২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর, তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিস। ৮ টার সুন্দর সকাল। প্রতিদিনকার মতো মোহাম্মদ বোয়াজিজি তার ফলের ঠ্যালাভ্যান নিয়ে বের হয়েছে। বোয়াজিজির বয়স ২৬, তিউনিসের দরিদ্রতম এলাকা সিদি বুজিদে তার বাসা। মা, সৎ বাবা, ৬ ভাইবোনের বিশাল সংসারের উপর ব্যাংকের ঋণের বোঝা। বোয়াজিজির বাবা লিবিয়াতে কনস্ট্রাকশন শ্রমিকের কাজ করতেন। বোয়াজিজির ৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান, তার মা তার চাচাকে বিয়ে করেন। বোয়াজিজি ১০ বছর বয়স থেকে বিভিন্ন রকম কাজ করা শুরু করেন। ফুলটাইম কাজ পাবার জন্য কৈশোরেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। বোয়াজিজি ঋণ করে ফলের ব্যবসা শুরু করেন। দোকান নেয়ার মতো যথেষ্ট পুঁজি না থাকায় ঠ্যালাভ্যানের উপরেই ফল বেচা শুরু করেন। ঠ্যালাভ্যান নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফল বেচা লাগে, তার উপর পুলিশের উৎপাত। পুলিশ একে রাস্তায় বসতে দেয় না, দিলেও চড়া ঘুষের বিনিময়ে।
তার আগের দিনই বোয়াজিজি প্রায় ২০০ আমেরিকান ডলার সমপরিমান অর্থ ঋণ করে ফল কিনেছে, পরের দিনের ব্যবসার জন্য। সকাল ১০.৩০ এ যথারীতি পুলিশ আসে, টাকা চায়। বোয়াজিজির কাছে তখন টাকা ছিলোনা। পুলিশ তার কোনো কথা না শুনে তাকে রাস্তা থেকে তুলে দেয়, তার ওজন পরিমাপের মেশিন থানায় নিয়ে যায়। তাকে আইন দেখানো হয়, তিউনিসের রাস্তায় ঠ্যালাভ্যান নিষিদ্ধ। বোয়াজিজি তৎক্ষণাৎ গভর্নরের অফিসে যায়, বিষয়টা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার সাথে কথা বলার জন্য। সেখানে প্রথমে তার সাথে কেউ কথা বলতে চায় নি। পরে কথা বলার সময় যথেষ্ট পরিমান অপমান করে। এবং শেষে মারধর করে অফিস থেকে বের করে দেয়।
সকাল ১১.৩০। ঋনগ্রস্থ, অপমানিত, বিধ্বস্ত মোহাম্মদ বোয়াজিজি গভর্নরের অফিস থেকে বের হয়ে এসে রাস্তার সামনে দাঁড়ায়। পাশের গ্যাস-পাম্প থেকে ১ বোতল পেট্রোল চেয়ে নেয়। গভর্নর অফিসের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে- ‘বেঁচে থাকার জন্য তোমরা আমার কাছ থেকে কি আশা করো?’ তারপর নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই আগুন জ্বলে উঠে পুরো তিউনিসিয়ায়।
বোয়াজিজির আগুন দেয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বেকারত্ব, লাগামহীন দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা আর স্বৈরাচারে তিউনিসিয়া আগেই বারুদ হয়ে ছিলো। বোয়াজিজি সেই বারুদে যেন আগুন দিলেন। বিক্ষোভে ফুসে উঠলো পুরো তিউনিসিয়া। তিউনিসিয়ায় বেকারত্বের হার তখন ৩০%। তার উপর রাষ্ট্রপতি বেন আলী ২৩ বছর যাবত ক্ষমতায়। গুটিকয়েক ব্যক্তি-পরিবার ছাড়া আর কারো তেমন কোনো উন্নতি হয় নাই। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতি। সেটা দেখারও কেউ নাই। বিচার দেয়ার মতো কেউ নাই, বিচার করার মতো কেউ নাই।
বোয়াজিজিকে হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখানে তিনি মৃত্যুবরন করেন ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি। বোয়াজিজি গায়ে আগুন দেয়ার পরই তিউনিসিয়া জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ লক্ষ লোক রাস্তায় নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি বেন আলী তিউনিসিয়ায় জরুরি অবস্থা জারী করেন, রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে রাস্তায় অবস্থান করে সাধারণ লোকেরা। বেন আলী আশ্বাস দেন দুর্নীতির বিচার হবে, কর্মসংস্থান তৈরী হবে, প্রশাসন জনমুখী হবে, চাইলে নির্বাচনও দেয়া হবে। কিন্তু লাগাতার বিক্ষোভ-আন্দোলনের মুখে ২০১১ এর ১৪ জানুয়ারি বেন আলী পদত্যাগ এবং দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
ভাসমান ফলবিক্রেতা বোয়াজিজির গায়ের আগুন কেবল তিউনিসিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিলোনা। সেই আগুন ছড়িয়ে পরতে থাকে পুরো আরব অঞ্চলে। মিসরে ২০১১ এর ২৫ জানুয়ারি, সিরিয়ায় ২৬ জানুয়ারি, ইয়েমেনে ২৭ জানুয়ারি, ইরাকে ১২ ফেব্রুয়ারি, বাহরাইনে ১৪ ফেব্রুয়ারি, লিবিয়ায় ১৭ ফেব্রুয়ারি, মরোক্কোয় ২০ ফেব্রুয়ারি, সৌদি আরবে ১১ মার্চ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন স্বৈরতন্ত্র-রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন, এই আন্দোলন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন। জনগণের আধিকার আদায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন এবং একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য এই আন্দোলন। সারা পৃথিবীর রাজনীতিতে এর প্রভাব পরে। আরবের জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত এই আন্দোলনের নাম দেয়া হয়- ‘আরব বসন্ত’।
উপরে উল্লেখিত দেশগুলোতে বড় আকারে আন্দোলন হয়। এছাড়া প্রত্যেকটি আরব দেশে মাঝারি বা ছোটো আকারে আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেকটি দেশে আন্দোলন আর তার ফলাফলের আলাদা আলাদা রূপ দেখা যায়। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেখা গেছে তিউনিসিয়াতেই। বেন আলীর পতনের পর ২০১১ আর ২০১৪ তে দুইটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনতা তাদের রাষ্ট্রপতি বাছাই করে নিচ্ছে। তিউনিসিয়ার সরকার ও প্রশাসন ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচার আগের চেয়ে কমেছে।
আরব দেশগুলোতে আন্দোলনের প্রধান কারণ মূলত কয়েকটা। ১. স্বৈরতন্ত্র বা রাজতন্ত্র। আরব দেশগুলোতে কেউ একবার ক্ষমতায় এসে পরলে আর কোনোভাবেই নামতে চায় না। ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার তাই করে। দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এক বিচারহীন সমাজে স্বৈরাচার টিকে থাকে কিছুকাল, এটা তারা জানে। আন্দোলনের সময়ে মিসরের রাষ্ট্রপতি হোসনী মোবারকের শাসনকাল ৩০ বছর, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফীর শাসনকাল ৪২ বছর, সিরিয়ায় রাষ্ট্রপতি বাশার আল আসাদ আর তার পিতা হাফিজ আল আসাদ মিলিয়ে ৪০ বছর। রাজতন্ত্রে আর বয়স হিসাব করে কি লাভ!
২. লাগামহীন দুর্নীতি। দুর্নীতি স্বৈরতন্ত্র আর রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার একটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীবিশেষকে আলাদা সুবিধা দিয়ে বাকীদের জুলুম করার নামই দুর্নীতি। যার আছে তাকে আরও সুযোগ করে দেয়া, যার নাই তাকে আরো শোষনের মধ্যে রাখাই দুর্নীতি। প্রশাসনিক দুর্নীতিতো প্রত্যেকটা স্তরে। রাজাদেরতো ব্যক্তিগত আরাম আয়েশ আর প্রোটোকল পেলেই মিটে যায়। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এক জায়গায়। স্বৈরাচারের ইচ্ছাই দেশের আইনে পরিণত হয়। তাই দেশ থেকে আইনের শাসন বিলুপ্ত হতে থাকে।
৩. বেকারত্ব ও ধনী-গরীবের বৈষম্য বৃদ্ধি। দুর্নীতি ও অপশাসন প্রতিষ্ঠা হওয়া মাত্র বেকারত্ব ও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। কেবল সরকারের অনুগত চাকুরে আর উচ্ছ্বিষ্টভোগীরা ধনী হতে থাকে। রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি আর মজুতদার ব্যবসায়ীরা ধনী হতে থাকে। অপরদিকে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। গরীব আরো গরীব হতে থাকে। গরীবের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে, ঋণের দায়ে জর্জরিত হতে থাকে তারা। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, দেশের অর্থনীতি ক্রমশ ভেঙে পরতে থাকে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর সেদিকে নজর থাকেনা।
৪. মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন। স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাকতে হলে মানবাধিকার লঙ্ঘন করতেই হবে। কেউ না কেউ সত্য বলবেই, তাকে আটকাতে হবে। প্রথমে হুমকি-ধামকি-ভয়, এরপর জেল-জুলুম-জরিমানা, এরপর অর্থদণ্ড বা নির্বাসন বা পরিবারের উপর নির্যাতন এবং সবশেষে মৃত্যুদণ্ড। স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে মানুষের কথা বলা আটকাতে হবে। এর পাশাপাশি মিডিয়ায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ, বিরোধী রাজনৈতিকদের উপর নির্যাতন, জনগণের সাধারণ সমাবেশে হস্তক্ষেপ এগুলো করে মূলত স্বৈরতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হয়।
কারণ যাই হোক, প্রথমদিকে আন্দোলন শান্তিপূর্ণই থাকে। এগুলোকে সাধারণ জমায়েত বা বড়জোড় কয়েক হাজার লোকের মিটিং বলা যেতে পারে। শাসকগোষ্ঠী দমনপীড়নের মাধ্যমে আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে গিয়ে লোকেদের আরো উস্কে দেয়। কোথাও জরুরি অবস্থা, কোথাও কার্ফিউ বা সেনাবাহিনী মোতায়েন একটা ন্যায্য আন্দোলনকে হিংসার দিকে ঠেলে দেয়। জনগণ অসন্তুষ্ট হয়। জনতার মবে পরিণত হতে থাকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনগুলো। কিছু দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা এখনো চলছে। গৃহযুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য- সিরিয়া আর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ।
আরব বসন্তের আন্দোলনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর খুব বড় ভূমিকা ছিলো। আন্দোলনের ধরণ, সময়, গতি-প্রকৃতি, করণীয় ঠিক করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় ছিলো। প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়া সরকারের অধীনে থাকায়, কোথায় কি হচ্ছে জানতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর বেশি নির্ভরশীল হয় তখনকার মানুষ। বাংলাদেশ দিয়ে বোঝাতে গেলে, বিটিভিতে যখন বাতাবী লেবুর চাষ হচ্ছিলো, ফেসবুকে তখন জনতা দেখছিলো ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেনা কৃষক। পৃথিবীর ৯৯% মিডিয়ার কাজ আসলে সরকারের গুনকীর্তন করা আর সফলতাগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া।
যেসব কারনে লোকজন আন্দোলন করতে রাস্তায় নামছিলো, সেগুলা আসলে সরকারের এমনি করা উচিত। যেমন- কথা বলার অধিকার, সমাবেশ করার অধিকার, গণতন্ত্র চর্চার অধিকার, নিজের মতপ্রকাশের অধিকার, বিরোধী মতাদর্শের রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করার অধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতি দমন, প্রশাসনকে জনগণমুখী করা, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, গুটিকয়েক কতিপয়কে বিশেষ সুবিধা না দেয়া, শাসকপরিবারের ভোগবিলাসে মত্ত না থাকা ইত্যাদি।
যাই হোক, ঘটনা আর সময়ের সাথে সাথে আরব বসন্ত পরিণত হয় এক বিরাট মহীরুহে। এক শাখা তার থেকে ১০ টা প্রশাখা। মিসর, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন আর আরব বসন্ত নিয়ে বাদবাকি প্রাসঙ্গিক আলাপ সামনে আরো আসবে আশা করি। শেষ করতে চাই বোয়াজিজির শেষ কথা দিয়ে। ‘বেঁচে থাকার জন্য তোমরা আমার কাছ থেকে কি আশা করো?’
No comments:
Post a Comment