মানুষ বাঁচে গল্পে। বীরত্বের গল্পে, সফলতার গল্পে, আশাপূরণের গল্পে। মানুষের ইতিহাসের বইয়ে সেই গল্পগুলো ছড়ানো-ছিটানো থাকে। এখন কেউ আর ইতিহাস বই থেকে গল্প শিখতে চায় না। গল্প লোকে দেখতে চায় সিনেমা থেকে। ৩০০ নামে একটা সিনেমার গল্প করতে চাই। ঘটনা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালের প্রাচীন গ্রীসের। তখনকার ইরানিয় সম্রাট জারজেস গ্রীস আক্রমণ করেন। কিন্তু গ্রীস দখলের পথে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় গ্রীক-নগররাষ্ট্র স্পার্টার রাজা লিওনাইডাস। স্পার্টানরা যোদ্ধা জাতি। একমাত্র যোদ্ধা হওয়াই ছিলো সকল স্পার্টানের জীবনের লক্ষ্য। রাজা লিওনাইডাস মাত্র ৩০০ সৈন্য নিয়ে পথ আগলে দাঁড়ান, সম্রাট জারজেসের প্রায় ৩ লক্ষ সৈন্যের সামনে। ৩ লাখ সৈন্যের সামনে ৩০০ সৈন্য সংখ্যায় কিছুই না। কিন্তু স্পার্টান সৈন্যরা কেবল সাহস আর কৌশলকে সাথে নিয়ে সামনে বাঁধা দিতে দাঁড়িয়ে গেলো। কৌশল হচ্ছে মূল ভূমিতে প্রবেশের আগে পারস্যের সৈনিকদের একটা সরু গিরিপথ পার হয়ে আসতে হবে। স্পার্টান সৈন্যরা সেই গিরিপথটাই আটকাবে। আর সাহস হচ্ছে, স্পার্টান সৈন্যরা মরার জন্যই এসেছে। রাজা লিওনাইডাস প্রতিরোধ শুরু করার আগের ভাষণে বলে নেন- নো রিট্রিট, নো সারেন্ডার। শুরু হয় থার্মোপাইলের যুদ্ধ।
পুরা ছবির যে বিষয়টা আমারে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিছে সেটা আরেকটা ঘটনা। তৎকালীন গ্রীসেও বেইমান ছিলো। থার্মোপাইলের যুদ্ধের বেইমানের নাম এফিয়াল্টেস। সে জারজেসের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আর নগদ অর্থকড়ির বিনিময়ে নিজের জাতির স্বাধীনতার বিপক্ষে দাড়িয়েছিলো। সম্রাট জারজেসের পক্ষে সে রাজা লিওনাইডাসকে বোঝাতে গিয়েছিলো- কয়দিন আর বাচবা? জারজেসের কথা শোনো আর সুখেশান্তিতে বসবাস করো। স্পার্টার রাজা তো থাকবাই, পুরা গ্রীসই তোমারে দেয়া হইবো। লিওনাইডাস কেবল বাঁচতে চায় নাই, স্বাধীনতার সাথে বাঁচতে চাইছে। উনি বুঝতে পারছে জারজেসের অধীনে পুরা গ্রীসের রাজা হওয়ার চেয়ে, স্পার্টার মৃত কিন্তু স্বাধীন রাজা হওয়া বেশি সম্মানের। লিওনাইডাস কেবল একটা কথাই জিজ্ঞাসা করছিলো এফিয়াল্টেসরে। ‘এফিয়াল্টেস, ইউ লিভ ফরেভার?’ ‘এফিয়াল্টেস, তুমি সবসময় বাচবা?’ ছবিতে এফিয়াল্টেসকে প্রতিবন্ধী কুষ্ঠ রোগী হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এখন যারা গা বাচায়া চলতে চান তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন, আপনারা চিরদিন বাঁচবেন? মানুষ কয় বছর বাঁচে? ৫০, ৬০, ৭০। আমার সাথের অনেকে জীবনের ৩০ বছর কাটায়া ফেলছে। আর ৩০ বছর বাঁচবে কিনা জানিনা। তারপরো কতো রকম ভয়। পাছে লোকে কিছু বলে ভয়, কেমন কেমন দেখা যায় ভয়, ৫৭ ধারার ভয়, গ্রামের বাড়িতে পুলিশ যাওয়ার ভয়, জেল খাটার ভয়। আরে বাঁচবেন আর কয়দিন? ভয় পাইয়া পাইয়া সত্য বলা থেকে বিরত থাকলে হবে? যে সত্য জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, যে সত্য গোটা জাতির মঙ্গলের স্বার্থে, সে সত্য লুকায়া আপনার বাইচা থাইকাই কি আর মইরাই কি?
আমরা যেমন আমাদের আগের প্রজন্মকে দোষারোপ করি, আমাদের পরের প্রজন্ম যেনো আমাদের দোষ দিতে না পারে, এমন কি করছি আমরা? আপনার কি মনে হয় আপনার মেয়ে আপনাকে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করবেনা যে দেশে ধর্ষনের বিচার নাই, ধর্ষনের বিচারের জন্য আপনি আপনার যৌবনে কি করছেন? আপনার ছেলে আপনাকে কোনোদিন বলবেনা, সড়কে ট্রাফিক আইন না মানার কারনে মৃত্যু, আপনি আপনার যৌবনে সড়কে অকাল মৃত্যু ঠেকানোর জন্য কি করছেন? আসলে আপনি আপনার যৌবনে কি করছেন? ৩ বেলা খাইছেন, ১ বেলা ঘুমাইছেন, চাকরি করছেন, বিয়া করছেন, আমাদের পয়দা করছেন। ব্যাস। এই দেশে পয়দা করছেন, তাও। তারচে জার্মানি গিয়া আমাদের জন্ম দিতেন। আমাদের বন্ধু রহিমরে ওর বাপ জার্মানি নিয়া জন্ম দিছে। ওরতো বেওয়ারিশ লাশ হইয়া রাস্তায় মরার ভয় নাই।
বাসযোগ্য দেশ চাওয়া অপরাধ না। কিছুই না করে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করা কোনো কাজের কথা না। দেশে কোনো পরিবর্তন না আনা যাক, পরের প্রজন্মকে বলতে তো পারবেন, চেষ্টা করছি। কৃষকদের দিকে তাকান। তিন মাস কষ্ট করছে এক সিজনের ধান তোলার জন্য। বীজ, সার, পানি, নিড়ানি, কতো আয়োজন। এতো কষ্ট কইরা দেখলো ধানের দাম নাই, ১২ টাকা কেজি বেচা লাগবো। ধানে আগুন দিয়া দিলো। তারপরো তারা কোনো মিছিল-মিটিং করে নাই, কারো বাসা ঘেরাও দিতে যায় নাই, কারো রাস্তা আটকায় নাই। কেবল ধানের ন্যায্য দাম চাইছে। এই ধান অতি কম দামে মজুতদাররা কিনবে, চাল ভাঙ্গাবে, অতি বেশি দামে শহরের মধ্যবিত্তদের কাছে বেচবে। দুইদিকে লাভ। লাভ করা ভালো, কিন্তু অতি লাভ করা?
কৃষকরে বাঁচাইয়া রাখার দায় কার? ১. সরকারের আর ২. যারা ২-৩ বেলা ভাত খাইতেছে তাদের। আমরা কি করতেছি, ধান কাইটা দিতে যাইতেছি, ধান কাইটা দিয়া কৃষকরে সাহায্য করা অবশ্যই ভালো। কিন্তু এইটা কি সমাধান? না, অবশ্যই সমাধান না। আগামী বছর আবার কাস্তে নিয়া রেডি থাকবেন ধান কাইটা দেয়ার জন্য? কয়জন কৃষকের ধান কাটবেন? তারচেয়ে আসল জায়গায় নাড়া দেন। আপনার জিনিস লুকানো আছে ৩ তলায়, আপনি ২ তলা খুইজা শেষ! জিনিস পাবেন? সরকারকে চাপ দিতে হবে যেন যথাসময়ে কৃষকের ধান প্রাপ্য দামে কেনে, মজুতদারদের চাপ দিতে হবে যেন দুই পাশেই তারা লাভ কমায়া আনে।
আপনার আশপাশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করুন। সেগুলো নিয়ে কথা বলুন। আপনার পাশের মানুষের সাথে কথা বলুন, আপনার বন্ধুর সাথে বলুন, স্ত্রীর সাথে বলুন। সমস্যার সমাধান কি হবে সেটা ভেবে বের করুন। সেটা নিয়ে কথা বলুন। কথা বলাই সমস্যা সমাধানের প্রথম স্টেপ। আপনি যখন কথা বলা শুরু করবেন, দেশ একপা একপা করে হাঁটতে শুরু করবে। সমস্যা হয়তো শেষ হবে না। এরপর হয়তো আরো বড় সমস্যা আসতে পারে। কিন্তু ছোটো সমস্যাগুলো নিয়ে কথা না বলে বড় সমস্যার দিকে কিভাবে যাবেন? এবং কথা বলাই অন্যায় প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। আপনার সামনে যখন অন্যায় হচ্ছে, আর আপনি চুপ করে আছেন, তার মানে আপনি অন্যায় কাজকে সমর্থন করছেন। আপনি চুপ না থাকলে হয়তো অন্যায়টি হতো না।
আমাদের বাবামায়েরা আমাদের খুব ছোটোবেলাতেই খুব যত্ন নিয়ে শেখান কিভাবে সমস্যা এড়িয়ে চলতে হয়, কিভাবে একগলিতে সমস্যা দেখলে আরেক গলি দিয়ে বাসায় চলে আসতে হয়, কিভাবে মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করতে হয়। এখন সবাই যৌবনের দ্বারপ্রান্তে এসে বুঝতে শিখছেন এই তরিকায় গলদ আছে। প্রত্যেক আলাদা মানুষ তার নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী চলেন। কেবল জায়গা মতো সেটার ব্যবহার করা। বিবেক আর মেধার একটা সুন্দর সমন্বয় আপনাকে, আপনার সন্তানকে উপহার দিবে একটা সুন্দর দেশ। একটা সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করুন সবাই। সবাই স্বপ্ন দেখুন আগামি ১০ বছর পর আপনি বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান? আগামি ২০ বছর পর আপনি বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান।
আমি আমার কিছু স্বপ্নের কথা বলি- আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক বাংলাদেশের যেখানে বিদেশ থেকে মানুষ কেবল প্রকৃতি দেখতে আসবে, নদী দেখতে আসবে। সমদ্রের মতো বিশাল মেঘনায় নৌকায় ভ্রমণের জন্য তারা বাংলায় আসবে। বৃষ্টির আওয়াজ শোনার জন্য তারা বাংলাদেশে আসবে। একটা পরিষ্কার সবুজ বেহেস্তের মতো বাংলাদেশ দেখার জন্য তারা দলে দলে আসবে। বাংলাদেশের মানুষ যে সৎ, কর্মঠ আর পরিশ্রমী, এইটা তাদের কাছে উদাহরনের মতো মনে হবে। তারা বাংলাদেশকে অনুকরণ করতে চাইবে। তারা তাদের বাচ্চাদের বলবে, বড় হও, বড় হয়ে বাংলাদেশ গিয়ে ঘুরে দেখে এসো।
স্বপ্নের বাস্তবায়ন একটু কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না। ভারতের রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম আজাদের একটা কথা আছে স্বপ্ন নিয়ে। মানুষ যা ঘুমিয়ে দেখে তা তার স্বপ্ন না, যা তাকে ঘুমাতে দেয়না তাই তার স্বপ্ন।
৩০০ মুভির ইতিহাসের মধ্যে কৃষক ঢুইকা গেলো। কথা বলা শুরু করলে হয়তো অনেক অসুবিধা হবে। কিন্তু কথা না বইলাও কি খুব সুবিধা হইতেছে? যারা কথা বলতেছেন না তারা কি খুব সুখে আছেন? জীবনে আর কয়দিন বাঁচবেন? অন্তত আগামি প্রজন্মের জন্যই হোক, স্বপ্ন দেখা শুরু করুন। আপনি আপনার দেশকে কোথায় দেখতে চান?
No comments:
Post a Comment