দেশে যাই ঘটুক না কেন ঘুরেফিরে আইনের শাসনের কথা চলে আসে। আইনের শাসন থাকলে এমন হতো না! আইনের শাসন রক্ষায় এইটা এইটা হওয়া দরকার! ইত্যাদি। আইনের শাসন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। রাষ্ট্র আছে কিন্তু সেখানে আইনের শাসন নাই, তার সোজা মানে রাষ্ট্র চলতেছেনা, রাষ্ট্র অকার্যকর। রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকায়া রাখতে হইলে অবশ্যই সেখানে আইনের শাসন থাকতে হবে। আজকে না কেবল, প্রাচীন সুমেরিয় সভ্যতায় রাজা হাম্মুরাবির শাসনামলে পৃথিবীর সর্বপ্রথম আইন যখন লিখিত হয়েছিলো, তখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সেই আইনে বলা ছিলো যদি কোনো বাসা তার স্থপতির দোষে ধ্বসে পরে, এবং সেখানে বাসার মালিক মৃত্যুবরণ করে, স্থপতিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। যদি বাসার মালিকের ছেলে মৃত্যুবরণ করে, স্থপতির ছেলেকে মেরে ফেলা হবে। এমনটা হয়েছিলো যেন স্থপতি তার কাজে গাফেলতি না দেয়, মনোযোগ দিয়ে কাজটা সম্পন্ন করে। কারণ তার কাজের উপর একটা পরিবারের নিরাপত্তা নির্ভর করছে।
অথচ তার প্রায় ৪,০০০ বছর পর এই আধুনিক রাষ্ট্রে আমাদের রানা প্লাজা ধ্বসে পরে। সেখানে প্রায় ৩,০০০ লোক মৃত্যুবরণ করে। ৩,০০০ লোক মানে কেবল ৩,০০০ লাশ না। ৩,০০০ কর্মক্ষম ব্যক্তি, ৩,০০০ পরিবার। ৩,০০০ পরিবার ধ্বংস করে ফেলার জন্য রানার কি হইছে? কি করছে সরকার? আইন তো লোকজনের হাতে না, আইন সরকার আর আদালতের হাতে। এমনকি তাকে ধরতেও স্থানীয় পুলিশ গরিমসি করছে, কারণ সে সাভারের যুবলীগ কর্মী, তৎকালীন সাভারের এম্পি মুরাদ জং এর খাস লোক, খুব পাওয়ার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লোকজন প্রচণ্ড চাপ তৈরী করলে শেষে রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ৬ তলা বিল্ডিঙের অনুমতি নিয়া ৯ তলা বিল্ডিং কি রানা একলা বানাইছে? এইটা করতে ইঞ্জিনিয়ার লাগছে, ঠিকাদার লাগছে, সরকারী অনুমতি লাগছে। তো সেই দ্বায়িত্বশীলরা কই? সেই রানারে আবার জামিনে মুক্তিও দিছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কি বোঝা যায়? বোঝা যায় দেশে রাজা হাম্মুরাবি ক্ষমতায় নাই।
যে বিচার দেশে একটা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা আছে বইলা জানান দিতে পারতো, যে বিচার লোকজনকে আইন ও সরকারের প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল করতে পারতো, সেখানেও কারা কারা যেন গাফেলতি করছে। রানার জামিন একটা উদাহরণ তৈরী করছে দেশে। যে যুবলীগ করলে, ছাত্রলীগ করলে, শ্রমিকলীগ করলে ছাড় পাওয়া যায়। ভাইরাল না হইলে তো পুলিশ ধার দিয়াও যায়না, ভাইরাল হইলে জেলে নিয়া দুয়েকদিন রাখে। ক্রমেই লোকেরা ইস্যু ভুইলা গেলে ছাইড়া দেয় বা জামিন দিয়া দেয় ইত্যাদি।
ভাত হইছে কিনা এইটা ২-৩ টা ভাত টিপ দিয়া দেখে। দেশে যে আইনের শাসন নাই এইটা বোঝার জন্যও দুইএকটা ঘটনাই যথেষ্ট। রানা প্লাজা সাভারে হওয়ায় সাভারের অধিবাসী আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের মনে সেই স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে।
এরপর বিশ্বজিৎ হত্যা যেটার বিচার হয় নাই, তনু হত্যা থেকে শুরু করে হালের নুসরাতের হত্যা। এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই লিস্ট দীর্ঘ হইতেই থাকবে। যে বিচারগুলা অতিদ্রুত হওয়ার কথা সেগুলাই পিছায়া যায়। কারণ সেই অপরাধগুলা এমন লোকেরা করে যাদের বিচার করা যায় না। হয় খুনির আত্মীয় বাহির হয় মন্ত্রী, নাইলে ধর্ষকের দুলাভাই বাইরায় এম্পি, নাইলে সে নিজে ছাত্র-যুব-শ্রমিক লীগ করে।
আচ্ছা সারা দেশে নগর, মহানগর, জেলা, উপজেলা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন মিলায়া কয়টা আছে যুবলীগের ইউনিট? ধরি ৫ হাজার। প্রতি ইউনিটের ক্ষমতাবান মেম্বার গড়ে ২০ জন কইরা হইলেও ১ লাখ। এইরকম ছাত্রলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, পেশাজীবীলীগ, তাঁতিলীগ, মাঝিলীগ, মহিলালীগ, তরুণলীগ, বৃদ্ধলীগ সব মিলায়া ধরি আরো ৪ লাখ। এইরকম প্রায় ৫ লাখ লোকের হাতে জিম্মি দেশের আইন আর বিচার ব্যবস্থা! এইরকম মাত্র ৫ লাখ লোকের ক্ষমতার কাছে ঠোক্কর খায় ১৭ কোটি লোকের অধিকার? এই ৫ লাখ লোক কম বা বেশি হইলে এই ১৭ কোটি লোকের কিচ্ছু আসবে যাবে না। ১৭ কোটি লোক সংখ্যায় একটুও কমবে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ক্ষমতা ছিলো এইরকম আর ৫ লাখ লোকের হাতে। এরা জাস্ট রিপ্লেস হইছে। আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে যা করছে, তা স্রেফ বিএনপির ৫ লাখ লোক সরায়া নিজের ৫ লাখ লোকের পুনর্বাসন।
আইন শাসন প্রতিষ্টা করার জন্য আশপাশের অনেক দেশ অনেক উদ্যোগ নিছে। সেগুলা কোনো গোপন উদ্যোগও না। ইরানের আইনে আল্লাহর দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় দুনিয়াবী অপরাধ- রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি। এইক্ষেত্রে ইরান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি। কোনো ওজর-আপত্তিই গ্রহণযোগ্য না। একবার ইরানে ফ্লাইওভার ভাইঙ্গা পরছিলো। বেশ কয়েকজন সাধারণ জনগণ যারা নিচে দিয়ে যাচ্ছিলো মারা গিয়েছিলো। তদন্ত কমিটি ইরান সরকারও করেছিলো। কিন্তু তারপরো ফলাফল- ইরান সরকার দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে। তদন্তে ইঞ্জিনিয়ার আর ঠিকাদারের দুর্নীতি বেরিয়ে আসে। দুইজনকেই প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসি দেয়া হয়। ফলে আর যারা দুর্নীতি করতো তারা সাবধান হয়ে যায়। কি মনে হয় ইরানি ঠিকাদারের কাছে টাকা কম ছিলো? আর বাংলাদেশে ভেতরে রডের বদলে বাঁশ দেয়া হয়, সেটার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়। সরকার বাঁশ খুজে পায় না।
আচ্ছা ইরান বাদ, সিঙ্গাপুরের কথা বলি, আমাদের এক পা তো সিঙ্গাপুরে চলেই গেছে। সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার পর তাদের সরকারী কর্মকর্তারাও দুর্নীতিগ্রস্থ ছিলো। সিঙ্গাপুরের সরকারপ্রধান তো ভেবে পান না কি করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি কমবে। শেষে তাদের বেতন ডাবল করে দিলেন। টাকা-পয়সার যে অভাব ছিলো তা মিটে গেলো। অভাবে যারা দুর্নীতি করতো তারা দুর্নীতি করা বাদ দিলো। কিন্তু যাদের স্বভাব তাদেরটা? তাদের দিলেন টাইট। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার কঠোর নিয়ম করলেন। সরকার তো আপনাকে বেতন দিচ্ছেই, তাহলে ভূমি জরিপ করতে পয়সা লাগবে কেন? পাসপোর্ট করতে পয়সা লাগবে কেন? লাইসেন্স বের করতে পয়সা লাগবে কেন? কারণ তো দর্শাতে হতোই, সরকারী কর্মকর্তাদের চাকুরিচ্যুত করারও বিধান ছিলো। ফলাফল- সিঙ্গাপুর আজকে সিঙ্গাপুর, আজকে তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে এইখানে।
আর বাংলাদেশে শুধুমাত্র বেতনই বাড়ানো হয়েছে। কোনোপ্রকার জবাবদিহিতা নাই। স্বচ্ছতা নাই, দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নাই। পদেপদে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি। আমাদের সরকারের ধারনা অবকাঠামোগত উন্নয়নই উন্নয়ন। না; জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হলো প্রকৃত উন্নয়ন। অবকাঠামোগত উন্নয়নটাও ঠিকমতো হচ্ছে না। একটা পুঁজিবাদী দেশ কতোটুকু পুঁজিবাদী তা নির্ভর করে তার যোগাযোগব্যবস্থার উপর। ১০০ কিলোমিটার পথ যেতে আপনার কয় মিনিট লাগে তার উপর। এই কারনে আমেরিকা সরকার ১৯৫০-৬০ সালেই পলিসি তৈরী করে একদম গ্রামের বাসাবাড়ির সামনের রাস্তা পর্যন্ত পাকা করে গুছিয়ে আনে।
মালয়েশিয়াতে মাহাথির যখন ক্ষমতায় আসেন ১৯৮১ তে, এসেই রাস্তাঘাটের উপর মনোযোগ দেন। দশ বছর কেবল রাস্তাঘাটই ঠিক করেন। এখন মালয়েশিয়া কোথায়? বাংলাদেশের কে বলতে পারবেন তার বাড়ির সামনের রাস্তা ঠিক আছে? কে বলতে পারবেন গাবতলী থেকে গুলিস্তান মাত্র ১৪ কিলোমিটার রাস্তা যেতে আপনার কয় মিনিট সময় লাগবে? কে বলতে পারবেন ঠিক ৩ টায় দেখা করার জন্য সময় দিয়ে সময়মতো পৌছাতে পেরেছেন?
যাই হোক, এই বিষয়গুলো পরষ্পর সম্পর্কিত। রাস্তা ঠিক হলে সময় বাঁচবে। বেঁচে যাওয়া কর্মঘন্টায় মানুষ কাজ করবে বা বিশ্রাম নেবে। পন্যের যোগান ও চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্যতা রক্ষা হবে। দেশ পুঁজিবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। আবার আমরা বাস করছি এক অসামাজিক দুষ্টচক্রে। যেখানে দুর্নীতি বন্ধ না হলে রাস্তা ঠিক হবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে দুর্নীতি কমবেনা। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল সরকারপ্রধানের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। সবাইকে যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। এই দুষ্টচক্র আমাদের ভাঙতে হবে।
কোথাও না কোথাও তো এই দুষ্টচক্র ভাঙার রসদ মজুদ আছে। সেটা কোথায়?
No comments:
Post a Comment