খুবই কম। দ্রুজদের বসবাস প্রধানত লেবাননে। এরা ৪০ বছরের আগে ধর্মকর্ম শুরু করেনা। এরা প্লেটো, এরিস্টটল প্রভৃত গ্রীক দার্শনিককে ইসলামের নবী বলে মনে করে। এদের সংখ্যা প্রায় ১২-১৫ লাখ। এদের প্রধান গ্রন্থ- রাসায়েল আল হিকমাহ। আহলে হকরা ইয়ারসানি নামেও পরিচিত। তারা কালাম-এ-সারাঞ্জামকে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ মনে করে। সুলতান সাহাক তাদের কাছে এই হাকিকত পৌঁছে দেন বলে তারা বিশ্বাস করে। তাদের বাস মূলত ইরাকের কুর্দিস্তানে। সংখ্যায় প্রায় ১৫-২০ লাখ। 

কই থেকে কই আসলাম? আচ্ছা আমি আসলে এখনো বুঝি নাই কিসে গোমরাহ হয়? জোরে আমিন বললে নাকি আস্তে আমিন বললে? 

একটা সম্পূরক প্রশ্ন, বাংলাদেশের যারা নাস্তিক তারা ইসলাম ধর্ম নিয়া এতো টানাহেঁচড়া করে কেন? 
উত্তর- বাংলাদেশের নাস্তিকরাতো ইসলাম ধর্ম নিয়াই টানাহেঁচড়া করবে। ইসরাইলের নাস্তিকরা টানবে ইহুদী ধর্ম, আমেরিকার নাস্তিকরা খ্রিস্টিয়ান ধর্ম, চীনের নাস্তিকরা বৌদ্ধ ধর্ম আর ভারতের নাস্তিকরা হিন্দু ধর্ম। কারণ বাংলাদেশের নাস্তিকরা সাংস্কৃতিকভাবে মুসলমান। সে না চাইলেও তার মৃত্যুর পর তার জানাজা হয়। যেমন ইহুদী নাস্তিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড একটা বই লিখেছিলেন ‘মুসা ও একেশ্বরবাদ’ নামে। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন মুসা কিভাবে প্রাচীন মিসর থেকে ইহুদীদের মধ্যে একেশ্বরবাদ আমদানি করেছিলেন। 

এরপর অন্যান্য ধর্মের ধারাগুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। 

No comments:

Post a Comment